আগামী দশম সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে খুলনার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন থেকেই মনোনয়ন পাবার লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করার পর বিএনপি এখন সংসদ নির্বাচনের জন্য বেশ জোরেসোরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। বড় দুই রাজনৈতিক জোটে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা অনেক লম্বা। নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে ১৮ ও ১৪ দলীয় জোটের অন্তত তিন ডজন প্রার্থী খুলনার ৬টি সংসদীয় আসনের জন্য তত্পর। মজার ব্যাপার হলো, এবার অভিজ্ঞ ও প্রবীণ রাজনীতিকদের পাশাপাশি মনোনয়ন প্রত্যাশী তরুণদের তত্পরতাও উল্লেখ করার মত। সম্ভাব্য তরুণ প্রার্থীর সংখ্যা ডজনখানেকের কম হবে না। এ অবস্থায় বড় দুই দলের মনোনয়ন বন্টন কিছুটা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে খুলনার ৬টি সংসদীয় আসনে মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে আসছে। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার দুইটি আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর ২ জন প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আবার নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ আসন বাদে বাকি ৫টিতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। তবে এবার আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এতটাই প্রকট যে নির্বাচনী কার্যক্রম তাদের জন্য যথেষ্ট কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
জামায়াতে ইসলাম ইতিমধ্যে খুলনা-৫ এবং ৬ আসনে জোট প্রার্থী হিসাবে দলের দুইজন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরীক জাতীয় পার্টি (এ) একক নির্বাচন করবে এমন আভাস দিয়ে খুলনার ৬টি আসনে তাদের দলের প্রার্থীর নামও ঘোষণা করেছে। এছাড়া সিপিবিও এককভাবে নির্বাচনের জন্য খুলনার সবগুলো আসনে তাদের দলের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে।
খুলনা-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসাবে পরিচিত। বরাবরই আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা এই আসনে নির্বাচিত হয়ে আসছেন। গত ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ননী গোপাল মন্ডল ৫২ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী আমীর এজাজ খানকে পরাজিত করে বিজয়ী হন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে তরুণ নেতা আমীর এজাজ খান এবারও নির্বাচন করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিপর্যস্ত খুলনা আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে এবার ননী গোপাল মন্ডলকে এই আসন থেকে পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। এখানে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক শেখ হারুনুর রশিদ মনোনয়ন চাইবেন। এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশিদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক এমপি পঞ্চানন বিশ্বাসও। আবার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা কিংবা তার পরিবারের কেউ এ আসনে প্রার্থী হতে চাইলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এছাড়া এই আসনে জাতীয় পার্টির সুনীল শুভ রায় এবং সিপিবির অশোক সরকারের নাম প্রার্থী হিসাবে ইতিমধ্যে দলের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে।
খুলনা-২ বা সদর আসনটি বিএনপির দুর্গ হিসাবে সবার কাছে পরিচিত। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই আসনে একবার মাত্র আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন। তাছাড়া সবসময়ই এই আসনে বিএনপির প্রার্থীই বিজয়ী হন। গত নির্বাচনে বিজয়ী খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবারের নির্বাচনেও এই আসনে প্রার্থী হবেন বলে ধারণা করা যায়। তবে সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা আলী আজগর লবিও এই আসনের প্রার্থী হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।
এই আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশির নাম আলোচনায় আছে। খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মিজানুর রহমান মিজানের নাম এই আসনে প্রার্থী হিসাবে জোরেসোরে শোনা যাচ্ছে। এছাড়া সাবেক স্পীকার শেখ রাজ্জাক আলী, জাতীয় পার্টির শেখ আবুল হোসেন, সিপিবির এইচএম শাহাদাত্ হোসেন প্রমুখ নেতৃবৃন্দের নাম প্রার্থিতার আলোচনায় আছেন।
খুলনা-৩ আসনটি অধিকাংশবারই বিএনপির দখলে ছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে বিএনপি নেতা কাজী সেকেন্দার আলী ডালিম দল ছেড়ে আওয়ামী লীগের টিকিট নিয়ে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। বর্তমানে সরকারের শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান আসন্ন নির্বাচনে এই আসনেই নির্বাচন করতে চান। এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশিদের মধ্যে দলের তরুণ নেতা ও কেসিসি’র প্যানেল মেয়র মনিরুজ্জামান খোকন ও শেখ সৈয়দ আলীর নাম আলোচিত হচ্ছে।
বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশিদের মধ্যে কাজী সেকেন্দার আলী ডালিম, নগর বিএনপির তরুণ নেতা এমএম আরিফুর রহমান মিঠু, নগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম এলাকায় তাদের নির্বাচনী তত্পরতা চালাচ্ছেন। অপরদিকে জাতীয় পার্টির মহানগর সভাপতি সাবেক এমপি আব্দুল গফ্ফার বিশ্বাস এবং সিপিবির এসএ রশিদের নাম আগেই দলীয়ভাবে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসাবে ঘোষিত হয়েছে।
খুলনা-৪ আসনে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা তরুণ শিল্পপতি শরীফ শাহ্ কামাল তাজকে সাড়ে ১১ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের মোল্লা জালাল উদ্দিন। আগামী নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী রয়েছে। আওয়ামী লীগে মোল্লা জালাল উদ্দিন ছাড়াও মনোনয়ন প্রত্যাশিদের মধ্যে সাবেক হুইপ এসএম মোস্তফা রশিদী সুজা, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, রূপসা উপজেলা চেয়ারম্যান আলী আকবর শেখ, যুবলীগের তরুণ নেতা কামরুজ্জামান জামালের নাম আলোচনায় রয়েছে। জাতীয় পার্টির ডা. হাদিউজ্জামান ও সিপিবির অধ্যাপক নিশিকান্ত বাড়ইয়ের নাম দলীয় প্রার্থী হিসাবে আগেই ঘোষণা করা হয়েছে।
খুলনা-৫ আসনে গত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নারায়ণ চন্দ্র চন্দ জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক গোলাম পরওয়ারকে ৩৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। তবে এবার এই আসনে অধ্যাপক গোলাম পরওয়ারের নাম দলীয়ভাবে ঘোষণা করলেও বিএনপি এই আসনটিতে জামায়াতকে ছাড় দিতে নারাজ। এই আসনে সাবেক এমপি ড. গাজী আব্দুল হাদী ও ড. মাহাবুব-উল ইসলাম বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে আলোচনায় রয়েছেন। জাতীয় পার্টি ও সিপিবির দলীয় প্রার্থী হিসাবে যথাক্রমে মোল্লা মুজিবুর রহমান ও আব্দুল মালেক মোল্লার নাম আগেই ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
খুলনা-৬ আসনে গত সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াত নেতা শাহ্ রুহুল কুদ্দুসকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের এডভোকেট সোহরাব আলী সানা নির্বাচিত হন। সোহরাব আলী সানা এবারও মনোনয়ন চাইবেন। জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আকতারুজ্জামান বাবুুও এই আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী। বিএনপির সাবেক এমপি স.ম বাবর আলী এই আসনে মনোনয়ন চাইবেন। এখানে জামায়াত খুলনা মহানগর আমীর মাওলানা আবুল কালাম আজাদের নাম প্রার্থী হিসাবে আগেই ঘোষণা করেছে। একইভাবে জাতীয় পার্টি শফিকুল ইসলাম মধু এবং সিপিবি শেখ আব্দুল হান্নানের নাম দলীয়ভাবে প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে।
জানা গেছে, নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের দলীয় কার্যালয়ে ইফতার পার্টির আয়োজনের মধ্যে দিয়ে দলের সব গ্রুপের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মিজানুর রহমান মিজান দলে কোনো গ্রুপিং বা মতানৈক্য নেই দাবি করে বলেন, আমরা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছি।
আওয়ামী লীগের তুলনায় খুলনায় বিএনপির অবস্থা বর্তমানে অনেকটাই ভাল। সাংগঠনিকভাবে তারা এখন বেশখানিকটা গোছালো। দলের সভা-সমাবেশ এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রেও দলের নেতাকর্মীরা তত্পর। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তাদের মেয়র প্রার্থী বিশাল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর দলের নেতাকর্মীরা এখন রীতিমত চাঙ্গা।
