নির্বাচন কমিশনে ২০১২ সালের আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। জমা দেয়া হিসাব অনুযায়ী ব্যয়ের চেয়ে আয় বেশি আওয়ামী লীগের। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দলটির আয় দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং ব্যয় দেখানো হয়েছে ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে আয়-ব্যয়ের দিক দিয়ে ঘাটতিতে রয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। একই অবস্থা জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টির (এ)। বিএনপির বার্ষিক আয় ১ কোটি ৭৯ লাখ ১২ হাজার ২৩১ টাকা আর ব্যয় ২ কোটি ২৬ লাখ ৯৩ হাজার ১৪৩ টাকা। সে হিসাবে ঘাটতি ব্যয় ৪৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা। জামায়াতে ইসলামীর আয় ৬ কোটি ৪ লাখ ২১ হাজার ৬২০ টাকা এবং ব্যয় ৭ কোটি ৪৩ লাখ ৫৯৫ টাকা। ঘাটতি ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
এদিকে বিএনপির চেয়ে আয় ও ব্যয় দুটোই বেশি দেখিয়েছে এইচএম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (এ) ও জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় পার্টি (এ) তাদের আয় ৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা আর ব্যয় ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা দেখিয়েছে।
এ বিষয়ে ইসি সবিচালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক ইত্তেফাককে বলেন, যেসব রাজনৈতিক দল আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে। আর যারা সময় চেয়ে আবেদন করেছে সে বিষয়ে কমিশন সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
গতকাল বুধবার সকালে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি (এ) আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিল করে। আগের দিন মঙ্গলবার জামায়াতে ইসলামী হিসাব জমা দেয়। নিবন্ধিত ৩৯টি দলের মধ্যে ২৭টিই আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়েছে গতকাল শেষ দিনে। আর সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেছে আরো ১০টি দল। তবে দুটি দল কোন হিসাব জমা দেয়নি।
বেলা সাড়ে ১২টায় আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাসের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল আওয়ামী লীগের হিসাব দাখিল করে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিকের কাছে তারা এই হিসাব জমা দেন। প্রতিনিধি দলের অন্য দুই সদস্য হলেন দলের উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার ও খ. ম. হাসান কবীর আরিফ। গত বছরের চেয়ে এ বছর আওয়ামী লীগের আয় ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে।
হিসাব বিবরণীতে আওয়ামী লীগের আয়ের খাত হিসাবে প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ ফি, কার্যনির্বাহী সংসদ, জাতীয় কমিটি, উপদেষ্টা পরিষদ, সংসদ সদস্য, কুপন বিক্রি, কাউন্সিলার ফি, জেলার মঞ্জুরি ফি, দলের পত্রিকা, সাময়িকী, প্রচার-পুস্তিকা ও পুরাতন কাগজ বিক্রি, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা, মহানগরসহ নেতা-কর্মীদের অনুদান, ব্যাংকে গচ্ছিত বিভিন্ন মেয়াদী আমানত ও সঞ্চয়পত্রের লাভসহ দলের বিভিন্ন শাখা থেকে প্রাপ্ত অর্থ আয়ের উত্স হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে। মোট আয় দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৪ লাখ টাকা। অপরদিকে কর্মচারীদের বেতন ও বোনাস, আবাসন ও প্রশাসনিক খরচ, বিদ্যুত্, ওয়াসা, গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি ও হোল্ডিং বাবদ, ত্রাণ কার্যক্রম, টেলিফোন, কুরিয়ার সার্ভিস, পত্রিকা বিল, আপ্যায়ন, পোস্টার লিফলেট, হ্যান্ডবিল, স্টিকার, ব্যানার, মাইকিং, প্রোটেট, প্রচার-প্রকাশনা, পরিবহন, যাতায়াত, জনসভা, পথসভা, ঘরোয়া বৈঠক, সাংগঠনিক, নির্বাচনী ব্যয়, ত্রাণ, জনসেবা, আর্তমানবতার সেবা, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, অফিস উন্নয়ন, কেন্দ ীয় কার্যালয়ের জমি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, বাড়ি ভাড়া, বিভাগীয় ও জেলা জনসভা, সহযোগী সংগঠনের অনুষ্ঠান, সাংগঠনিক খরচ, বিজ্ঞাপন, পত্রিকা, টিভি, ব্যাংক চার্জসহ বিবিধ ব্যয়ের খাত হিসাবে দেখানো হয়েছে। ব্যয় উল্লেখ করা হয়েছে ৯ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে অন্যতম হলো বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলীয় কার্যালয়ের পাশে দলের জন্য পৌন ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে চার শতাংশ জায়গা কেনা হয়েছে। এস. এম জাকারিয়া এণ্ড কোং চাটার্ড একাউন্টন্যান্স প্রতিষ্ঠানটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন কাজ সম্পন্ন করেছে।
এর আগে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি হিসাব দাখিল করে কমিশনে। দলটির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ নেতৃত্বে সচিবের কাছে হিসাব জমা দেন। হিসাব জমা শেষে রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আমাদের দলের ২০১২ পঞ্জিকা বর্ষের হিসাব জমা দিলাম। আমাদের মোট বার্ষিক আয় ১ কোটি ৭৯ লাখ ১২ হাজার ২৩১ টাকা এবং বার্ষিক ব্যয় ২ কোটি ২৬ লাখ ৯৩ হাজার ১৪৩ টাকা। আয়ের খাত হিসাবে দেখানো হয়েছে প্রাথমিক সদস্য ফি, কেন্দ্রীয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটির সদস্যদের চাঁদা ও বিভিন্ন ব্যক্তির অনুদান। ব্যয় হিসাবে রয়েছে দলীয় কর্মসূচি, অফিসবাবদ খরচ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ইত্যাদি।’ ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা থেকে ঘাটতি ব্যয় পূরণ করা হয়েছে বলে আয়-ব্যয়ের হিসাবে দাবি করা করা হয়েছে।
জাতীয় পার্টির দপ্তর সম্পাদক তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও চেয়াম্যানের উপদেষ্টা বাদল খন্দকারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসাব জমা দেয়। জাতীয় পার্টি ৯ লাখ টাকার ঘাটটিতে আছে।
২৭টি দলের হিসাব জমা
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৭টি দল তাদের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়েছে। দলগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি -জাগপা, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), গণতন্ত্রী পার্টি, গণফোরাম, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, জাকের পার্টি. ন্যাশনাল পিপল্স পার্টি (এনপিপি). বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বি জে পি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, জাতীয় পার্টি (এ), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টি-পিডিপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট।
সময় বৃদ্ধি চেয়ে যে ১০ টি দল আবেদন করেছে সেগুলো হলো-জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এম.এল), ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন, জাতীয় পার্টি-জেপি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্য জোট ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (মতিন)। বেশিরভাগ দল ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়ে আবেদন করে। হিসাব জমা দেয়নি বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ও গণফ্রন্ট।
গত ১১ জুন রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব চেয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে তাগাদা পত্র দেয়া হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, নিবন্ধিত প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই প্রতি বছর ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আগের পঞ্জিকা বছরের আর্থিক লেনদেনের হিসাব কমিশনে জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। ২০০৮ সাল থেকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং প্রতি বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব কমিশনে জমা দেয়ার বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়। এক্ষেত্রে রেজিস্টার্ড চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং ফার্ম দ্বারা দলের হিসাব অডিট করাতে হবে। এ হিসাবে সদস্য সংগ্রহসহ কোন খাত থেকে কত টাকা আয় হয়েছে, কত টাকা ব্যয় হয়েছে, বিল-ভাউচারসহ তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য কমিশনে জমা দিতে হবে।
গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২-এর ৯০-এইচ (১) (সি) ধারার বলা হয়েছে, কোন নিবন্ধিত দল পরপর তিন বছর তথ্য দিতে ব্যর্থ হলে কমিশন সংশ্লিষ্ট দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে।
