কুমিল্লায় নদী-খাল-বিলে অবৈধ দখল বাড়ছে

তালিকায় ২৭৩৪ দখলদার দুই মাসেও উচ্ছেদ হয়নি!

আপডেট : ১৪ মে ২০১৯, ২১:৪৭

দখলে-দূষণে অনেকটা বিলীন হওয়ার পথে কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকার সরকারি অধিকাংশ খাল ও নদীর পাড়। একটি অসাধু চক্র এসব সম্পত্তি দখলে নিয়ে পাকা, আধাপাকা ও টিনশেড বিপণিবিতান, বাড়িঘর ও দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করে নিজে অথবা ভাড়াটিয়া দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করছেন। সম্প্রতি নদী কমিশনের তত্পরতার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। কুমিল্লা জেলা প্রশাসন থেকে ২ হাজার ৭ শ এর বেশি অবৈধ দখলদারের তালিকা করা হয়েছে। কিন্তু ওই তালিকা তৈরির দুই মাস পেরিয়ে গেলেও উচ্ছেদ অভিযান এখনো শুরু করা হয়নি। জেলা প্রশাসক বলছেন, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য মন্ত্রণালয়ে বাজেট চাওয়া হয়েছে, পাওয়া গেলেই অভিযান শুরু করা হবে।

সরেজমিন ঘুরে ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, জেলার ১৭টি উপজেলা ও ৮টি পৌর এলাকার গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়ক এবং হাটবাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালগুলো দখলের মহোত্সব চলছে। দীর্ঘসময় ধরে প্রশাসনের সঠিক নজরদারি না থাকায় অসাধু শ্রেণির রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় একে একে দখল হয়ে যাচ্ছে এ জেলার গোমতী, ডাকাতিয়া ও কাঁকড়ি নদীসহ খাল-বিলের সরকারি অধিকাংশ সম্পত্তি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলার চৌদ্দগ্রামের কাঁকড়ি নদী এলাকার অন্তত ১৫ জন বাসিন্দা ও কৃষক জানান, অবৈধ স্থাপনা ও বর্জ্যে নাব্য হারানোর পাশাপাশি সরু হয়ে যাচ্ছে নদী ও খাল। এতে পানি নিষ্কাষণ না হওয়ায় এসব নদী ও খালের অধিকাংশই এখন দখলে দূষণে দুর্গন্ধযুক্ত পানি, আবর্জনা আর কচুরিপানায় ভরে গেছে। এতে মানুষের দুর্ভোগ বাড়লেও প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারছে না।

এদিকে সম্প্রতি নদী কমিশনের তত্পরতার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। কুমিল্লা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলার খাল-বিল ও নদী অবৈধ দখলদারের ২ হাজার ৭৩৪ জনের একটি তালিকা করা হয়েছে। এরমধ্যে আদর্শ সদর উপজেলায় ৯৩৭ জন, চৌদ্দগ্রামে ১২৫ জন, চান্দিনায় ১৭৩ জন, বরুড়ায় ১৪ জন, বুড়িচংয়ে ৪২৭ জন, নাঙ্গলকোটে ৫৮ জন, ব্রাহ্মণপাড়ায় ৩৩৫ জন, দেবিদ্বারে ১৫২ জন, দাউদকান্দিতে ১৩০ জন, লাকসামে ৭৬ জন, তিতাসে ৭ জন, মুরাদনগরে ৯৯ জন, মনোহরগঞ্জে ২০১জন অবৈধ দখলদার রয়েছে।

জেলার চান্দিনা উপজেলার বাড়েরা গ্রামের ষাটের দশকের শিক্ষক আবদুল বারেক ভূঁইয়া বলেন, ‘একসময় খালে ছোট-বড় অনেক নৌকা চলাচল করতো, এসব নৌকায় করে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ধান, পাটসহ নানা কৃষিপণ্য ও মালামাল কম খরচে পরিবহন করতেন।

বরুড়া উপজেলার মহেশপুর গ্রামের বয়োবৃদ্ধ বজলুর রহমান বলেন, ‘বাজার কিংবা জনবহুল এলাকায় খালের পাড় দখল করে কাঠ-বাঁশ কিংবা সিমেন্টের পিলার দিয়ে খালের ওপর গড়ে তুলেছে দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা। দখলদারদের কবলে পড়ে ধীরে ধীরে সরু হয়ে অনেক এলাকায় এখন খালের চিহ্নও বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

জেলার বরুড়া পৌরসভার মেয়র জসিম উদ্দিন পাটোয়ারিসহ একাধিক পৌরসভার মেয়র বলেন, খাল ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত ও জেলা পরিষদের আওতায়। এ কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তবে খাল উদ্ধারে তারা প্রশাসনকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কুমিল্লা পওর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘গোমতী, ডাকাতিয়া ও কাঁকড়ি নদীসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে খাল-বিলের সরকারি জায়গা দখল করে রেখেছে অনেক অবৈধ দখলদার। অবৈধ দখলদারের সাথে কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, ‘সরকারি খাল-বিল ও নদীর জায়গা অবৈধভাবে দখলকারী ২ হাজার ৭৩৪ জনের একটি তালিকা করা হয়েছে, প্রয়োজনে আরও তালিকা করা হবে। এছাড়া অবৈধ দখলদারদের নোটিস দেয়ার পর কেউ যদি জায়গার মালিকানা দাবি করে কাগজপত্র প্রদর্শন করে তা যাচাই-বাছাই করার জন্যও কমিটি গঠন করা হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য মন্ত্রণালয়ে বাজেট চাওয়া হয়েছে, তা পাওয়া গেলেই অভিযান শুরু করা হবে।