গল্প

পুরোনো পারফিউম

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৩, ১৭:৫৩
মানুষ একা ঘরে থাকলে এমন কিছু আচরণ করে যা অন্যসময় তার ব্যক্তিত্বের সাথে পুরোই বেমানান। মইন এক সপ্তাহ ধরে বাড়ি ফিরে কাপড় না বদলে ঘুমায়, ইচ্ছেমতো রাত জাগে, ডিমের হালি-গ্যাসের বিলের আলাপের বদলে বই-পত্র নিয়ে নাড়াচারা করে, বিশাল বিশাল দলা পাকিয়ে মুখের প্রতিটি জায়গা ব্যবহার করে ভাত খায়। এই যে সৌমিকের বই হাতে নিয়ে খাটে শুয়ে আছে—এই দৃশ্য দেখলে দীপা চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকত। ছেলে কোন ক্লাসে পড়ে—এই কথা যার মাথা চুলকে মনে করতে হয়, সেই মানুষ ক্লাস সেভেনের বই হাতে নিয়ে শুয়ে আছে! তবে এই মুহূর্তে যে কাজটা করছে, এটা বড় ধরনের অপরাধ নিয়শ্চই। তবু আনন্দময় অপরাধ উপভোগ্য। সৌমিকের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ওকে নিয়ে দীপা গেছে বাবার বাড়ি। সুযোগ পেয়ে উত্তরার অ্যাপার্টমেন্টকে সাময়িক মোহসিন হল বানিয়ে তুলেছে মইন। পা দুলিয়ে বই পড়তে পড়তে শোবার ঘরে ছাই পোড়ানো হচ্ছে বিবাহিত পুরুষের রাজ্য জয়ের অনুভূতি। সৌমিকের প্রাণিজগত্ বইটায় বেশকিছু মজার তথ্য আছে। বাবুই পাখি তার বাসায় জোনাকি পোকা আটকে আলো বানায়। মৌমাছি মধু না পেলে কীভাবে কাকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এমন বই সারারাত ধরে পড়া যায়, কিন্তু ঘুমানো দরকার, ভোরে অফিস। রুমের ভেতর ধোঁয়া আটকে থাকায় মাথ্যাব্যাথা হতে পারে ভেবে সে সব জানালা-দরজা খুলে দিল। দিনের শেষ সিগারেট ধরালো বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বাড়িটা শেষ মাথায় হওয়ায় একটা সুবিধে হলো বারান্দা থেকে পুরো গলি দেখা যায়। গাড়ির ফেলে যাওয়া লাল আলো অনেকটা সময় ধরে লেগে থাকে চোখে। একা থাকার কিছু ঝামেলা থাকলেও একটা নিষ্ঠুর আনন্দ রয়েছে, আর এই আনন্দটা নেশার মতো। কালও অনেক রাত পর্যন্ত সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখেছে, কুকুরগুলো এ মাথা থেকে ও মাথা হাঁটাহাঁটি করছে। রাতে ফেরার পথে কোনো কোনোদিন গাড়ি থেকে নেমে দিনের শেষ আগুনটা ধরালে ওরা পেছন পেছন আসে। সৌমিকই একদিন বলেছিল, জানো বাবা, আমরা যেমন পোষা প্রাণীর নাম দিই ওদেরও তেমনি সার্কেল আছে। নিজেদের মধ্যে কোন মানুষটা ভালো, কে ওকে বাজারের ব্যাগ কামড়ে দিয়েছে বলে রোববারে লাথি মেরেছে, সে-সব আলোচনা করে। কীভাবে জানলে জিজ্ঞেস করতে বলল, অ্যানিমেল ফার্ম নামের বইতে পড়েছি। ওর মা শুনলে নির্ঘাত বাবার মতো ছেলেও একটা অপদার্থ হচ্ছে বলে কয়েক দফা চোখের পানি ফেলবে হা ভবিষ্যি হা ভবিষ্যি করে! ঘরে ফ্যান ছেড়ে বারান্দায় দাঁড়াল মইন। কুয়াশা পড়ছে হালকা। গলির মুখের ঠান্ডা বাতাস এড়াতে কুকুরগুলো আজ বাড়ির সামনে ঘুরছে। একপাশে দুটো নারকেল গাছ তারই ছায়া বাউন্ডারি পেরিয়ে লম্বা হয়ে ঢুকে পড়েছে বারান্দায়। চিরুনির মতো সেই ছায়া পাতারা কেঁপে কেঁপে ওঠে বাতাস পেয়ে। ওদিকে তাকিয়ে তাকিয়েই শেষ টান দিল মইন। গ্রিলের ভেতর দিয়ে ছুড়ে দিয়ে ঢুকল ভেতরে। মাঝরাত হয়ে গেছে, বিছানায় গা দিতেই চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল প্রায়। ঠিক তখনই বাজল ফোনটা। হ্যালো। বন্ধু, আমি নাইম, তুই কি এখনো উত্তরা থাকিস? নাইম? বাংলাদেশে? কবে আসছিস? কবে না বল কখন আসছি? তোর বাসার ঠিকানাটা দে। মইন ঠিকানা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে বল তো? শোন, তোর বাসায় আসছি অসুবিধা নেই তো? এসে ডিটেইল বলছি। কোনো অসুবিধা নেই। একাই আছি আয়। মনে মনে ভাবল, ভাগ্যিস আজই এসেছে। নাইমের সাথে গতবছর একবার কথা হয়েছিল এরপর আর যোগাযোগ নেই। নাইম থাকে শিকাগোয়। সেই পাস করে যখন ওরা চাকরিতে ঢোকে তখনই চলে গিয়েছে। নাইম হলো ব্যাচের সেই ছেলেটা যে জীবনকে হাসতে হাসতে উড়িয়ে দিতে জানে। সকাল ১০টা থেকে পরীক্ষা শুরু হলে ও ঘুম থেকে উঠত এগারোটায়। যেকোনো সুন্দরী মেয়ে দেখলে তার প্রেমে পড়ে যেত। সবাই চাকরিতে ঢুকলেও, ও তখনো বেকার। তারপর একদিন হুট করে চলে গেল আমেরিকায়। প্রথম দিকে মাঝে মাঝে ফোন করত। এপাশের আগ্রহ কম বুঝে যোগাযোগটা বন্ধ হয়ে যায়। গত বছর ডায়েরিতে জন্মদিনটা চোখে পড়ায় ফোন দিয়েছিল মইন। ও তো হাসতে হাসতেই শেষ—‘দোস্ত, সত্যি একটা কথা বলি, ইউনির্ভাসিটিতে থাকতে তোরা যে জন্মদিন জানতি, ওইটা আসলে সার্টিফিকেটের। উইশ করতি, মজাই লাগত’। বলল, কয়েকদিনের জন্য দেশে আসবে। তাও তো বছরখানেক হবে, আর যোগাযোগ হয়নি। ও কোথায় নম্বর পেল, কে জানে। এয়ারপোর্ট থেকে বাসা খুব বেশি দূরে না। আসার আগেই টাওয়ালের সাথে হাত মোছার ময়লা রুমাল ভাঁজ করে ড্রয়ারে রাখল, সোফার নিচ থেকে বালিশ টেনে বের করল, চায়ের কাপ কাম অ্যাশট্রেটা ধুয়ে ফেলেছে আগেই। যতদূর সম্ভব নাইমকে বোঝানো যে, তাদের সংসার ভালোই চলছে। এর মধ্যে গেট থেকে ফোন। পুরোপুরি রাজকাপুরের মতো জুতো-কোট পরে দাঁড়িয়ে আছে নাইম। ছোট্ট একটা ট্রলি স্যুটকেস নিয়ে ঢুকেছে। এত রাতে খেতে দেবে কী মনে মনে ভাবছে মইন। ও-ই বলল, ‘প্লেনে খেয়ে নিছি। তারপরও খিদে লাগলে বাটার বোন আর কলা খাব হলের মতো। তোর বাসায় মুড়ি আছেনা?’ হলে তারা পাশাপাশি রুমে থাকত। মইন একটু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো, এসব ভুলিসনি? বিদেশ গেলেই কি মানুষ সব ভুলে যায়! মইন একটা হোঁচট খেল। তবে কি ও সব মনে রেখেছে! এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘ফ্রেশ হয়ে নে চা বানাই।’ বসল টিভি-রুমেই। জানাল, হঠাত্ করেই এক সপ্তাহের জন্য আসা। মইন জিজ্ঞেস করতে পারছে না, মোহাম্মদপুর না ফিরে এখানে কেন এল? নাইম আগের মতোই সপ্রতিভ। বলল, ‘সকালে বনানীতে কাজ আছে, এখান থেকে কাছে। তবে আম্মার কাছেই যাবার প্ল্যান ছিল, কোনো ট্যাক্সিকে অত রাতে বিশ্বাস করতে পারলাম না। ভাবলাম, তোদের ফোন করি।’ তবে মইন মনে মনে আশ্চর্য হয়েছে, ও দীপা বা সৌমিকের কথা এখনো কিছু জানতে চায়নি। ভালোই হয়েছে দীপা বাসায় থাকলে হয়তো যেকোনভাবেই হোক পাশ কাটাতে হতো। নাইম বললো, ‘মইন, একদিন পুরোনো বন্ধুদের সাথে বসা দরকার। তুই অ্যারেঞ্জ কর। ভালো কথা, একটা জিনিস এনেছিলাম। তোর বাজির প্রাইজ।’ কোন বাজি? তোর নাটুকে ভাবটা এখনো আছে! দোস্ত, জীবনটাই তো একটা নাটক। দেখ, দীপা আজ তোর বউ—এটা একটা বিশাল নাটক না? মনে মনে যা ভয় পেয়েছিল তা-ই। ব্যাচের সবাই মোটামুটি জানত, নাইম দীপাকে পছন্দ করে। প্রথম দিকে সবাই ভাবত, দীপাও অপছন্দ করে না। পলাশীতে দু-একবার এক রিকশায় দেখাও গিয়েছে তাদের। কিন্তু দীপার যে কী হলো! মাস্টার্সের শেষের দিকে এসে একদিন মইনকে সরাসরি জানিয়ে দিল পছন্দের কথা। কী দেখল এক দরিদ্র সাংবাদিকের মধ্যে, দীপাই জানে। প্রসঙ্গটা অস্বস্তির বলে এ নিয়ে নাইমের সাথে কোনোদিনও কথা হয়নি। এমনকি তাদের সংসারেও না। দীপা শুধু একবারই বলেছিল, নাইম খুব এলোমেলো আর কোনো বিষয়ে সিরিয়াস না। এমন মানুষের ওপর নির্ভর করা যায় না। বিয়ের পর ফারুক এক আড্ডায় হাসতে হাসতে বলে বসেছিল, দীপাকে না পেয়ে নাইম দেশান্তরি। মইন আর নাইমকে দীপার প্রসঙ্গে আগাতে না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী এনেছিস?’ তোর মনে আছে? আজিমপুর গোরস্তান নিয়ে বাজি ছিল? বলেছিলি, ভয় পাস না বিশ্বাসও করিস না? মনে পড়েছে, এখনো বিশ্বাস করি না। সেই বাজিতে যে হারবে তার অন্যজনকে পারফিউম দেওয়ার কথা ছিল। হুম। কিন্তু সেটা তো দিসনি। মাঝখান থেকে সারারাত গোরস্তানে বসিয়ে হুপিংকাশির মতো বাঁধিয়ে দিলি। তোর জন্য একটা পারফিউম এনেছি। ব্র্যান্ডটা স্পেশাল, নিজে ইউজ করি। আর জানিস তো পারফিউমের ব্যাপারে একটা দুর্বলতা বরাবরই আছে। যে পুরুষের নারীপ্রীতি থাকে সে সুগন্ধি ভালো না বেসে পারে না। এখনো নারী প্রীতি আছে? থাকবে না? বলিস কী, বেঁচে থাকার মূল ইনস্পেরেশন সুন্দর রমণীদের মুখ ও সুগন্ধি। শুধু কি দামি শিশির পারফিউম? দেখ, প্রতিটা মানুষেরও আলাদা একটা ঘ্রাণ থাকে। আর টাকা-পয়সা বা সুখ দুটোই কিন্তু বড় সুগন্ধি বন্ধু, হাতে এলে ভুরভুর করে গন্ধ বের হয়। ইচ্ছে করলেও তুই ঢাকতে পারবি না। বোতলজাতকরণেরও অনেক আগে থেকে প্রাচীন ব্যবিলনে নারীরা সুগন্ধি ব্যবহার করত জানিস তো? কিন্তু সেই আমলে কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছিল? এসব আমার বিষয় না—কীভাবে ব্যবহার করত? তুই শালা বেরসিকই থেকে গেলি, ওরা এক ধরনের গাছের শিকড় কোমরে বেঁধে রাখত, যা থেকে সুগন্ধ ছড়াত। ভাব ওদের প্রেমিকদের কী অবস্থা হতো? তুই ভাব। ভাত জোগাড় করতে যাদের ঘামের পারফিউম বের হয়, তাদের আবার সুগন্ধি-চর্চা। তোর জন্য যেটা এনেছি এটা খুব স্পেশাল। তোর সাথে আমার তুলনা। এতদিন আগের সেই বাজি মনে রেখেছিস, ধুর, এর চেয়ে বরং কিছু চকলেট আনতি। আরে ব্যাটা তুই এখনো চকলেট খাস! আমার ছেলে খুশি হতো। কামলা মানুষ এত দামি পারফিউম দিয়ে কী করব? বাড়ি ফেরার সময় সারাদিনের রাজনীতি, মানুষের সর্দি, হাঁচি, অভাবের বাতাস আর ঘাম কি এত দামি পারফিউম দিয়ে যায়? দেশের যে অবস্থা তাতে কুকুরের পেটে বাটারঅয়েল পামঅয়েলও আর হজম হয় না। আর আমার মতো দরিদ্র মানুষের এই পারফিউম। নাইম হঠাত্ প্রসঙ্গ বদলাল, তোর বাসার সামনে এত কুকুর কেন? ওরা ভদ্র গোছের। নিজ দায়িত্বে এলাকা পাহারা দেয়। হুম, কিন্তু ভয় লাগছিল। কথা বলতে বলতে নাইম প্যাকেটটা বের করে ফেলেছে ব্যাগ থেকে। হোয়াইট বক্সে পিংক রিবন দিয়ে আটকানো প্যাকেট। মইন বলল, দীপা এসে খুলবে, ইনট্যাক থাক। ‘আরে শালা, এ্যায়সা রোমান্স। খুব জমে তোদের নারে?’ বলে কেমন হাসতে শুরু করেছে। ও বন্ধু না হলে এই হাসি খুব অশ্লীল ব্যাখ্যা পেত মইনের কাছে। কিন্তু এটা যে রাগানোর জন্য বলেছে সেটুকু মইন বোঝে। নাইম বলে দিল ধুম করে, ‘নারে দীপা আসলে মানুষ চিনছিল।’ নিজের স্ত্রীকে নিয়ে এমন অতীতের গল্পে ফিরতে কারও স্বস্তি পাবার কথা না। রাত শেষ হতে যাচ্ছে ঘুমানো উচিত দুজনেরই—এমন কথা মনে করিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে নাইম বলল, ‘তুই গত বছর আমার ভুল জন্মদিনে ফোন করেছিলি, কিন্তু তারিখটা বলিনি’, বলেই খ্যাক খ্যাক করে হাসল। ‘ভুল হবে কেন? ওই দিনই তো... কী জানি হতে পারে, তাহলে বলিসনি কেন?’ ভেতরের বিরক্তি চেপে বলল, ‘শুয়ে পড়, দুজনকেই সকালে উঠতে হবে।’ মইনের আর বাকি রাতটুকু ভালো করে ঘুম হলো না। স্বাভাবিকভাবেই সকালে দেরি হলো। নাইমকে ডাকতে যেয়ে চমকে উঠল মইন। একটা কাগজে ছোট্ট নোট, ‘দোস্ত, এবারও লেট, গেলাম।’ দরজা খোলা। মেজাজটা খারাপ হলো। এভাবে কেউ আসে আর এভাবেই বা যায়? ফোনে ঝাড়বে মনে মনে ঠিক করে মইনও বেরিয়ে গেল অফিসে। অফিসে সারাদিন কাজের চাপে খেয়াল নেই। সন্ধ্যায় বের হবার আগে ফোন করল নাইমকে। ফোন অফ। সবার সাথে বসতে চেয়েছিল। কী করবে তাও তো কিছু জানাল না। আরও কয়েকবার চেষ্টা করেছে, একই কথা, মোবাইল ক্যান নট বি রিচড অ্যাট দ্যা মোমেন্ট। সেদিন মোহাম্মদপুর পর্যন্ত ঠিকমতো পৌঁছেছিল কি না টেনশন শুরু হয়েছে। ঢাকা শহরে কিছুই বলা যায় না। দীপার প্রতি দুর্বলতা বা ব্যক্তিজীবনে অনেক সফল—এসব নিয়ে যত ক্ষোভই থাকুক, একসময়ের বন্ধু তো। বারকয়েক ট্রাই করে ফোনে না পেয়ে নাইমের চিন্তা ঝেড়েই ফেলবে ভেবেছে। ও শালা এমনই, হয়তো মাস ছয়েক পর আমেরিকা থেকে ফোন করে বলবে, কি রে খুঁজেছিলি আমাকে? তবুও ওর এই হঠাত্ আসা আর উধাও হয়ে যাওয়ায় নাইম রয়েই গেল মাথার ভেতর। আজ দীপা আর সৌমিক ফিরেছে। তাতে যদিও মইনের স্বাধীনতা-পর্ব শেষ তবু ওরা আসায় ঘরটা ভরে গেছে। ছেলের কাছে তার নানাবাড়ির গল্প শুনল। দীপা বাতি নিভিয়ে দিল, বেশ কদিন দূরত্বের কারণেই হোক বা বাড়ি থেকে ফিরে মন ভালো—দীপাকে উচ্ছল লাগছে। এমনি তো ছুঁতে গেলেই ঝেড়ে ওঠে। আজ নিজেই গা ঘেঁষে শুয়েছে। চোখে কাজল দেওয়ায় দীপার চোখটা বেশ চঞ্চল দেখাচ্ছে, গায়ে এখনো জলের ঘ্রাণ। সবকিছু খুব ভালো লাগলেও মইন এখনো কিছু বলেনি। দীপা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে এল, গাঢ় স্বরে জিজ্ঞেস করল, কেউ এসেছিল বাসায়? চমকে উঠল মইন। দীপা তাহলে আগ্রহ প্রকাশের জন্য পরিস্থিতি তৈরি করছিল। সন্দেহ! মইন আসলে নাইমের প্রসঙ্গ নিজেদের কাছ থেকে দূরেই রাখতে চেয়েছে। কাল রাতের কথা এড়িয়ে মিথ্যে বলল, কেউ আসেনি, কিন্তু কেন জানতে চাইলে? না এমনি মনে হলো, ও ঘরে কেউ ছিল। না কেউ আসেনি। তোমার কী হয়েছে, মেজাজ এত খারাপ কেন? আমি ঠিক আছি। সারপ্রাইজ দেখে ভাবলাম, এতদিন খুব মিস করেছ বউকে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বিরক্ত। অফিসে কোনো ঝামেলা? সারপ্রাইজ? ওমা, আমার পছন্দের পারফিউম কিনেছ কার জন্য? সারারাত ঘুম দুইশ মাইল দূরে রইল। একটা প্রচণ্ড রাগ! রাগটা নাইম না দীপা নাকি নিজেরই নানান ব্যর্থতা, কে জানে। কোনোমতে ঘাপটি মেরে রইল মইন। পরদিন কথা না বাড়িয়ে অফিসে এল। দীপা হয়তো কিছুটা আশ্চর্য হয়েছে। ওকে অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু নাইম যে কাজটা ইচ্ছে করে করেছে, এটা নিশ্চিত। এমনকি মোবাইলের নম্বরও পাল্টে ফেলেছে। অফিস থেকে বের হবার আগে ফোন করল ফারুককে। ফারুক মাস দুয়েক হলো কানাডা থেকে ফিরে আবার সেটেল করেছে। নাইমের সাথে ওর যোগাযোগটাই নিয়মিত ছিল। বিষয়টা নিয়ে কথা বলা দরকার। ফারুক নর্থ টাওয়ারের সামনে অপেক্ষা করছে। দুজন বসল কুপারসে। প্রয়োজনীয় কথা সেরে নাইমের আসার খবরটা দিল মইন। ফারুক আকাশ থেকে পড়ার একটা ভাব দেখিয়ে বলল, ‘কীভাবে এসেছে?’ নিশ্চয়ই নৌকা দিয়ে আমেরিকা থেকে আসা যায় না, প্লেনেই এবং সেটা একটা ডিলে ফ্লাইট। তোর কি মাথা ঠিক আছে? মানে কী? ও আমার বাসায় রাতে ছিল। দীপা বাসায়? নাহ, আমি একাই ছিলাম, দীপা থাকলে আসতে বলতাম না হয়তো। কখন এসেছিল? কতক্ষণ ছিল? প্রায় মাঝরাতে, ভোরে চলে গেছে আমি ওঠার আগে, আর এটা নিয়ে কথা বলতেই তোকে ডেকেছি। মইন, আমার মনে হয় কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে। তুই সবকিছু জটিল করিস, সমস্যা হবে কেন? কোনো সমস্যা হয়নি তখন, হয়েছে পরে। খুলে বল। ওকে ফোনে পাচ্ছি না। তোকে ফোন নম্বর দিয়েছিল? কত তারিখ বললি, মানে কবে এসেছে? ১৯ তারিখ রাতে। ওটা তো নাইমের জন্মদিন। কী বলিস? আমার তো মনেই ছিল না, আর শালাও তো কিছু বলল না আমাকে। ওই রাতে কী হয়েছিল খুলে বল, ও এসে সে রাতে কী করেছে? কী বলেছে? এই তো, জরুরি কিছু না। অল্প কদিনের জন্য এসেছে, বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা করবে বলল। ফোন নম্বরটা দে ট্রাই করি। ফোন নম্বর দিলাম, ওপাশ থেকে ভদ্র মহিলা একই কথা শুনিয়েছে। ফারুক আমার দিকে ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। তুই প্রমাণ দিতে পারবি নাইম এসেছিল? আমি কি তোকে বানিয়ে গল্প বলার জন্য ডেকেছি? আর প্রমাণ কেন দিতে হবে যে ও এসেছিল? মইন, গত বছর ওর জন্মদিনের আগের দিন কাউকে কিছু না জানিয়ে নায়াগ্রা ফলসে গিয়েছিল একা ড্রাইভ করে। যাবার আগে নোট রেখেছে। জরুরি কাজে সিটির বাইরে যাচ্ছি, ফিরব দুদিন পর। তারপর? বাসায় মিথ্যে বলেছে, ভাবতে পারিস, একটা মানুষের কতটা মাথা খারাপ হলে একা একা শিকাগো থেকে নায়াগ্রা ফলসে যায় ড্রাইভ করে? ওকে দিয়ে সম্ভব, কিন্তু তারপর কী হয়েছে? ফেরার পথে রোড অ্যাক্সিডেন্ট। স্পট ডেড। মইন কিছুক্ষণ বসে রইল শব্দহীন। ফারুকের দিকেও আর তাকাতে ইচ্ছে করছে না। নাইমের লিখে যাওয়া চিরকূটটা এখনো মানিব্যাগে। ইচ্ছে করেই দেখায়নি ওটা। দীপাকেও পারফিউমের বিষয়ে কখনো কিছু বলেনি মইন।