বিধি লঙ্ঘনের জন্য প্রার্থিতা বাতিলের যে ক্ষমতা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে নির্বাচন কমিশনকে দেয়া আছে তা আদৌ প্রয়োগযোগ্য নয় এবং অর্থহীন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। তিনি বলেছেন, আরপিও’র ৯১(ই) ধারটি লেভেল প্লেইং ফিল্ড তত্ত্বের পরিপন্থি। একই আইনে পরস্পরবিরোধী বিধান রাখা আদৌ সমীচীন নয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে দেয়া ওই ক্ষমতা ইসি ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার শেরেবাংলা নগরে ইসি কার্যালয়ে গণমাধ্যমের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন সিইসি।
গত রবিবার কমিশনের সভায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) বহুল আলোচিত ৯১ (ই) ধারাটি বিলোপের সিদ্ধান্ত হয়। নির্বাচনে গুরুতর অনিয়ম প্রমাণিত হলে নির্বাচন কমিশনকে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতা দেয়া হয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯১ (ই) ধারায়। যদিও নবম সংসদ নির্বাচনে ধারাটির প্রয়োগ করা হয়নি। এই ধারা বাতিলের পর গণমাধ্যমসহ সুশীল সমাজের নানা সমালোচনার মুখে গতকাল কমিশনের পক্ষ থেকে এব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়া হয়। সিইসি বলেন, এই বিধানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তাকে ডিসকোয়ালিফাইড করা হতো। অথচ এটি আইনের আর কোথাও লেখা ছিল না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, আইনে যদি অসঙ্গতি থাকে এবং সে আইন প্রয়োগ না করা যায়, তাহলে সে আইন না থাকাই ভালো।
এ ধারাটি বিলুপ্ত হলে নির্বাচনে আচরণবিধি লংঘনের প্রবণতা বেড়ে যাবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, এ আইন আগেও ছিলো না। ২০০৮ সালে এটি চালু করা হয়েছে। তাই সকলেই এই আইনের ভয়ে আচরণবিধি মেনে চলতেন তা বলা যাবে না। তাহলে এই আইন চালুর উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই সময়ের কথা তিনি বলতে পারছেন না। কিন্তু এ ধারায় সমস্যা রয়েছে। নির্বাচনের দুই দিন আগে কারো প্রার্থিতা বাতিল হলে আবার পুন:নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হতো। এতে লেভেল প্লেইং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগের ক্ষেত্র) নষ্ট হতো। সবাইকে সমান সুযোগ দিতেই কমিশন এই ব্যবস্থা নিয়েছে।
ওই ধারা বিলোপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে সিইসি কাজী রকিব বলেন, ‘সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ রাখতে এ ধারা বাতিল করা হলো। এ ধারা কেবল কাগজে-কলমেই ছিল, বাস্তবে এর প্রয়োগ ছিল না। তাই এ ধারা রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রয়োগিক দিক হতে বিবেচনায় দেখা যায় যে, আর্টিকেল-৯১(ই) আদৌ প্রয়োগযোগ্য নয় এবং অর্থহীন। এসব বিবেচনা করে আর্টিকেল ৯১(ই) বিলুপ্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।’
সিইসির লিখিত বক্তব্য
আরপিও-১৯৭২ এর ৯১ (ই) এ বিধান করা হয়েছে যে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রার্থী বা তার এজেন্ট বা তার পক্ষে অন্য কেউ এমন কোনো অন্যায়কর্মে লিপ্ত হলে বা উক্ত আদেশ বা আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘন করলে বা করার প্রয়াস নিলে তিনি সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হতে পারেন। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে তার বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দিয়ে তদন্তের আদেশ প্রদান করবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উক্ত প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে। অবশিষ্ট প্রার্থীদের মাঝে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং অবশিষ্ট প্রার্থী একজন হলে সমগ্র নির্বাচন কার্যক্রম বাতিল করে পুনরায় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। এ অনুচ্ছেদে অবশিষ্ট প্রার্থী সংক্রান্ত বিধান স্ববিরোধী। এই অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করার ফলে অবশিষ্ট প্রার্থী একাধিক হলে তাদের মাঝে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাত্ বাতিলকৃত প্রার্থী বা অন্য কেউ প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকবে না। কিন্তু অবশিষ্ট প্রার্থী একজন হলে নির্বাচন কার্যক্রম বাতিল করে নতুন করে তফসিল ঘোষণা করতে হবে এবং নবঘোষিত তফসিলে বাতিলকৃত প্রার্থীসহ আরও অনেকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবে।
দ্বিতীয়ত, এখানে কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হলে অবশিষ্ট প্রার্থীদের প্রার্থিতা অক্ষুণ্ন রেখে তাদের মাঝে নির্বাচন সীমিত রাখার সুযোগ দেয়া হয়েছে। অবশিষ্ট প্রার্থী একজন হলে তার প্রার্থিতা ক্ষুণ্ন করে পুনরায় তফসিল ঘোষণা করে মনোনয়নপত্র দাখিলের দরজা সকলের জন্য খুলে দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা দেখা যায় না। এটা অবশিষ্ট একক প্রার্থীর জন্য লঘু অপরাধের গুরুদণ্ড নয় বরং বিনা অপরাধে গুরুদণ্ডের শামিল। সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০০৮ এর বিধি ১২ অনুসারে, কোনো প্রার্থী ভোটগ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিনের পূর্ববর্তী তিন সপ্তাহ প্রচারণা চালাতে পারেন। তদনুসারে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীগণ দুই সপ্তাহ বা ততোধিক সময় প্রচারণা চালানোর পর এক বা একাধিক প্রার্থীর অপরাধ হেতু তার বা তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হলে অবশিষ্ট প্রার্থী একজন থাকলে নির্বাচন কার্যক্রম বাতিল করে নতুন তফসিল ঘোষণা করলে সে অবশিষ্ট নিরপরাধ প্রার্থীকে প্রচারণার জন্য প্রায় দ্বিগুণ ব্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে। অর্থাত্ আর্থিক দিক হতে তাকে অসম প্রতিযোগিতায় পড়তে হবে যা লেভেল প্লেইং ফিল্ড তত্ত্বের পরিপন্থি। তাছাড়া আর্টিকেল ১৯ এর বিধান অনুসারে, রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর বৈধ প্রার্থী একজন থাকলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষণা করতে হয়। কিন্তু আর্টিকেল ৯১(ই) এর ক্ষেত্রে তার বিপরীত বিধান করা হয়েছে। একই আইনে এহেন পরস্পরবিরোধী বিধান রাখা আদৌ সমীচীন নয়। আর্টিকেল ৯১(ই) এ উল্লিখিত কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্ট বা তার পক্ষে অন্য কেউ আরপিও-১৯৭২ এর কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে তার শাস্তির বিধান উক্ত অর্ডারের ষষ্ঠ অধ্যায়ে আছে এবং আচরণ বিধিমালা ভঙ্গের শাস্তি বিধি ১৮ এ বিধৃত আছে।
১৯৭৩ হতে ২০০১ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আর্টিকেল ৯১ (ই) ছিল না। ২০০১ সালে ৪২নং অধ্যাদেশমূলে অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করা হয় বটে কিন্তু ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে তার প্রয়োগের কোনো উদাহরণ নেই। বরং উল্লিখিত আদেশের পঞ্চম অধ্যায়ের প্রয়োগের একাধিক উদাহরণ আছে। বস্তুত উক্ত অধ্যায়ের বিধিমালাবলী যথাযথ এবং পর্যাপ্ত। প্রকৃতপক্ষে আর্টিকেল ৯১(ই) প্রয়োগযোগ্য নয়। এই অনুচ্ছেদের বিধান প্রয়োগ করে কখনো কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা যাবে না। কারণ উক্ত অনুচ্ছেদের ১ উপ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, এমন কোনো গুরুতর বেআইনি কাজ বা আরপিও বিধিমালা বা আচরণ বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়েন।
সংবিধানের ৬৬নং অনুচ্ছেদে এবং আরপিও এর অনুচ্ছেদ ১২ এর ১ উপ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যপদে নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্যতার যে বিধান দেয়া আছে তাতে ঢালাওভাবে আরপিও বা বিধিমালা বা আচরণ বিধিমালা বিধান লঙ্ঘনের উল্লেখ নাই। আরপিও অনুচ্ছেদ ১২-এর উপ অনুচ্ছেদ ১ এ শর্তাবলীর দফা (ডি) এ সুনির্দিষ্ট অনুচ্ছেদে দণ্ডিত হওয়ার বিষয় উল্লেখ আছে। সে দণ্ডারোপের এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নয়, বিচারিক কর্মকর্তার। ফলে প্রায়োগিক দিক বিবেচনায় দেখা যায় যে, আর্টিকেল ১৯-এর ই আদৌ প্রয়োগযোগ্য নয় এবং অর্থহীন। এসব বিবেচনা করে আর্টিকেল ৯১ (ই) বিলুপ্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
