নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না :ইসির কৌঁসুলি
আপিল নিষ্পত্তি পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে :ব্যারিস্টার রাজ্জাক
রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধনকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত বলে ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেনের সভাপতিত্বে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কাজী রেজাউল হককে নিয়ে গঠিত হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় দেয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক জামায়াতে ইসলামীকে দেয়া নিবন্ধন অবৈধ। এর কোন আইনি ভিত্তি নেই। তাই এটিকে বাতিল ঘোষণা করা হলো। ঘোষিত এ রায়ের সঙ্গে বেঞ্চের তিন বিচারপতির মধ্যে দুই জন একমত হয়েছেন। একজন বিচারপতি এ রায়ে একমত পোষণ করেননি। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, ‘বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন না থাকলে কোন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না। তাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এ রায় বহাল থাকলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অংশগ্রহণ করতে পারবে না।’ তবে জামায়াত ইতিমধ্যেই এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। রায়ের পরই দলটি ও তার অঙ্গ সংগঠন দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর চালিয়েছে। পাশাপাশি ঈদের পর টানা দুই দিনের হরতালের ডাক দিয়েছে।
এদিকে রায়ের বিরুদ্ধে সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে জামায়াতকে সরাসরি আপিলের অনুমতি দিয়েছে হাইকোর্ট। সরাসরি আপিলের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রেই তিন বিচারপতিই একমত পোষণ করেছেন। অনুমতি পাওয়ার পরই হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন জানান জামায়াতের নিবন্ধন সংক্রান্ত মামলার প্রধান কৌসুলি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। এরপরই তার নেতৃত্বে একদল আইনজীবী চেম্বার জজ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের আদালতে যান। আদালতের কার্য দিবস শেষ হওয়ায় আবেদনটি শুনতে অপারগতা প্রকাশ করেন ওই বিচারপতি।
পরে ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, এ রায় ন্যায়ভ্রস্ট ও ভুল রায়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছি। এক্ষেত্রে আমি মনে করি আমরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবো। আর আপিল বিভাগ স্থগিত করলেতো পারবোই। তবে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সকলকেই অপেক্ষা করতে হবে। এ রায় জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর প্রভাব ফেলবে না বলে তিন মত ব্যক্ত করেন।
অপরদিকে ইসির কৌসুলি এডভোকেট মহসীন রশীদ বলেন, এ রায়ের ফলে জামায়াত ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের আইনে একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সেগুলোও তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
প্রসঙ্গত ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে দেয়া নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ, আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান’র সভাপতি হুমায়ূন কবির, সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হাসানসহ ২৫ ব্যক্তি। ওই রিটের শুনানি শেষে ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি এ রিট আবেদনের ওপর বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক (পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি মো. আবদুল হাইয়ের হাইকোর্ট বেঞ্চ জামায়াতের নিবন্ধনের বৈধতার প্রশ্নে রুল জারি করেন। রুলে রাজনৈতিক দল হিসেবে ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর ইসিতে দাখিলকৃত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০বি(১)(বি)(২) ও ৯০(সি) ধারার লঙ্ঘন ঘোষণা করা হবে না মর্মে জানতে চাওয়া হয়। জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে রিট আবেদনের ওপর চূড়ান্ত শুনানির লক্ষ্যে একটি বেঞ্চ নির্ধারণ করে দিতে প্রধান বিচারতির কাছে আবেদন করেন রিট আবেদনকারীগণের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেনের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চকে রুলের ওপর শুনানির জন্য এখতিয়ার প্রদান করেন প্রধান বিচারপতি। গত ১০ মার্চ আবেদনটি শুনানির জন্য উত্থাপিত হলে এই আবেদনের সঙ্গে সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্ন জড়িত থাকায় বৃহত্তর বেঞ্চ গঠনের জন্য বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠায় হাইকোর্টের ওই ডিভিশন বেঞ্চ। এরপর প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেন। ওই বেঞ্চেই গত এপ্রিল মাসে রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়। আদালতে আবেদনের পক্ষে ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, ইসির পক্ষে এডভোকেট মহসিন রশিদ এবং জামায়াতের পক্ষে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন শুনানি করেন। শুনানি শেষ হয় গত ১২ জুন। শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
গতকাল হাইকোর্টের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় মামলাটি রায়ের জন্য আসে। দুপুর আড়াইটার বিচারকরা এজলাসে আসেন। এরপর বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন উপস্থিত উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘শুধুমাত্র রায়ের আদেশের অংশটুকু পড়ে শোনানো হবে।’এরপরই ইংরেজিতে আদেশের সংক্ষিপ্ত অংশ ঘোষণা করেন তিনি। এতে বলা হয়, “বাই মেজরিটি, রুল ইজ মেইড অ্যাবসিলিউট অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন গিভেন টু জামায়াত বাই ইলেকশন কমিশন ইজ ডিক্লিয়ার্ড ইল্লিগ্যাল অ্যান্ড ভয়েড।” (জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ও বাতিল ঘোষিত করা হল)। এর পরই জামায়াতের অন্যতম কৌঁসুলি ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন আদালতকে বলেন, এ মামলার সঙ্গে সাংবিধানিক প্রশ্ন এবং জনস্বার্থ জড়িত। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের জন্য সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সার্টিফিকেট ইস্যুর আবেদন জানাচ্ছি। এসময় সার্টিফিকেট ইস্যুর ব্যাপারে তিন বিচারপতি একমত পোষণ করে আদেশ দেন। এরপরই বিচারপতিরা এজলাশ ত্যাগ করেন।
এদিকে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করার পর দলটির ভবিষ্যত্ নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামায়াতের নিবন্ধনের ইস্যুর নিষ্পত্তিতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। আদালত ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সার্টিফিকেট ইস্যু করায় এ বিষয়টির চূড়ান্ত সুরাহা নিশ্চিতভাবেই আপিল বিভাগে হবে। কারণ সংবিধানের ১০৩(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘হাইকোর্ট বিভাগের রায়, ডিক্রি আদেশ বা দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের নিকট সেই ক্ষেত্রে অধিকার বলে আপিল করা যাইবে, যেক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগ- ক) এই মর্মে সার্টিফিকেট দান করিবেন যে, মামলাটির সহিত এই সংবিধান ব্যাখ্যার বিষয়ে আইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত রহিয়াছে।’
রিট আবেদনে যা বলা হয়েছিলো
আবেদনে বলা হয়, চার কারণে জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসাবে নিবন্ধন পেতে পারে না। কারণ জামায়াত নীতিগতভাবে জনগণকে সকল ক্ষমতার উত্স বলে মনে করে না। সেই সঙ্গে আইন প্রণয়নে জনপ্রতিনিধিদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকেও স্বীকার করে না। জামায়াত একটি সাম্প্রদায়িক দল। কিন্তু গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুসারে কোনো সাম্প্রদায়িক দল নিবন্ধন পেতে পারে না। আবেদনে আরো বলা হয়, নিবন্ধন পাওয়া রাজনৈতিক দল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের কোনো বৈষম্য করতে পারবে না। কিন্তু জামায়াতের শীর্ষ পদে কখনো কোনো নারী বা অমুসলিম যেতে পারবেন না। আবেদনে বলা হয়, কোনো রাজনৈতিক দলের বিদেশে কোনো শাখা থাকতে পারবে না। অথচ জামায়াত বিদেশের একটি সংগঠনের শাখা। তারা স্বীকারই করে, তাদের জন্ম ভারতে। বিশ্বজুড়ে তাদের শাখা রয়েছে। রিটে বলা হয়, জামায়াতের গঠনতন্ত্র সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য ও সাংঘর্ষিক। এ কারণে দলটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পেতে পারে না। এছাড়া সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, ধর্ম ও ইসলামের নামে কোন রাজনৈতিক দল থাকতে পারবে না। কিন্তু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য কৌশলগতভাবে নামের কিছুটা পরিবর্তন করলেও জামায়াতে ইসলামী ‘ইসলাম’ শব্দটি রয়ে গেছে। যার কারণে মনে করি সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশেই ইসলামকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই দলটির নিবন্ধনের বিপক্ষে আবেদনকারীরা অবস্থান নিয়েছেন। এছাড়া দলটির সংশোধিত গঠনতন্ত্র জামায়াতের মজলিশে শুরায় অনুমোদন হয়নি বিধায় নিবন্ধন করার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই বলে আবেদনকারীরা দাবি করেছেন।
উল্লেখ্য জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে রুল জারির পর ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে একবার, ২০১০ সালের জুলাই ও নভেম্বরে দু’বার এবং ২০১২ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে দু’বার দলটি তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়। এসব সংশোধনীতে দলের নাম ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ করা হয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার
এদিকে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে গতকাল সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। হাইকোর্টের এনেক্স ভবনের প্রবেশপথে মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক পুলিশ। এছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও ছিলো কড়া নজরদারি। রায় ঘোষণার পূর্বে আদালত কক্ষের সামনে বসানো হয় আর্চওয়ে। আইনজীবী, সাংবাদিক ও রিটকারীগণ ছাড়া অন্য কাউকেই ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।
