সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এটিএম শামসুল হুদা বলেছেন, ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে ৯১-ই ধারা অন্তর্ভুক্ত করার কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনে পাঁচবার তফসিল পরিবর্তন করা হয়। কারণ খালেদা জিয়া নির্বাচনে আসছিলেন না। তিনি আরপিওর ৯১-ই ধারা বাতিলসহ চারটি শর্ত দিয়েছিলেন। আর আমরা চেয়েছিলাম এটা রাখতে। অবশেষে আমরা এটা রাখতে সমর্থ হই। আর বর্তমান কমিশন এই ধারাটি বিসর্জন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক।’ বর্তমান নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে পাওয়া অর্জন বাদ হবে কেন?’
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘নির্বাচনী আইনের সংস্কার: আমরা কোথায়?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এটিএম শামসুল হুদা এসব কথা বলেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সংগঠনের সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান। প্রবন্ধ পাঠ করেন সংগঠনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
গোলটেবিল বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে অংশ নেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, কলামিস্ট অজয় রায়, লেখক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রমুখ।
সুন্দর নির্বাচন করতে গেলে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সুসম্পর্ক রাখতে হয় উল্লেখ করে শামসুল হুদা বলেন, আইনের পরিবর্তন এককভাবে করলে হবে না। এখানে রাজনৈতিক দলের মতামত নিতে হবে। অন্যান্য পক্ষেরও মতামত নেয়া জরুরি।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে সাবেক এই সিইসি বলেন, ‘বর্তমান কমিশনের দেড় বছরে কোনো কর্মচারীর পদোন্নতি হয়নি। আমাদের সময়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বেশ কয়েক জায়গায় রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিলাম। যার সুফলও পেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের গালাগালির মুখে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) চর্চা করেছিলাম এবং নারায়ণগঞ্জের মতো জটিল নির্বাচন আমরা করেছি। যেখানে আফগানিস্তানেও ইভিএম-এ ভোটগ্রহণ হয়, সেখানে আমাদের মতো দেশে সেই ধারা অব্যাহত থাকেনি।’ সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দুর্নাম রয়েছে, তারা গণনায় ভুল করে। কিন্তু ইভিএম-এ ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থী বলে কোনো কথা নেই। এই কমিশন একটি দলের সঙ্গে আলোচনা করার পরে এই ‘বিদ্রোহী’ কথা উঠেছে। নির্বাচন সুশৃঙ্খল করার জন্য আইন সংশোধন করা যেতে পারে। ব্যয়সীমার ক্ষেত্রে ১৫ লাখ টাকায় একজন প্রার্থীর কিছু হয় না। ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও শক্ত মনিটরিং করা দরকার।
তিনি বলেন, ‘ব্যালট পেপারে মার্কিং করা এক বিপজ্জনক বিষয়। এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনে শাস্তির বিষয়ে আলোচনা করা উচিত। কেননা ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে অনেক ক্ষমতা রয়েছে। যদি কেউ ব্যালট পেপার চুরি করে নিয়ে যায়, সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট প্রভাবিত হয়ে একশ টাকা ফাইন (জরিমানা) নিয়ে ছেড়ে দিতে পারেন। অথচ ব্যালট পেপার ছিনতাই বড় ধরনের অপরাধ।’
‘না-ভোট’ আবারও ব্যালটে আনা উচিত বলে উল্লেখ করে সাবেক কমিশনার এম. সাখাওয়াত বলেন, ‘না-ভোটটি আরেকবার আনা উচিত। নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের যে সিভিল ফোর্স আছে, তাতে সংকুলান হয় না। এজন্য সেনাবাহিনী প্রয়োজন। সেনাবাহিনী ছাড়া আমাদের দেশে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন কঠিন থেকে কঠিনতর!’
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যদি বাস্তবে কোনো প্রয়োগ না থাকে, তাহলে লাভ নেই। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের হাতের চেয়ে বিএনপি-আওয়ামী লীগের হাত অনেক বড়।’
কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন নির্বাচন নীতিমালা খসড়ায় আরপিওর ৪১টি ছোট-বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। সেখানে জনমত, বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক দলের মতামত গ্রহণ করা হয়নি। এককভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক চেতনাবিরোধী, অন্যদিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নির্বাচন নীতিমালার সংশোধন কেবল রাজনৈতিক বিষয় নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ও।’
