সিলেটে উজ্জীবিত ১৮ দল, ‘ভুল’ শুধরে প্রস্তুতি মহাজোটের

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৩, ২২:৪১
২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনেই জয়লাভ করে মহাজোট। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট আগামী নির্বাচনে চাইছে ওই আসনগুলো ফিরে পেতে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিতে অনড় বিএনপির সেই অর্থে সিলেট বিভাগে গত চার বছরে ছিল না তেমন কর্মযজ্ঞ। তবে সিলেট সিটি করপোরেশনসহ চার সিটি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ে এখন উজ্জীবিত স্থানীয় ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা। সংসদ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী মহাজোট হঠাত্ সিটি নির্বাচনে ভরাডুবিতে বিপর্যস্ত। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে স্থানীয় নেতা ও মনোনয়ন প্রত্যাশীরা চুপচাপ সতর্কতার সঙ্গে এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এদিকে গত মঙ্গলবার সিলেটে এক ইফতার পার্টিতে জাতীয় পার্টির নেতা আতিকুর রহমান আতিক বলেছেন, ঈদের পর দলের চেয়ারম্যান এরশাদ সিলেটে এসে সিলেটের ১৯টি আসনে দলের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন। তাই এরশাদের দল মহাজোটে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সিটি নির্বাচনের কিছুদিন পর শুরু হয় রমজান। দলীয় কর্মসূচি নেই। মহাজোটের নেতাকর্মীরা এখন যেন ভরাডুবির কারণগুলো বিশ্লেষণের কিছুটা অবকাশ পেলেন। অনেক নেতা নির্বাচনে নিজেদের ভুল ও মতবিরোধ থেকে শিক্ষা নিয়ে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন। বর্তমান সংসদ সদস্যরা আগামী নির্বাচনেও লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। তবে মনোনয়ন চাইছেন কয়েকজন নতুন মুখ। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা আছে, এটা সত্য। তবে অতীতের ভুলভ্রান্তি ভুলে নেতাকর্মীদের মধ্যে দূরত্ব ঘুচিয়ে দলকে আরো সুসংগঠিত করতে হবে। তা না হলে আগামী নির্বাচনে ভালো ফল আশা করা যাবে না। মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন জানান, দলকে সুসংগঠিত করতে নগরীর ২৭টি ওয়ার্ড কমিটির মধ্যে ১২টির কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাকি ১৫টির কমিটি গঠনে ঈদের পর কাজ শুরু হবে। এদিকে ১৮ দল রমজানে ইফতার ও দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে ব্যাপক গণসংযোগ করছে। এসব কর্মসূচিতে সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, ছাত্রদল নেতা দিনার, জুনেদ ও ইলিয়াস আলীর ড্রাইভার আনসার আলীর গুম হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সিটি নির্বাচনে আরিফুলের জয়টাকে অন্য আরেকটি কারণে বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে ১৮ দল। সিলেট-১ আসনটি সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত। এখানে রয়েছে হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার। এই আসনের এমপি যিনি হন তার দল সরকার গঠন করে-এ রকম একটা ‘মিথ’ চালু আছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। স্বাধীনতার পর থেকে সংসদ নির্বাচনগুলোতে অবশ্য তাই দেখা যাচ্ছে। এজন্য এই আসনের প্রতি জাতীয় নেতাদের অন্যরকম কৌতূহল। সিলেটে ১৯টি আসনেই ১৮ দলীয় জোট জয় পাবে বলে মনে করছে। তাই মনোনয়ন প্রত্যাশীরা কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন। ‘সিলেটের নেতা-কর্মীরা বেগম জিয়ার কঠোর নির্দেশনায় এখন ‘এক ধ্যান-ধারণায় ঐক্যবদ্ধ’ এই মন্তব্য করে সিলেট জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য দিলদার হোসেন সেলিম ইত্তেফাককে বলেন, লন্ডনে তারেক রহমানের বক্তব্যেও ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের নতুন স্বপ্ন দেখছে মানুষ। এখন পরিবর্তন ছাড়া বিকল্প নেই। ঈদের পর সিলেটে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী নির্বাচনে স্থানীয় উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় নানা ইস্যুও প্রাধান্য পাবে। তাই এই বিষয়টি মাথার রেখে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করছে মহাজোট। সিলেট-১ আসন: (সিলেট সদর ও সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ড) ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানকে ৩৮ হাজার ২৬৯ ভোটে হারিয়ে জয়লাভ করেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। তিনি ভোট পান এক লাখ ৭৮ হাজার ৬৩৬টি। আসনটি কোনবারই এক দলের হাতে থাকেনি। ’৭৯ সালে বিএনপি প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মালিক, ৮৬ সালে জাতীয় পার্টির হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী, ’৯১ সালে বিএনপির খন্দকার আব্দুল মালিক, ’৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী ৭২০ ভোটে বিএনপি প্রার্থী এম সাইফুর রহমানকে পরাজিত করেছিলেন। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল মাল মুহিতকে বিএনপি প্রার্থী এম.সাইফুর রহমান ৩৮ হাজার ৭৩৮ ভোটে পরাজিত করেন। এ আসনে আগামী নির্বাচনে ১৮ দলের প্রার্থী হতে পারেন বিএনপি নেতা শমশের মবিন চৌধুরী। এবার সিটি নির্বাচনের পর মবিন চৌধুরীকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে এলাকার লোকজন। এদিকে মুহিত ঢাকায় বলেছেন তিনি আর নির্বাচন নাও করতে পারেন। তবে দলীয় একধিক সূত্র জানায়, আবুল মাল মুহিতই প্রার্থী হবেন মর্যাদার এই আসনে। বয়সজনিত কারণে কিংবা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে যদি তিনি প্রার্থী নাই হন তাহলে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন চৌধুরীকে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে। সিলেট-২ আসন:(বিশ্বনাথের ৮ ইউনিয়ন ও বালাগঞ্জের ১১টি ইউনিয়ন) বর্তমানে শফিকুর রহমান চৌধুরী এই আসনের এমপি। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহেনার হাত ধরে এই আসনে চারদলীয় জোটের প্রভাবশালী নেতা এম ইলিয়াস আলীকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন বিগত নির্বাচনে। কিন্তু এবার ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনা, ইলিয়াসকে ফিরে পেতে আন্দোলন ও সহিংস ঘটনা এবং গুলিতে ৩ ব্যক্তি নিহতের ঘটনা, ৮ ইউপি চেয়ারম্যানের ওপর মামলা ইত্যাদি বিষয় শফিকুর রহমানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তিনি ২০০৮ সালে এম ইলিয়াস আলীকে হারিয়েছিলেন। আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর কথা শোনা গেলেও পরে জানা যায় তার চাকরি সংক্রান্ত বাধার কারণে তিনি সম্ভবত সেদিকে যাবেন না। সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি এম.এ. হক, ইলিয়াস আলীর ভাই যুবদল নেতা আসকীর আলী, যুক্তরাজ্য যুবলীগ নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী। আওয়ামী লীগ নেতা জগলু চৌধুরী দল থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন। এমনকি এই আসনে প্রার্থী নির্বাচনে নাটকীয় পরিবর্তনের কথাও শোনা যাচ্ছে। সিলেট-৩ আসন:(ফেঞ্চুগঞ্জের ৩টি ইউনিয়ন, দক্ষিণ সুরমার ৯টি ইউনিয়ন ও বালাগঞ্জ উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন)। বর্তমান এমপি ১৪ দল প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী কয়েস। তিনি গত নির্বাচনে বিএনপি নেতা শফি আহমদ চৌধুরীকে ৪২ হাজার ৬৩৮ ভোটে পরাজিত করেন। এবারও দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হবেন দলীয় মনোনয় পেলে। এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে যুক্তরাজ্য প্রবাসী মনির আহমদ জোর লবিং করছেন। শিক্ষিত মার্জিত রুচির মনির আহমদ উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন যুক্তরাজ্যে। তিনি বলেন, আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, এলাকার উন্নয়নসহ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। মনির আহমদ ব্রিটেনের একটি কলেজে অধ্যাপনাও করেছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম এম. সাইফুর রহমানের আরেক ঘনিষ্ঠজন যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি কাইয়ূম চৌধুরীও এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী। সিলেট-৪ আসন:(গোয়াইনঘাটের ৮টি, জৈন্তাপুরের ৬টি ও কোম্পানীগঞ্জের ৮টি ইউনিয়ন) বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা ইমরান আহমদ। ভোলাগঞ্জ ও জাফলং-এ পাথর কোয়ারি ধ্বংসে জড়িত সিন্ডিকেট তার নাম ভাঙাচ্ছে। আগামী নির্বাচনে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ১৮ দলের প্রার্থী জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য দিলদার হোসেন সেলিম। সেলিম জৈন্তা সীমান্ত জরিপসহ ইলিয়াস আলী ‘গুম’ পরবর্তী আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তিনি। সরকার বিরোধী আন্দোলনে রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই আসনে গোয়াইনঘাট উপজেলা চেয়ারম্যানও ১৮ দলের নমিনেশন পেতে আগ্রহী। আওয়ামী লীগের যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ফারুক আহমদ ও মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী আব্দুল মুমিন চৌধুরী ১৪ দলের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। সিলেট-৫ আসন:(কানাইঘাট পৌরসভা, ৯টি ইউনিয়ন ও জকিগঞ্জ পৌরসভা, ৯টি ইউনিয়ন) বর্তমান এমপি হাফিজ মজুমদার। দলের কারো কারো সঙ্গে তার দূরত্ব থাকলেও কোন বদনাম নেই তার। এই আসনে জামায়াত নেতা সাবেক সংসদ সদস্য ফরিদউদ্দিন চৌধুরী ১৮ দলের প্রার্থী হতে পারেন। এছাড়া রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড.আহমদ আল কবীরও ১৪ দলের প্রার্থী হতে পারেন। অর্থমন্ত্রীর আত্মীয় ও এনজিও ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তার বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা মাসুকউদ্দিন আহমদও প্রার্থী হতে পারেন। বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান জাপা নেতা শাব্বির আহমদেরও প্রার্থী হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। সিলেট-৬:(বিয়ানীবাজার পৌরসভা, ১১টি ইউনিয়ন ও গোলাপগঞ্জ পৌরসভা, ১১টি ইউনিয়ন) বর্তমান এমপি শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে তিনি পরিচিত। এবারো তিনি প্রার্থী হবেন। গত নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী সৈয়দ ড.মকবুল হোসেনকে তিনি ৮৬ হাজার ৫৮৯ ভোটে পরাজিত করেন। আসনটিতে প্রচুর উন্নয়ন কাজ হয়েছে। আবার এখানে দলের ভিতর রয়েছে নানা গ্রুপিং ও কোন্দল। বিয়ানীবাজারে একযুগ আগে পৌরসভা গঠিত হয়। প্রশাসক দিয়ে চলছে। কিন্তু নির্বাচন হচ্ছে না। এজন্যও মানুষ আশাহত। ছাত্রলীগ-যুবলীগ নিয়েও তিনি বেকায়দায় আছেন। কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিয়ানীবাজার কলেজের একটি অনুষ্ঠানে সংঘর্ষ ও পরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি তাকে বেশ বিব্রত করে। এই আসনে ১৮ দলীয় প্রার্থী বিএনপি নেতা সাবেক এমপি সৈয়দ ড. মকবুল হোসেন ১৮ দলের প্রার্থী হতে পারেন। এছাড়া কানাডা আওয়ামী লীগের সভাপতি সারওয়ার আহমদও ১৪ দলের মনোয়ন চাইতে পারেন।