শৈশবে খুবই দুরন্ত ছিলেন তিনি। সবাই চোখে চোখে রাখত তাকে, কারণ ফাঁকি দিয়ে অঘটন ঘটানোই ছিল তার কাজ। তবে সবার খুব আদরেরও ছিলেন হয়তো এ কারণে। জানালেন, খেলাধুলা, স্কাউটিং, সাংস্কৃতিক সংগঠন আর লেখাপড়া নিয়ে শৈশব বেশ আনন্দেই কেটেছে তার। সেই দুরন্ত ছেলেটি আজ একজন গবেষেক। প্রায় দুই বছর গবেষণা করে একটি কৃষক-বান্ধব বাষ্পীয় তাপ দ্বারা ফল ও সবজি শোধন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। বলছিলাম মেধাবী উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. ফারুক বিন হোসেন সম্পর্কে। এই মেধাবীজনকে নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার, ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দিপু
২০০৫-০৬ সালে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র থাকাকালীন মাস্টার্সের সুপারভাইজার এবং কো-সুপারভাইজার নিজের বিভাগেরই দুজন শিক্ষক নতুন স্বপ্ন দিলেন তাকে, শিক্ষক করে তাদের কাছে রাখতে চাইলেন প্রিয় শিক্ষার্থীকে। শিক্ষার্থীটি স্বপ্নে বিভোর, মনে মনে দিন গুনছেন, কবে মাস্টার্স শেষ হবে। এরমধ্যে বিআরআরআই’তে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার যোগদানপত্র পেয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলেন শিক্ষার্থীটি। কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। তার প্রিয় মানুষটির শরণাপন্ন হলেন, পেয়ে গেলেন সমাধান—ভবিষ্যত্ সুযোগের অপেক্ষায় প্রহর না গুনে বর্তমান সুযোগের সদ্ব্যবহারই শ্রেয়। যোগদান করলেন আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র রহমতপুরে।
আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র রহমতপুরে কাজ শুরুর কিছু দিনের মধ্যেই কেন্দ্র প্রধানের সুনজরে পড়লেন। তিনি ১৫০ একরের খামার তত্ত্বাবধায়কের অতিরিক্ত দায়িত্ব কাঁধে চাপিয়ে দিলেন। দায়িত্বটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন ফারুক। শুরু হলো যোগ্যতা প্রমাণে অক্লান্ত পরিশ্রম। একদিকে উদ্যানতাত্ত্বিক গবেষণা সম্পাদন, অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়কের কঠিন দায়িত্ব। বছর খানেকের মধ্যেই কেন্দ্রে পরিবর্তনের সুবাতাস বইতে শুরু করল। তবে তা বেশি দিন টিকল না। স্বভাবসুলভভাবেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেন দুর্নীতিবাজ আর অব্যবস্থাপনাকারীদের সাথে। টিকে থাকার লড়াই চলল তিন বছর। অতঃপর তাদের হীন আক্রমণে রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হলেন। তল্পিতল্পা গুটিয়ে এক বছর কুমিল্লা কেন্দ্রে কাটালেন। এরপর ২০১০ সালে উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, গাজীপুরে যোগদান করেন। এ সময়গুলোতে শিখেছেন শক্তি, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ নয়, কর্ম এমন এক হাতিয়ার যা দিয়ে সমুচিত জবাব দেওয়া যায়। তাই গবেষণা কাজে পুরো মনোনিবেশ করলেন। নিজের গল্পটি শুরু করলেন এভাবে, ‘বাজার থেকে পরিবারের বৃদ্ধ বাবা-মা অথবা সন্তানদের জন্য যখন কোনো খাবার কিনতে যাই তখন ফল, সবজি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম অথবা কোনো প্যাকেটজাত পণ্য হাতে নিয়ে বারবার ভাবি, তাদের মুখে কী তুলে দিচ্ছি—খাদ্য নাকি বিষ। তারপরও কিনতে বাধ্য হই। আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করছি।’ তাই বিষের বিকল্প হিসেবে দু’বছর গবেষণা করে একটি কৃষক-বান্ধব বাষ্পীয় তাপ দ্বারা ফল ও সবজি শোধন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন মো. ফারুক বিন হোসেন। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ফরমালিন বা বিষ প্রয়োগ ছাড়াই ফল ও সবজির সংগ্রহোত্তর পচন এবং পোকা দমন সম্ভব। বর্তমানে প্রযুক্তিটির মানোন্নয়ন চলছে। দু-এক বছরের মধ্যে ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে। এ ছাড়া বিষমুক্ত ফসল উত্পাদনের জন্য ৬টি পোকা দমন ফাঁদের সমন্বয়ে ২টি আধুনিক সৌরবিদ্যুত্ চালিত কম্বাইন্ড ইনসেক্ট ট্র্যাপ উদ্ভাবন করছেন তিনি। বর্তমানে এটির মাঠ পর্যায়ে দক্ষতা যাচাইয়ের কার্যক্রম চলছে। তারা আরেকটি বিস্ময়কর উদ্ভাবন—মাটির রস পরিমাপক যন্ত্র। কম্বাইন্ড ইনসেক্ট ট্র্যাপ নিয়ে কাজ করার সময় বিদ্যুত্ পরিবাহিতার একটি ধর্ম তাকে প্রলুব্ধ করে, সেই ধর্ম ব্যবহার করেই এটি উদ্ভাবিত হয়েছে। যন্ত্রটি কৃষক-বান্ধব, সরাসরি মাঠে বহন ও ব্যবহার যোগ্য। বর্তমানে যন্ত্রটির মান নির্ধারণের কাজ চলছে। আশা করছি সফল হলে কৃষকদের ফসল উত্পাদনে সেচের খরচ প্রায় অর্ধেক কমে যাবে। একটি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে বর্তমানে গবেষণা চলছে, যা কেমিক্যাল ব্যবহার না করে ফল পাকানো, পচন রোধে ফল ও সবজি শোধন, বীজ শোধন, শীতকালীন সবজির বীজ দ্রুত গজানো ও ক্ষেত্রবিশেষে সংরক্ষণাগার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এ ছাড়া নোনা জলের নদী, বিল এবং পুকুরে ফসল উত্পাদন কৌশল উদ্ভাবনের জন্য কয়েকটি অবকাঠামো তৈরি করেছেন মো. ফারুক বিন হোসেন, যেগুলোর স্থায়িত্ব ও সক্ষমতা যাচাই চলছে।
বর্তমানে বাবা-মা, স্ত্রী, নিজের ছেলে, দুই ভাই, ভাইদের বৌ এবং ছোট ভাইয়ের একটি মেয়ে নিয়ে মো. ফারুক বিন হোসেনের যৌথ পরিবার। স্ত্রী মোছা. সাদিয়া আরফিন উদ্যানতত্ত্ববিদ ও কৃষি বিজ্ঞানী। সবশেষে তার স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে ফারুক বলেন, আমার একটি গবেষণাগার থাকবে। সেখানে যেকোনো মানুষ যা ইচ্ছে তাই নিয়ে গবেষণা করতে পারবে। আমার গবেষণাগার তার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মানুষ তার স্বপ্ন নিয়ে আসবে আমরা সবাই মিলে তার বাস্তব রূপ দেব। নতুন কিছু উদ্ভাবিত হবে, দেশ
এগিয়ে যাবে।’
