একজন ফ্যাশন উদ্যোক্তাকে সবকিছু বুঝতে হবে, জানতে হবে। সময়, সামাজিক প্রেক্ষাপট, আবহাওয়া, গ্রাহকের পছন্দ-অপছন্দ—সবকিছুই উদ্যোক্তার মনে রাখা একান্ত জরুরি। এই সবকিছুর সুষুম সমন্বয়ে গড়ে উঠে একজন সফল ফ্যাশন উদ্যোক্তা। স্টুডিও এমদাদ-এর ডিজাইনার ও কর্ণধার এমদাদ হক তেমনই একজন সফল ফ্যাশন উদ্যোক্তা, সৌন্দর্যের প্রতি যার ভালোলাগা ছিল অহর্নিশ। তাকে নিয়েই আমাদের এবারের আয়োজন।
এমদাদ হক
ডাক নাম :চীনা
জন্ম তারিখ ও স্থান :২৬ নভেম্বর ১৯৬৮
মায়ের নাম :মরিয়ম বেগম
বাবার নাম :মোজ্জাম্মেল হক
প্রথম স্কুল :উদয়ন উচ্চবিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :আমার একান্নবর্তী পরিবার
প্রিয় উক্তি :নিজেকে জানো।
প্রিয় পোশাক :পাঞ্জাবি
অবসর কাটে যেভাবে :আড্ডা, বই পড়া, পরিবারের সাথে সময় কাটানো।
সাফল্যের সংজ্ঞা :যুদ্ধ-পরিশ্রম-একনিষ্ঠা।
ফ্যাশন সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু এমদাদ হক তার ক্যারিয়ার শুরু করেন সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘বিচিত্রা’য়। তখন তিনি উচ্চমাধ্যমিকে পড়েন। তখনই তার মনে হয়েছে ফ্যাশন নিয়ে কাজ করবেন। বিপণন নিয়ে পড়বেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেভাবে পরিকল্পনা করেছেন সেভাবেই এগিয়েছে তার জীবন। তার ডিজাইন করা পোশাক সবাই পড়ছে এটাই তার কাছে বড় প্রাপ্তি। ডিজাইন ফর ম্যাস পিপল—এমন তত্ত্বেই বিশ্বাসী তিনি।
এমদাদ হক বড় হয়েছেন উর্দু রোডের ৯ নম্বর হায়দার বক্স লেনে তার নানার বাড়িতে। যে বাসায় তিনি থেকেছেন এর বয়স এক শ বছর। পুরোনো বাসার গন্ে কেটেছে সময়। বড় ছাদ, আকাশ দেখা যায় এটাই ছিল তার আনন্দ। বিকেল হলে ঘুড়ি উড়ানোর স্মৃতি এখনো তাকে ভাবায়। মাধ্যমিক পর্যন্ত ছিলেন কঠোর নিয়মে বাবার অনুশাসনে। উচ্চমাধ্যমিক থেকে শুরু হয় তার কর্মজীবন। ‘বিচিত্রা’ ছিল তার পুরোনো আড্ডার স্থান। শাহাদাত চৌধুরীর সংস্পর্েশ কেটে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক, গ্রামীণ জীবন। এরপর শুধুই পথচলা। এক ছেলে ‘ওসামা’ ও স্ত্রী ‘দীপ্তি’কে নিয়ে প্রায় পনের বছরের সংসার তার এখনও একান্নবর্তী পরিবারেই আছেন। এটা তাদের অনেক বড় শক্তি বলে মনে করেন। বড় বসবাস, বড় প্রেম, খোলা আকাশ, পুরোনো গন্, অবিচ্ছন্ন যানজট, গভীর রাতের গরম চা—এসবই তার অতীত ও বর্তমান। এই ব্যবসায় সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় কোনটি বলে আপনি মনে করেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে এমদাদ হক বলেন, ‘ক্রেতারা যখন আমার পোশাক পরে ও প্রশংসা করে। মন্দ বললে কষ্ট পাই তবে ভুলগুলো শুদ্ধ করতে চেষ্টা করি।’ আর একজন ফ্যাশন উদ্যোক্তা হিসেবে ক্রেতাদের জন্য তার ভাবনার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ক্রেতার মূল সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই, কারণ ক্রেতাদের নিয়েই কাজ ও ভাবনা।’
এবারের ঈদ কেন্দ্র করে ক্রেতাদের নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। এবার প্রথম স্টুডিও এমদাদ নামে পণ্য আসছে উত্তরার ক্রেতাদের জন্য। ট্রেনডি অথচ ট্টেডিশনাল এমন ধরনে করা হয়েছে পোশাকগুলো। স্ট্রাইপ পাঞ্জাবি, লং ড্রেস, দেশি শাড়ি সবই থাকবে স্টুডিও এমদাদে।
এই প্রজন্মের নতুন ফ্যাশন উদ্যোক্তাদের সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই কাজের প্রতি আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী এখনকার ছেলেমেয়েরা। কিন্তু আস্তে আস্তে এই ক্ষেত্রটা আরও অনেক বেশি পরিপূর্ণ হচ্ছে। তবে এ পেশার পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যে বা সবার মাঝে জানান দেওয়ার জন্য অনেকদিন ধরে সফলভাবে যারা এই পেশাতে কাজ করছেন তারা অগ্রণী ভূমিকাটা নিতে পারেন। এ কারণে সবার প্রথমেই ধৈর্য ধরতে হবে। আর যারা এই ব্যবসায় আসতে চায়, তাদের জন্য আমার পরামর্শ হচ্ছে, ফ্যাশন নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে, গ্রামগঞ্জে, ফিল্ডে যেতে হবে আর নিজের দেশকে জানার আগ্রহ ও সংস্কৃতি সর্ম্পকে ব্যাপক ধারণা অর্জন করতে হবে। ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রয়োজন পণ্যের মান নিশ্চিত করা, লোগো ও কালার থিম নিয়ে ভাবা এবং ক্রেতার পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়া। তবে ফ্যাশন ফোরকাস্টিংয়ের বিষয়ে তীক্ষ্ম ধারণা না থাকলে অন্যান্য ব্র্যান্ডের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। পাশাপাশি এজন্য প্রয়োজন হবে পণ্য সামগ্রীর বিক্রেতা, ডিজাইন স্বাতন্ত্র্য, কাপড়ের গুণাগুণ, আলোকচিত্রী, সেলসম্যান, ফ্যাশন সাংবাদিকসহ সকলের অকুণ্ঠ সমর্থন। এবারের ঈদকে কেন্দ্র করে মেনজ ক্লাবে থাকছে পাঞ্জাবি, শার্ট, ডিজাইন শার্ট, ফরমাল প্যান্ট, জিন্স, জুতা, পলো ও টি-শার্টসহ নানা ফ্যাশন এক্সেসরিজ। এবার পাঞ্জাবির ডিজাইনে প্রাধান্য পেয়েছে মেশিন এমব্রয়ডারি। পাশাপাশি কলিদার আর একসাটের পাঞ্জাবিতে থাকছে লং আর সেমি লং কম্বিনেশন। ফিট আর স্লিম ফিটের শার্টে থাকছে ফেব্রিক ভেরিয়েশন। এ ছাড়াও শার্টে ফিউশন এনে এবার ব্যাপারি শার্ট নামে বিশেষ ডিজাইন আনা হয়েছে ঈদ আয়োজনে।
সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার স্টুডিও এমদাদ ও ফ্যাশন পাঠশালা যেন সমান্তরাল রেললাইনের মতো এগিয়ে যায় এটাই আমার স্বপ্ন। আমি বেঁচে থাকতে চাই আমার এই কর্মযজ্ঞের মাঝে। আমি হারিয়ে যেতে চাই না এই সুন্দর পৃথিবী থেকে।’
