সব বাধা পেরিয়ে

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৩, ১৭:৪১
সমাজের নিম্নস্তরে বাস করা মানেই কেবল পিছিয়ে থাকা তেমনটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। সনু রানী দাস আমাদের এ কথাটিরই প্রমাণ দিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের এই তরুণী মেথরপট্টিতে জন্ম নিয়েও জায়গা করে নিয়েছেন এখন আন্তর্জাতিক কাতারে। বিভিন্ন দেশে দেশি-বিদেশি সংস্থার হয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। অধিকার আদায়েও তার ভূমিকা সব সময়ই প্রশংসনীয় ছিল। এবারের অন্য তারুণ্যে তিনি শুনিয়েছেন তার পথচলার গল্প, সব বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে চলার কাহিনী। তার সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র নারায়ণগঞ্জের ৩৩ নম্বর মেথরপট্টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষা জীবন শুরু করেন সনু। স্কুলটি তাদের এলাকায় ছিল, কাজেই নিজের পরিবেশের বাইরে বের হয়ে কাজ করার চিন্তা তখনও করেননি। তারপর পঞ্চম শ্রেণী পাস করে গণবিদ্যানিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকেই এসএসসি পাস করেন। মাঝে মাঝে তার বাবা-মা ভাবতেন এত পড়ালেখা করে কী আর হবে? সনু ভালো ফলাফল করে তাদের মনে উত্সাহ জোগাতেন। সনু সবসময় মা-বাবাকে বুঝিয়েছেন, পড়ালেখা সবার জন্যই জরুরি। আর এসএসসিতে ভালো ফলাফল করে নিজের মহল্লায় তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। সবাই অন্য দৃষ্টিতে দেখেন সনুকে। এমনকি নিজের লোকদের কাছেও তার গুরুত্ব বেড়ে যায়। কোনো কাজে সনুকে ডাকা হতো সবার আগে। সব কাজে সনুর শিক্ষকরাও উত্সাহ দিতেন। আর তারাও এমন ফলাফল দেখে তাকে কলেজে ভর্তি করে দিতে বলেন। তারপর তিনি নারায়ণগঞ্জ কলেজে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে এইচএসসি পাস করেন। এইচএসসি যখন পড়েন তখন একদিন তাদের এলাকার ক্লাবে বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটসের কয়েকজন কর্মী এবং নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন আসেন। তারাই মূলত শিক্ষিত সমাজের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন তার। তাদের হাত ধরেই গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম সম্পর্কে ধারণা জন্মে তার। আর সে সময়ই পরীক্ষা দিয়ে গ্লোবাল এক্সচেঞ্জের আওতায় স্কটল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ হয় তার। আর এভাবেই বাইরের দেশের মানুষের সাথে তার পরিচয় ঘটে। নিজেদের সমস্যাগুলো সবার সামনে তুলে ধরার প্রয়াসের শুরু এভাবেই। এরপর জাতিসংঘের হ্যাবিটেট প্রোগ্রামের প্রতিনিধি হয়ে বাংলাদেশ থেকে তিনি ব্রাজিল ভ্রমণ করেন। এতেও তার প্রাপ্তি অনেক বেড়ে যায়। বিভিন্ন ভাষায় তো বটেই, বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। এরপর একুশতম মানবাধিকার সম্মেলনে জেনেভায় যান সনু। সেখানে তিনি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে আরও জানতে পারেন। সনু রানী দাস মনে করেন তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি আশাবাদী। তারা যদি এর সাথে আরও পরিশ্রমী হয়ে ওঠে তবে জয় তাদের হবেই। আর জীবনে চলার পথে বাধা তো আসবেই। কিন্তু সেই বাধা পেরিয়ে যেতে হলে নিজের আত্মবিশাস থাকা চাই। এর জন্য পড়াশোনাটা সবার আগে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। সব কাজে হয়তো সবার সমর্থন পাওয়া যায় না, কিন্তু চেষ্টা করতে হবে যেন সবার মতামত নিয়ে কাজ করা যায়, তাহলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। আর সরকারেরও পিছিয়ে পড়াদের সামনে আনতে নানাভাবে সাহায্য করা উচিত। আর সনু নিজের জায়গা থেকে তার সম্প্রদায়ের জন্য অনেক কাজ করতে চান। সনু রানী দাস স্বপ্ন দেখেন দেশের জন্য কাজ করবেন, দেশের মানুষের জন্য কিছু করবেন। সনু রানী দাস মনে করেন, সমাজে যে অবিচার আর দুঃশাসন রয়েছে, সেগুলো পেরিয়ে যেতে হবে নিজের যোগ্যতায়। প্রতিবন্ধকতাগুলো টপকে যেতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। ভয়ের জন্যই আমরা সব সময় পিছিয়ে পড়ি। নতুন কোনো উদ্যোগে সমাজের অনেকেই হয়তো কটাক্ষ করবে সব সময়, এটার জন্য বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। কারণ সাফল্য এলে এই কটাক্ষকারীরাই বাহ্বা দেবে। একজন সনু রানী দাস কেবল তার সম্প্রদায়ের নয়, আমাদের সবার অধিকার নিয়ে কথা বলবেন, বিশ্বের দরবারে আমাদেরকে পৌঁছে দেবেন। সে যাত্রায় তার এগিয়ে যাওয়াকে আমরা সাধুবাদ জানাই।