আবাসন ও পরিবহনের চরম সংকটে

দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বিদ্যাপীঠ সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:০৩
ফরিদপুর শহর ও শহরতলিতে দুটি পৃথক ক্যাম্পাস আর ২০ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী নিয়ে চলছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্ বিদ্যাপীঠ সরকারী রাজেন্দ্র কলেজ। ঐতিহ্য ও আয়তনে প্রতিষ্ঠানটি যেমন বড়, তেমনি সংকটেরও কমতি নেই বিশ্ববিদ্যালয় হতে যাওয়া কলেজটির। ২০.৫৫ একরের উপর অবস্থিত কলেজটির বর্তমানে মুল ও প্রধান সমস্যা হচ্ছে হোষ্টেল ও পরিবহন সমস্যা। সরেজমিনে কলেজ ঘুরে সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাথে কথা বলে জানাযায়, ২০ হাজার ছাত্রছাত্রীর জন্য থাকা মাত্র ৬টি হোষ্টেলে ১ হাজার শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকছে। শহরের বিভিন্ন বেসরকারী ছাত্রাবাস, মেসবাড়ি ও ভাড়া বাসায় চরম সংকটনিয়ে বাধ্য হয়ে থাকছে প্রায় হাজার দশেকেরও বেশী ছাত্রছাত্রী। ছাত্রদের হোষ্টেল কাজী নজরুল ইসলাম, অম্বিকা চরণ মজুমদার, কবি জসীমউদদীন ও হাজী শরীয়তুল্লাহ এবং ছাত্রী হোষ্টেল মমতাজ জসীমউদদীন ও শেখ হাসিনায় মাত্র ৬শ আসন। বেশীর ভাগ আসনেই নিয়মের বাইরে এক বেডে ২জন করে মোট হাজার বারশো শিক্ষার্থী থাকছে। এই সংখ্যা আবাসন চাহিদার তুলনায় ৫ ভাগের একভাগ মাত্র। অপরদিকে যেসকল ছাত্র-ছাত্রীরা মেস ভাড়ায় থাকাদের বাড়ির মালিকের মর্জিমত চলতে হয়, প্রায়ই একতরফা ভাবে তারা ভাড়া বাড়িয়ে দেন, যে রুমে ২ জন থাকা যায়না সেসব রুমে তারা নূন্যতম ৪ জন রাখেন। “বাড়ির মালিকেরা যেভাবে ভাড়া বাড়াচ্ছে আর মিল খরচ যেভাবে বাড়ছে তাতে অনার্স শেষ করে বাড়ি যেতে পারবো কিনা জানিনা” সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে এমন অভিযোগ করেন মেসে থাকা একাধীক শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীরা জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-এর ৪ বছরের কোর্স শেষ করতে সময় লাগে ৭ বছর। অনেক অভিবাভকের পক্ষেই এই লম্বা শিক্ষাজীবনের খরচ বহন করা সম্ভব হয়না। কলেজে আবাসিক সুবিধা থাকলে অন্তত তাদের কিছুটা উপশম হতো। ৬ টি বিষয় নিয়ে শুরু করে বর্তমানে কলেজটিতে ১৮ টি বিষয়ে অনার্স করার সুযোগ রয়েছে। বিষয়গুলো হচ্ছে বাংলা, ইংরেজী, ইতিহাস, ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি, রাস্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান, সমাজকর্ম, হিসাব বিজ্ঞান, ব্যাবস্থাপনা, ফিন্যান্স, রষায়ন, পদার্থবিদ্যা, গনিত, উদ্ভিদ বিদ্যা, প্রানীবিদ্যা ও ভুগোল। এছাড়া রয়েছে ডিগ্রী পাসকোর্স করার সুবিধা এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর চালুকরা হয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর। কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরের শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয় পুরোনো ক্যাম্পাস শহরের ঝিলটুলীতে। এটিই প্রতিষ্ঠালগ্নের মুল ক্যাম্পাস। আর অনাসের্র ক্লাস থেকে শুরু করে সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয় শহরতলীর বায়তুলামান ক্যাম্পাসে। শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন বাহনে করে ঝিলটুলীর ক্যাম্পাস পর্যন্ত আসলেও শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দুরে বায়তুল আমান এলাকায় অনার্স ও মাষ্টার্সশাখার ক্যাম্পাসে যেতে ঘটে বিপত্তি। সেখানে যাবার জন্য কলেজের নিজস্ব ৪টি বাস ও ২টি ভাড়ায়চালিত বাস থাকলেও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার তুলনায় তা একাবারেই নগন্য। শিক্ষার্থীরা সময়মত বায়তুল আমান ক্যাম্পাসে পৌছতে পারেনা শুধুমাত্র পরিবহন সংকটের কারনে । আর কলেজের ২ ক্যাম্পাসের ভেতরকার যাতায়াতের রাস্তা পর্যাপ্ত প্রশস্ত না হওয়ায় বড় বাসগুলোকে ঝুকি নিয়ে চলাচল করতে হয় সেই রাস্তায়। ফলে রিক্সা, ভ্যান বা অটো রিক্সায় বাধ্য হয়ে চলাচলকারী ছাত্রছাত্রীদের প্রতিনিয়তই ছোটখাট দূর্ঘটনার শিকার হতে হয়। চাহিদার তুলনায় মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ শিক্ষার্থী বাসে যাতায়াত করার সুযোগ পায়, বাকিরা হয় রাস্তায় ভোগান্তিতে পরে নতুবা ক্লাস বাদ দিয়ে শহরের ক্যাম্পাসে বসে থাকে। ভোগান্তি যে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের তা নয়, এক ক্যাম্পাস থেকে আরেক ক্যাম্পাসে যেতে ভোগান্তিতে পরেন শিক্ষকেরাও। জানা গেছে শিক্ষকদের পরিবহনের জন্য একটি মাইক্রোবাস থাকলেও ১৭০ জন শিক্ষকের জন্য তা মোটেও যথেস্ট নয়। এ কারনে অনেক সময় শিক্ষকেরা সঠিক সময় ক্লাসে হাজির হতে পারেন না। আর যেদিন পরীক্ষা থাকে সেদিন মাইক্রোবাসটি পরীক্ষার খাতা ও প্রশ্ন পরিবহনের কাজে ব্যাবহার করা হয় বলে ঔদিন সকল শিক্ষককেই নিজস্ব উপায় অবলস্বন করে কলেজে আসতে হয়।কলেজের যে ৪ টি বাস রয়েছে তার সবকটি মাসে ১ বার থেকে ২ বার মেরামতের জন্য গ্যারেজে থাকে। কোন কোন সময় এর মেয়াদ আরো বাড়ে। জানা গেছে, ৪ টি বাসের মধ্যে দুটি দিয়েছিলেন হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালীন আর অন্য দুটি বাসের একটি এসেছে খালেদা জিয়ার প্রথম ক্ষমতা থাকাকালীন সময় আর অন্যটি চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ দিয়েছেন ৯৬ সালে। এর মাঝে মেয়েদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে স্বরন নামের ৩২ সিটের একটি মিনিবাস যদিও ৩০ ভাগের উপর মেয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে। বাকী বাসগুলোতে ছেলে মেয়ে উভয়ের জন্য বরাদ্দ। আর শিক্ষকদের পরিবহনের জন্য রয়েছে ১৪ সিটের একটি মাইক্রোবাস।কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মাহাবুবুর রহমান এই প্রতিবেদককে জানান, আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে মাত্র ৫ ভাগ শিক্ষার্থী হোস্টেল সুবিধা ও মাত্র ২ ভাগ শিক্ষার্থী পরিবহন সুবিধা পায়। তিনি বলেন ইচ্ছে থাকা সত্বেও আমরা শিক্ষার্থীদের সুযোগ সুবিধা দিতে পারছিনা। ২০ হাজার শিক্ষার্থীর রয়েছে মাত্র ৬ টি বাস তার দুটি আবার ভাড়া করা। আমাদের যে হোস্টেল রয়েছে তাতে আমরা সর্বোচ্চো হাজার খানেক শিক্ষার্থীকে আবাসিক সুবিধা দিতে পারি। তিনি আরো বলেন, মাননীয় শ্রমমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে সরকারের তরফ থেকে ১০ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার একটি বাজেট এনে দিয়েছেন। যা দিয়ে চারতলা একটি একাডেমিক ভবন, ১০০ আসন বিশিস্ট একটি ছাত্রী হোস্টেল ও একটি ছাত্র হোস্টেল তৈরী করা হবে। চলতি অর্থবছরেই এর কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান। কলেজের উন্নয়নে আর কিকি প্রয়োজন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কলেজের উন্নয়ন ও শিক্ষাব্যাবস্থাকে আরো গতিশীল করতে আরো একটি একটি একাডেমিক ভবন, একটি অডিটোরিয়াম, নূন্যতম আরো ৫ টি গাড়ি, ক্যাম্পাস থেকে ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের পরিবহনের জন্য ১ টি মিনিবাস, উভয় ক্যাম্পাসে বাউন্ডারী দেয়াল, সাইন্সল্যাবের জন্য আধুনিক বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামাদী জরুরী হয়ে পরেছে।উল্লেখ্য ১৯১৫ সালে ফরিদপুরের অন্যতম জমিদার সমাজসেবক অম্বিকাচরণ মজুমদার শহরে কলেজটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তার এই উদ্যোগে বর্তমান সদরপুর উপজেলার বাইশ রশির জমিদার রমেশ চন্দ্র চৌধুরী সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। রমেশ চন্দ্রের পিতা রাজেন্দ্র চন্দ্র চৌধুরীর নামে ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠা পায় রাজেন্দ্র কলেজ। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করা হয় ১৯৬৮ সালে। জানাগেছে ১৯২৩ সালে ইংরেজী, দর্শন ও গনিতসহ কয়েকটি বিষয়ে অনার্সকোর্স চালু হয় এখানে। ৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মফস্বলের কলেজে অনার্স কোর্স বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, ফলে ১৯৪৯ সালে বন্ধ হয়ে যায় রাজেন্দ্র কলেজের অনার্স পড়ানো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৭১/৭২ শিক্ষাবর্ষে পুনরায় চালু হয় অনার্স পাঠদান, যার ধারাবাহিতকায় বর্তমানে কলেজটিতে ১৮টি বিষয়ে অনার্স-মাষ্টার্স পড়ানো হচ্ছে।ফরিদপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য ও শ্রমমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমপ্রতি একাধীক অনুষ্ঠানে রাজেন্দ্র কলেজকে পূর্নাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষনা দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় হলে হয়তো এই সকল সমস্যার উন্নতি হবে , কিন্তু ২০ হাজার শিক্ষার্থীর বর্তমান সমস্যা আবাসন, পরিবহন ও শিক্ষক সংকটের কোন সমাধান করার উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি, যা অচিরেই নেয় উচিত বলে মনে করেন কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। ছাত্রছাত্রীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনামকে ম্লান করে দিচ্ছে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।