ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধনকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ই বহাল থাকল। গতকাল সোমবার আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী হাইকোর্টের রায়ের স্থগিতাদেশ চেয়ে জামায়াতের করা আবেদনটি খারিজ করে দেন। ফলে পহেলা আগস্টের দেয়া রায় বহাল রইলো। তবে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এ বিষয়ে জামায়াতের পক্ষে আবেদনের সুযোগ রয়েছে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা সংক্রান্ত রায় স্থগিত চেয়ে ওই দিনই সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন দাখিল করা হয়। কিন্তু আদালতের কার্যদিবস শেষ হওয়ায় ওইদিন আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। বিচারাধীন এ আবেদনটি গতকাল চেম্বার আদালতের কার্যতালিকায় শুনানির জন্য অন্তর্ভুক্ত হয়।
শুনানিতে জামায়াতের পক্ষে এডভোকেট অন রেকর্ড জয়নুল আবেদীন তুহিন বলেন, আবেদনটি কার্যতালিকায় আনার জন্য আমরা কোন আবেদন করিনি। আমাদের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নেই। এজন্য আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া হোক। এ পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কৌঁসুলি অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এমকে রহমান বলেন, হাইকোর্ট জামায়াতে ইসলামের নিবন্ধনকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছে। অতএব এটি স্থগিত করার কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই। রিট আবেদনকারিগণের কৌঁসুলি ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলামও স্থগিতাদেশ চেয়ে করা আবেদনের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, রায় স্থগিত করার কোন আইনগত ভিত্তি নেই। উভয়পক্ষের শুনানি গ্রহণ করে পরে চেম্বার বিচারপতি স্থগিত আবেদনটি খারিজ করে দেন। আদেশের পর জামায়াতের কৌঁসুলি এডভোকেট এম তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা রায় স্থগিতের আবেদনটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন করিনি। পক্ষান্তরে এমকে রহমান বলেন, জামায়াতের আইনজীবীরা রায় স্থগিত চেয়ে পহেলা আগস্ট চেম্বার আদালতে আবেদন করেন। গতকাল কার্যতালিকার ৩৭ নম্বরে তা অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন (ইসি) জামায়াতে ইসলামীকে নিবন্ধন দেয়। তাদের গঠনতন্ত্রের কিছু ধারা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট দলটির নিবন্ধন অবৈধ বলে ঘোষণা করে। প্রায় ২৫ জন ব্যক্তির করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ওই রায় দেয়। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে জামায়াতকে সরাসরি আপিলের অনুমতি দেয় হাইকোর্ট। সরাসরি আপিলের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে তিন বিচারপতিই একমত পোষণ করেন। অনুমতি পাওয়ার পরই হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন জানান জামায়াতের নিবন্ধন সংক্রান্ত মামলার প্রধান কৌঁসুলি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। এরপরই তার নেতৃত্বে একদল আইনজীবী চেম্বার জজ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের আদালতে যান। আদালতের কার্য দিবস শেষ হওয়ায় আবেদনটি শুনতে অপারগতা প্রকাশ করেন ওই বিচারপতি।
ওইদিন ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, এ রায় ন্যায়ভ্রস্ট ও ভুল রায়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছি। এক্ষেত্রে আমি মনে করি আমরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবো। আর আপিল বিভাগ স্থগিত করলেতো পারবোই। তবে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সকলকেই অপেক্ষা করতে হবে। এ রায় জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর প্রভাব ফেলবে না বলে তিন মন্তব্য করেন।
অপরদিকে ইসির কৌঁসুলি এডভোকেট মহসীন রশীদ বলেন, এ রায়ের ফলে জামায়াত ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের আইনে একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সেগুলোও তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর জামায়াতে ইসলামীকে দেয়া নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ, আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান’র সভাপতি হুমায়ূন কবির, সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হাসানসহ ২৫ ব্যক্তি। ওই রিটের শুনানি শেষে ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি এ রিট আবেদনের ওপর বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক (পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি মো. আবদুল হাইয়ের হাইকোর্ট বেঞ্চ জামায়াতের নিবন্ধনের বৈধতার প্রশ্নে রুল জারি করেন। রুলে রাজনৈতিক দল হিসেবে ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর ইসিতে দাখিলকৃত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০বি(১)(বি)(২) ও ৯০(সি) ধারার লঙ্ঘন হবে না-তা জানতে চাওয়া হয়। জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।
৭২ বছরে তিনবার নিষিদ্ধ জামায়াত
১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা উত্থান-পতন আর প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের রাজনীতিতে ৭২ বছর পার করেছে জামায়াত। এ সময়কালে তিনবার নিষিদ্ধ হয়েছিল এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ইসলামিক এই রাজনৈতিক সংগঠনটি। বাংলাদেশ স্বাধীনের পরেও একবার নিষিদ্ধ হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতার হাতবদলে আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসে দলটি। এবার স্বাধীন বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মত সাংগঠনিকভাবে বড় ধরনের ধাক্কায় পড়েছে জামায়াত।
দলটির জন্ম ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশ-ভারতে ১৯৪১ সালে আত্মপ্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামী। ইসলামী রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলে ঐ বছরের ২৬ আগস্ট লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে দলটির ঘোষণা দেন মাওলানা আবু আলা মওদুদী। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই জামায়াত বৃহত্ ইসলামিক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে গড়ে ওঠে। দেশভাগের পর মওদুদীও ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যান। আর বাংলাদেশের বর্তমান জামায়াতে ইসলামী মূলত পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতেরই রূপান্তর।
ইতিহাস বলছে, প্রতিষ্ঠার ১৮ বছরের মাথায় জামায়াত সর্বপ্রথম নিষিদ্ধ হয় ১৯৫৯ সালে। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান আমলে দ্বিতীয়বার নিষিদ্ধ হয় দলটি। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রতিষ্ঠার পর তৃতীয় দফা নিষিদ্ধ করা হয় জামায়াতকে। পরে ১৯৭৯ সালের ২৫ মে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ পায় দলটি। এরপর জামায়াত রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয় বর্তমান সরকারের আমলে। একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় দলের শীর্ষ নেতাদের। ইতোমধ্যে দলের শীর্ষ তিন নেতার মৃত্যুদণ্ডের এবং দু’জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর ওপর হাইকোর্ট থেকে নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা হওয়ায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে জামায়াত।
