ত্বকী হত্যাকাণ্ড

তবু ওসমান পরিবারকে দায়ী করার অপচেষ্টার অভিযোগ

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪২
আলোচিত স্কুল ছাত্র তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলা নিয়ে ‘পানি ঘোলা’ করার চেষ্টা হচ্ছে অভিযোগ করেছেন সরকারি দলের নেতারা। তারা অভিযোগ করেছেন, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া এক আসামি ইতিমধ্যে আদালতে জবানবন্দি দিলেও সেটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘুরে-ফিরে এই হত্যাকাণ্ডের দায়ভার নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের উপর চাপানোর অপচেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করছেন তারা। খোদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরাও এ নিয়ে সমালোচনা করছেন বলে জানা গেছে। হত্যাকাণ্ডে নিজের জড়িত থাকার ব্যাপারে আসামি লিটনের স্বীকারোক্তি দেয়ার পরে মামলার বাদী রফিউর রাব্বির ‘সক্রিয় কিলিং মিশন’ তত্ত্ব নিয়ে শহরে চলছে কঠোর সমালোচনা। মামলার বর্তমান তদন্তকারী সংস্থা র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তদন্তের খাতিরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘ত্বকী হত্যাকাণ্ড নিয়ে অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণ করার ফলে শুরু থেকেই তদন্তে বিরূপ প্রভাব পড়েছে বলে আমরা মনে করি। তবে মামলাটি আমাদের কাছে আসার পরে কিছু বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘প্রথমত আমরা খতিয়ে দেখছি ত্বকীর পরিবারের কোন অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে কিনা। রফিউর রাব্বির ভাই ওয়াহিদ রেজার ছেলে অর্নব ওয়াহিদের আহত হওয়ার ঘটনাটিকে গুলির ঘটনা বলে দাবি করা হয়েছিল। রাব্বিও বলেছিলেন, ত্বকী হত্যা ও এই ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা। অথচ গত ১৯ মে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের চিকিত্সা তত্ত্বাবধায়ক প্রেরিত ওই মামলার মেডিকেল রিপোর্টে (স্মারক নম্বর-৫৭৫৫) বলা হয়েছে অর্নবের আঘাত ছিল অত্যন্ত সামান্য এবং গুলির কোন আলামত চিকিত্সকরা পাননি। যদিও অর্নবের পিতা সেটিকে গুলির ঘটনা বলে মামলা করেছিলেন। অর্নব একজন মাদকসেবী বলেও আমরা জানতে পেরেছি। তাহলে এই নাটক সাজানো হল কেন? তাছাড়া ত্বকী হত্যার পেছনে কোন মেয়ে ঘটিত বিষয় ছিল কিনা তাও আমরা খতিয়ে দেখছি।’ জানা গেছে, ত্বকী হত্যা মামলায় জামিনে থাকা ইউসুফ হোসেন লিটনকে র্যাব-১১ এর একটি দল সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে মাদক মামলায় আদালতে পাঠায়। গত সোমবার নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিন আহমেদের খাস কামরায় লিটন ত্বকী হত্যা মামলায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। জবানবন্দির শুরুতেই লিটন উল্লেখ করেন, ‘আমি ইয়াবার বিষয়ে কিছুই জানি না। তবে আমি ত্বকীর ব্যাপারে জানি এবং কিছু বলতে চাই। আমি অনুতপ্ত এবং অনুশোচনা থেকে নিজের দোষ স্বীকার করছি।’ লিটন বলেন, ‘গত ৬ মার্চ আমি হাজী রিপনের ছেলে সীমান্তের বাসায় যাই। রাজীবের সাথে আমার গার্মেন্টস ব্যবসা ছিল এবং টাকা আনতেই সীমান্তের বাসায় যাই। সেখানে আমি অপু, ভ্রমর, কালাম সিকদার, সীমান্ত ও একটি ছেলেকে দেখতে পাই। ছেলেটিকে আমি চিনি না। কিছুক্ষণ পরে আমি পাশের ঘরে মারধরের শব্দ শুনতে পাই। ওই ঘরে গিয়ে দেখি রাজীব ও ভ্রমর ছেলেটিকে গজারির লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে। পরে রাজীবের কথায় আমি ছেলেটির পিঠে ২/৩ টি বাড়ি দেই। মারধরের কারণে ছেলেটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এরপর কালাম শিকদার ছেলেটির বুকে উপর উঠে গলা টিপে ধরে। ৩/৪ মিনিট পরে ছেলেটি মারা যায়। তখন সময় ছিল রাত ১১টা। তখন আমি জানতে পারি ছেলেটির নাম ত্বকী। রাত সোয়া ১১টার দিকে আমি, কালাম শিকদার ও ভ্রমর লাশটি ভ্রমরের গাড়ীর পেছনে করে চারারগোপ এলাকায় নিয়ে যাই। তিনজন মিলে ত্বকীর লাশ ব্যাগে ভরে নৌকায় তুলি। লাশ নিয়ে কুমুদিনী খালে যাই এবং লাশ ব্যাগ থেকে বের করে পানিতে ফেলে দেই। এ সময় ত্বকীর পরনে প্যান্ট, শার্ট ও পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল ছিল। কালাম শিকদার ব্যাগে ইট ভরে পানিতে ফেলে দেয়। এরপর আমি বাসায় চলে যাই এবং ভ্রমর ও কালাম একত্রে চলে যায়।’ এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় কিছু গণমাধ্যমে লিটনের স্বীকারোক্তি নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ পেলে এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একটি সূত্রে জানা গেছে, লিটনের সাথে ত্বকীর ভাই অর্নবের বেশ সখ্য ছিল। তাছাড়া লিটনের জবানবন্দিতে উঠে আসা কালাম শিকদার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রভাবশালী ঠিকাদার আবু সুফিয়ানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে জানা গেছে। গতকাল শহরের সুশীল শ্রেণির মানুষদের সাথে কথা বললে তারা জানান, ত্বকীর মত মেধাবী ছাত্র খুন হওয়ায় তারা কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু এই হত্যার পরপরই মেয়র আইভী ও ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি হত্যার জন্য সরাসরি শামীম ওসমান ও তার পরিবারকে দায়ী করে আসছেন। রাব্বি এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি শামীম ওসমান ও তার ছেলে অংশ নিয়েছে বলেও লিখিত দিয়েছেন। এমনকি গত চার মাসে হত্যাকাণ্ডকে জড়িয়ে সরকার ও খোদ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে পর্যন্ত বিষোদগার করেছেন আইভী ও রাব্বি। শামীম ওসমানদের হাত কেটে ফেলা, দাউদকান্দি পাঠিয়ে দেয়া, বাড়ির ইট খুলে নিয়ে আসাসহ নানা সন্ত্রাসমূলক বক্তব্যও দিয়েছেন তারা। কিন্তু এখন যখন প্রমাণ হল এই হত্যাকাণ্ডে তারা জড়িত নন, তখন নতুন করে শুরু হওয়া নোংরামির খেলা বন্ধ হওয়া উচিত। জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ও বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দীপু বলেছেন, ত্বকী হত্যার পর থেকেই এর দায়ভার শামীম ওসমান ও তার পরিবারের উপর চাপানো হচ্ছে। এই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া রিফাত নামে এক যুবককে নির্যাতন চালিয়ে ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। এবার লিটনের দেয়া জবানবন্দি নিয়েও মিথ্যাচার চালিয়ে ওসমান পরিবারের উপর দোষ চাপানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা জানান, লিটনের দেয়া জবানবন্দির পরে জনরোষ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বিশাল অংকের টাকা নিয়ে মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে মাঠে নেমেছেন অনেকে। লিটনের দেয়া জবানবন্দি অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক। তিনি বলেন, ত্বকী হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শাস্তি হোক, তা আমরাও চাই। কিন্তু এ জন্য কোন পরিবারকে দায়ী করা উদ্দেশ্যমূলক।