অস্ত্রধারী সেই যুবকের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। যুবলীগ নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠজনরা বলেছেন, অস্ত্রধারী ওই যুবক ঢাকা মহানগর যুবলীগের (উত্তর) সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল। নিজের লাইসেন্সকৃত রিভলবার দিয়েই চঞ্চল গুলি করেছে মিল্কীকে। তবে র্যাবের দাবি, অস্ত্রধারী ওই যুবক যুবলীগের (দক্ষিণ) যুগ্ম সম্পাদক এস এম জাহিদ সিদ্দিক তারেক। সে মিল্কীকে হত্যা করার জন্যই ছদ্মবেশ ধারণ করেছিল। মিল্কী খুনের পর তারেক গ্রেফতার হলেও চঞ্চল আত্মগোপনে চলে গেছেন। গতকাল র্যাবের একটি টিম চঞ্চলের গুলশানের নিকেতন এলাকার এ ব্লকের ৩ নম্বর রোডের ১৩৩/এ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। তবে চঞ্চলের সহযোগী শাহ আলমকে র্যাব আটক করেছে।
এদিকে মিল্কী হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চঞ্চল ও তারেককে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পিডিবি, ওয়াসা, ডেসা, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও সিএমএমইউর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ হয় চঞ্চলের হাতে। এই টেন্ডারবাজির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই মিল্কী খুন হন। আর এই খুনের নেতৃত্বে ছিল চঞ্চল, তারেক ও তাদের সহযোগীরা। পত্রিকায় প্রকাশিত গুলির ছবি দেখে যুবলীগের নেতারাই বলেছেন, টুপি-পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত যে ব্যক্তি মিল্কীকে গুলি করেন, তিনি যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল। দুর্ধর্ষ এই চঞ্চল তার ক্যাডার বাহিনীকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখায় বিভিন্ন পদে স্থান করে নেয়। চঞ্চলের ভগ্নিপতি রফিকুল ইসলাম যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা।
যুবলীগ নেতারা বলছেন, চঞ্চলের ঘনিষ্ঠ এইচ এম জাহিদ সিদ্দিক তারেক ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক পদ পান। চঞ্চল নিজে তার পদ পেতে অন্তত ৮০ লাখ টাকা খরচ করেন। একইভাবে যুবলীগ মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখায় চঞ্চলের ক্যাডার বাহিনীর অন্তত ২০ জনকে বিভিন্ন পদ পেতে ২০ লাখ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকা খরচ করেছেন বলে যুবলীগের ত্যাগী নেতারা জানিয়েছেন; কিন্তু র্যাব বলছে, মিল্কী খুনের সময় তার সঙ্গে ছিল সাগর। এই সাগরই প্রথম নিশ্চিত করে হত্যাকারী তারেক। ফলে র্যাব রাতের মধ্যেই তাকে গ্রেফতার করে। হত্যাকাণ্ডের পরপরই র্যাব বলেছিল, তারেক পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গতকাল অবশ্য র্যাব বলেছে, তারেক পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। অস্ত্রধারী যে তারেক তা নিয়ে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই বলে জানান র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান। তবে সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন তারেক পিঠে বা পায়ে যেখানেই গুলিবিদ্ধ হোন না কেন- সিসিটিভির ফুটেজে কিন্তু সেরকম কোন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না।
ভিডিও ফুটেজে মিল্কীকে লক্ষ্য করে যে ব্যক্তিকে গুলি করতে দেখা গেছে, তার শরীরের কোথাও গুলিবিদ্ধ হয়নি। র্যাব কিন্তু তারেককে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেফতার করেছে। র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, ভিডিও ফুটেজে যে ব্যক্তিকে গুলি করতে দেখা যাচ্ছে, তারেককে আটকের সময় তার পরনে একই পোশাক ছিল। গ্রেফতারের সময় তারেকের এক পায়ে গুলিবিদ্ধ ছিল। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তারেক উত্তরার জসীমউদ্দীন রোডের ফরচুন হাসপাতালে ভর্তি হয়। তারেক গ্রেফতারের পর র্যাবের কাছে স্বীকার করেছে সে মিল্কীকে গুলি করেছিল।
অন্যদিকে, যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতা জানান, চঞ্চল ও তার ক্যাডার বাহিনী যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার মাধ্যমে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি করছে। যুবলীগের প্রবেশের আগে চঞ্চলের কোন রাজনৈতিক পরিচয়ই ছিল না। গুলশান শপিং সেন্টারে তানিম এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক চঞ্চল। তিনি এই শপিং সেন্টারে ব্যবসায়ি সমিতির সাধারণ সম্পাদক। চঞ্চলের একজন সহযোগী জানান, মিল্কীকে গুলি করার সময় তার আশেপাশে বাড্ডার কানী সোহেল ও মগবাজারের রবিন ছিলেন।
কোর্ট রিপোর্টার জানান, রিয়াজুল হক খান মিল্কী হত্যা মামলার ৬ আসামিকে ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল ১০ দিনের রিমান্ড আবেদনের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট মো. রেজাউল করিম এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার এসআই ছাব্বির রহমান এই রিমান্ড আবেদন করেন। আসামিরা হলেন- তুহিনুর রহমান, সৈয়দ মোস্তফা আলী রুমি, মোহাম্মদ রাশেদ মাহামুদ, সাইদুল ইসলাম ওরফে নুরুজ্জামান, মোহাম্মদ সুজন হাওলাদার ও জাহাঙ্গীর মল্লিক। এদিকে মামলাটির প্রধান আসামি ঢাকা মহানগর যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক এইচ এম জাহিদ সিদ্দিক তারেককে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হলে বিচারক তা মঞ্জুর করেছেন।
আসামি পক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড শুনানিকালে বলেন, তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, পরিস্থিতির শিকার। তারা বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তবে মামলার মূল আসামি যুবলীগ নেতা এইচ এম জাহিদ সিদ্দিক তারেক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন থাকায় তাকে গতকাল আদালতে হাজির করা হয়নি।
মামলা দায়ের ঃ রিয়াজুল হক খান মিল্কী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গুলশান থানায় ১১ জনকে আসামি করে মঙ্গলবার রাতে গুলশান থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলার বাদী নিহতের ছোট ভাই মেজর রাশেদুল হক খান মিল্কী। মামলার আসামিরা হলেন - এস এম জাহিদ সিদ্দিক তারেক ওরফে কিলার তারেক, তুহিনুর রহমান ফাহিম, সৈয়দ মোস্তফা আলী রুমি, মোহাম্মদ রাসেদ মাহামুদ, সাইদুল ইসলাম ওরফে নুরুজ্জামান, মোহাম্মদ সুজন হাওলাদার, মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, সোহেল, জাহাঙ্গীর মন্ডল, জাহিদুল ইসলাম টিপু ও ওয়াহিদুল আলম আরিফসহ অজ্ঞাত নামা ৪/৫ জন। এদের মধ্যে ৭ জন গ্রেফতার ও ৪ জন পলাতক রয়েছে। হত্যার কারণ সম্পর্কে এজাহারে বলা হয়, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে আসামিরা পরিকল্পিতভাবে মিল্কীকে হত্যা করা হয়েছে।
তারেক-চঞ্চল যুবলীগ থেকে বহিষ্কার ঃ রিয়াজুল হক মিল্কী হত্যার ঘটনায় ঢাকা মহানগর যুবলীগের (দক্ষিণ) যুগ্ম সম্পাদক জাহিদ সিদ্দিকী তারেক ও ঢাকা মহানগর যুবলীগের (উত্তর) সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চলকে বহিষ্কার করেছে আওয়ামী যুবলীগ। এরা দু’জনই মিল্কী হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পর তারেককে গ্রেফতার করে র্যাব।
গতকাল বুধবার আওয়ামী যুবলীগের দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঢাকা মহানগর যুবলীগ (দক্ষিণ) এর সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খাল মিল্কী হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে জাহিদ সিদ্দিকী তারেক ও সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চলকে আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মামলা তদন্ত করবে র্যাব :মিল্কী হত্যা মামলা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করবে র্যাব। এ ব্যাপারে র্যাবের মিডিয়া এ্যান্ড লিগ্যাল শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার হাবিবুর রহমান বলেন, এই হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করা হবে।
