একদিন দুপুরবেলায় আমি মার সঙ্গে রাগ করে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ হাঁটার ফলে আমার সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেল। আশ-পাশে তাকিয়ে দেখি সবকিছুই আমার অপরিচিত। চেনা-পরিচিত কাউকে দেখছি না। যেদিকে তাকাই সব অপরিচিত। বাজারের ভেতর দু-চারজন মানুষ আমার আশ-পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছেন। তারা আমাকে দেখেও না দেখার ভান করছেন। নিজেদের মধ্যে কথা চালাচালি করতে করতে চলে যাচ্ছেন।
একটা খোলা বাজারের মধ্যে আমি দাঁড়িয়ে আছি। বোঝা যাচ্ছে বাজারের বেচাকেনা শেষ। লোকজনের আনাগোনাও কম। দু-চারজন যাও আছে তারাও এদিক-ওদিক করছে। এখানে সেখানে পড়ে আছে পচা টমেটো, বিটকেলে বেগুন, ছেঁড়া লেটুস পাতা, পচা ফুলকপি, বাঁধাকপির অংশবিশেষ আরো কতো কী যে বাজারের এদিক-ওদিক পড়ে আছে!
বাজারের শেষ মাথায় বড়সড় একটা কাঁঠাল গাছ। আর সেই গাছে কাঁঠালও ধরেছে অগুনতি। কাঁঠালগুলোতে পাক ধরতে শুরু করেছে। আমাকে বাজারের মধ্যে গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাঝবয়েসী একজন বললেন, খোকা, অনেকক্ষণ ধরে দেখছি তুমি বাজারে একা একা দাঁড়িয়ে আছো। তোমার সঙ্গে কেউ আসেনি বাজারে? তোমার বাড়ি কই?
লোকটার কথায় আমি কিছু বললাম না। কী বলব? লোকটাকে বলি কী করে যে, আমি বাড়ি থেকে রাগ করে মাকে না বলে এক কাপড়ে বের হয়েছি। আর কক্ষণো বাড়ি ফিরে যাব না।
আমাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লোকটা বলল, ও তুমি পণ করেছ তোমার বাড়ি কই সে কথা বলবে না আমাকে— বলে লোকটা থেমে গেল। তারপর বললেন, বেশ তাহলে এক কাজ করো তুমি এই বাজারের গার্ডম্যান হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাজার পাহারা দেও। আমি বাড়ি গিয়ে দুটো ডাল-ভাত খেয়ে, একটা হালকা ঘুম দিয়ে বিকেলের শেষাশেষি আবার বাজারে আসব। তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত বাজার পাহারা দাও— ক্যামন অমনভাবে বলে লোকটা আমাকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে পা বাড়িয়ে চলতে শুরু করল।
লোকটা যখন আমাকে ফেলে অমনভাবে চলে যাচ্ছে দেখে আমি একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম এই ভেবে যে, মধ্য দুপুরের এই খাঁ খাঁ নির্জন বাজারে আমি একা একা থাকব? যদি এই মধ্যদুপুরে ও পাশের মাছ বাজার থেকে ভূত-পেত্নি এসে আমাকে নিয়ে উধাও হয়ে যায়!
আমি লোকটাকে বললাম, এই যে আপনি আমাকে এই দুপুরবেলায় একা ফেলে কই যাচ্ছেন?
আমার কথা শুনে লোকটা। কী যেন ভাবলেন। তারপর থেমে পেছন ফিরে বললেন, আমার নাম জয়নাল। তুমি ‘এই যে’ বলে কাকে ডাকছ?
কেনো আপনাকে? আমি বললাম।
ও বলে লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বললে না তোমার বাড়ি কই?
আমি বিড় বিড় করে বললাম, তারাকান্দি।
তারাকান্দি? বলে লোকটা বিস্ময়ে মুখ হা করে ফেললো, সে তো এখান থেকে অনেক দূর!
লোকটা যেভাবে বলল ‘সে তো এখান থেকে অনেক দূর’— শুনে আমার কলজে নড়েচড়ে উঠল। বলে কী!
কতদূর মানে! আমি আমতা আমতা করে বললাম।
তা ধরো মাইল ছয়-সাত তো হবেই—
ওমা! আমি ছয়-সাত মাইল হেঁটে ফেলেছি! আমি দেখি হাঁটায় বিশ্বরেকর্ড করে ফেলেছি— মনে মনে বললাম কিন্তু প্রকাশ করলাম না।
তারাকান্দি কাদের বাড়ি?
মাস্টার বাড়ি—
ও বুঝেছি আমাদের খসরু মাস্টারের বাড়ি?
লোকটা দেখি আমার মামাত ভাইকে ভালো করে চেনে। মনে মনে বলি।
কিন্তু ছয়-সাত মাইল হেঁটে আমি কী করে বাড়ি ফিরে যাব? আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ার উপক্রম। আমি আমার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া পানি কোনো রকমে ধরে রাখি।
লোকটা শুকনো মুখে পেটে হাত রেখে বললেন, ক্ষুধায় আমার পেট চোঁ চোঁ করছে, আমি বাবা তোমার সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বক বক করতে পারব না। আমি এখন বাড়ি যাব। তুমি কী একা একা বাড়ি ফিরে যাবে, না আমার সঙ্গে আমার বাড়ি যাবে? আমি মোবাইল করে খসরুকে বলে দেব ও বিকেলে এসে তোমাকে নিয়ে যাবে।
আমি বললাম, না আমি বাড়ি ফিরে যাব — ।
বেশ তাহলে আমার সঙ্গে চল বলে লোকটা হাঁটতে লাগলো। আমি তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে বাজার থেকে বেরিয়ে সরু একটা মাটির রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। রাস্তাটা দু’দিকে ভাগ হয়ে গেছে। লোকটা দূরে একটা বটগাছ দেখিয়ে আমাকে বললেন, ওই যে বটগাছটা দেখছ না তার বাঁদিক দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে সেটা ধরে চোখ বন্ধ করে হাঁটবে— চল্লিশ মিনিট পর দেখবে তুমি পৌঁছে গেছ তারাকান্দি— মানে গ্রান্ড মাস্টারের বাড়ি। তুমি একা যেতে পারবে তো! আমি মাথা নাড়লাম। আমার মাথা নাড়ানো দেখে লোকটা বললেন, আমি তাহলে চললাম— বলে লোকটা উল্টো পথে হাঁটা ধরল।
আমি দেখলাম লোকটা দুপুরের রোদকে কাঁধে নিয়ে দূরে চলে যাচ্ছেন।
আমি এবড়ো-থেবড়ো মাটির রাস্তা ধরে বটগাছের দিকে এগোতে থাকি। অনেকটা পথ হাঁটার ফলে আমার খুব ক্লান্ত লাগছিল। পা যেন আর চলছিল না। তারপরও হাঁটতে লাগলাম।
বটগাছটা এ রকম করে আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কেনো? কখন আমি বটগাছের কাছে যাব। তারপর অনেকটুকু পথ হেঁটে বাড়ি যাব— মার কাছে যাব।
হাঁটতে হাঁটতে আমি ভাবি, আচ্ছা, মা কি আমার জন্য বাড়ির বাইরের উঠোনে এসে সুপারি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে পথের দিকে তাকিয়ে আছেন?
