কিশোরী মেয়েটির কিছুই ছিল না। একসময় শুধু তার দক্ষতাকে সম্বল করে এগিয়ে যান। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে পড়েন সফলতার চূড়ায়। খুব ছোট কাজ দিয়ে শুরু করেও সফলতা পান তিনি। তার সাফল্যের গল্পটি জানাচ্ছেন প্রাঞ্জল সেলিম
প্রায় চার বছর আগের কথা, ১৫ বছর বয়সী এক মেয়ে, লিন্ডার জীবনটা ছিল নিঃসঙ্গতা আর দারিদ্রতায় ঘেরা। তবে তার জীবনটা শুরু থেকেই এমন ছিল না। তার জীবনে অনেক সুখ ছিল। ছিল বাবা-মায়ের ভালোবাসা। ছিল ভাই-বোনের ভালোবাসা। হঠাত্ এক দুর্ঘটনায় তার মা মারা গেলেন। তার বাবা হারালেন তাদের সমস্ত সম্পত্তি। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচের পর তাদের জন্য খাবার জোগানোই তার জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। খরচ সামলাতে না পেরে তিনি ছেলেকে একটি খামারে কাজ করতে দেন। আর দুই মেয়ের একজনকে সাথে নিয়ে চলে যান অজানা কোথাও। অপরজন থেকে যায় সেখানেই। অবহেলায় পড়ে থাকে মেয়েটি। পেটের দায়ে মেয়েটি একসময় পাড়ি দেয় নিউইয়র্ক শহরে। বলা যায় সেখানে থেকেই বদলে যায় তার ভাগ্য। শুরুতে পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। একদিন এক পথিক তাকে রাস্তার পাশে বসে থাকতে দেখলেন। তার খুব মায়া হলো, শীতের সময় মেয়েটা এভাবে পড়ে আছে দেখে। তিনি মেয়েটিকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। এভাবে অনেকেই সাহায্য করে তাকে। মেয়েটি একসময় উপলদ্ধি করে সে এ পৃথিবীতে একা নন। আশপাশে অনেকে আছেন যারা তার থেকেও সুবিধাবঞ্চিত। তিনি ১৮ বছর বয়সে পা দিয়েই সিদ্ধান্ত নেন, এভাবে আর পড়ে থাকা নয়, সরাসরি জীবনযুদ্ধে নামতে হবে। তিনি তখন বিমানবন্দরে পারফিউম কর্নারে কাজ শুরু করেন। এক সময় জড়িয়ে যান বিবিসি’র সাথে। সেই মেয়েটি আজ একজন মার্কিন টেলিভিশন পারসোনালিটি লিন্ডা। তিনি প্রথম টেলিভিশনের পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন, বিবিসি ট্রেড ডকুমেন্ট্রিসের মাধ্যমে। সেখানে তিনি আন্তর্জাতিক শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। এই একটি ইস্যুই তাকে সবার কাছে তাকে পরিচিত করে তোলে। এরপর এমন অনেক সেবামূলক কাজের সাথে তিনি জড়িয়ে পড়েন। তার কাজের জন্য বিভিন্ন স্তরে অভ্যর্থনাও পেয়েছেন। তার মূল লক্ষ্য হলো, স্বাভাবিকভাবে যাতে শিশুরা তাদের স্বপ্নীল জীবন যাপন করতে পারে সে জন্য কাজ করে যাওয়া। তার এ কাজের স্বার্থে বেশ কয়েকবার তাকে বিবিসির রিপোর্টিংও করতে হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি কিছু রিয়েল লাইফ সিরিজেও অংশ নিয়েছেন। যা তাকে আরও বেশি করে হাইলাইটেড হতে সাহায্য করেছে। এই রিয়েল লাইফ সিরিজগুলো ছিল ফ্যাশন ডকুমেন্টরি নিয়ে। নানা প্রতিকূলতার মাঝে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। পড়েছেন আইন নিয়ে। লেখাপড়ার পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন তার কাজ। নির্মাণ করেছেন বেশকিছু ডকুমেন্টারি। এর প্রথমটি ছিল শিশু সৈনিকদের নিয়ে। ‘ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক কঙ্গো’ নিয়ে করা হয়েছিল ডকুমেন্টারিটি। এরপরের প্রোগ্রামটি হয়রানির শিকার শিশুদের নিয়ে করেছিলেন। কম্বোডিয়ার প্রেক্ষাপটে তৈরি করেছেন এই ডকুমেন্টারিটি। তিনি তার চোখে দেখা দুর্দশার বয়ান দিয়েছেন এসব ছবিতে। কম্বোডিয়ায় শিশু মেয়েদের দিয়ে মদের কারখানায় ও দোকানে জোরপূর্বক কাজ করানো হয়। এখানে তাদের নানারকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এ ক্ষেত্রে সে দেশের সমাজ ও আইনও নিরব ভূমিকা পালন করে। এই মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়েই লিন্ডা ডকুমেন্টারি তৈরি করেন। ডকুমেন্টারিটি প্রচারের পরপরই তা সারাবিশ্বকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়। কম্বোডিয়ার এই নির্যাতিত মেয়েদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসে নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। একই সাথে লিন্ডাও সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়ে যান। একজন সাধারণ দোকানি থেকে টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা লিন্ডা নিজের সম্পর্কে বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল আর দৃঢ় আত্মবিশ্বাসীই এই স্বপ্নগুলোকে একদিন সত্য করবে বলে আমার বিশ্বাস।’
