গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্নমুখী কর্মকাণ্ড শুরু করেছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা কে কোন্ দলের মনোনয়ন পাচ্ছেন তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তবে মনোনয়ন পেতে এসব প্রার্থী দলের হাইকমান্ডের সাথে যোগাযোগ এবং এলাকায় দৌড়-ঝাঁপ শুরু করেছেন। পুরনোদের সাথে নতুন মুখের সংখ্যাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বড় সফলতা পাওয়ায় সংসদ নির্বাচনে তা অব্যাহত রেখে বিজয় ছিনিয়ে আনতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট কোমর বেঁধে মাঠে নামছে। জোটের নেতা-কর্মীদের ধারণা, গাজীপুরের ৫টি সংসদীয় আসনে সিটি নির্বাচনের প্রভাব পড়বে। দলীয় কোন্দল ও মতভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার কারণেই বিজয় ১৮ দলীয় প্রার্থীর পক্ষে গেছে বলে তারা মনে করছেন। এ কারণে নেতা-কর্মীরা বেশ উজ্জীবিত।
আওয়ামী লীগ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নিজেদের ভুল ও মতবিরোধ থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করার জন্য ঈদের পর ব্যাপক তত্পরতা শুরু করবে বলে জানা গেছে। এজন্য তারা প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছে। জেলার ৫টি আসনে গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে বিজয় অর্জন করেছিল তা ধরে রাখতে তারা মরিয়া বলে দলীয় সূত্র থেকে বলা হয়েছে। এজন্য তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে বলে দলীয় নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন।
সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় কর্মসূচির বাইরে ভোটারদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও মতবিনিময়, গণসংযোগ ও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে বিভিন্নমুখী তত্পরতা চালাচ্ছেন। তারা নিজ নিজ এলাকায় ডিজিটাল পোস্টার ছাপিয়ে জনগণকে রমজানের ও ঈদের আগাম শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। তারা প্রতিদিন কোন না কোন বাজার কিংবা জনবহুল এলাকায় ভোটারদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্ ও ইফতার মাহফিলে অংশগ্রহণ করছেন। সব মিলিয়ে জমে উঠছে নির্বাচনী আমেজ।
গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর ও সদর)
এ আসনের ভোটার ৬ লাখ ১৩ হাজার ৮৯০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩ লাখ ১২ হাজার ৫৫৪ ও মহিলা ৩ লাখ ১ হাজার ৩৩৬ জন। বর্তমান সংসদ সদস্য এডভোকেট আ.ক.ম মোজাম্মেল হক। তিনি গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি গত নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আগামী নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন পেতে পারেন বলে দলের বেশিরভাগ নেতা-কর্মী মনে করেন।
১৮ দলীয় জোট থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও গাজীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী ছাইয়েদুল আলম বাবুল প্রার্থিতা চাইবেন। এছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির অপর সদস্য হুমায়ুন কবির খান ও কালিয়াকৈর পৌরসভার মেয়র মজিবুর রহমান, জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মোঃ সোহরাব উদ্দিন, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ডা. মাজহারুল আলম, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ সুরুজ আহম্মেদ মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। অপরদিকে গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি এড. শফিকুল ইসলাম বাবুল ও কালিয়াকৈর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল শিকদার নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
গাজীপুর-২ (টঙ্গী ও গাজীপুর)
বর্তমান ভোটার ৬ লাখ ৭২ হাজার ৬৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭৭ ও মহিলা ৩ লাখ ২৫ হাজার ৯৮৭ জন। বর্তমান সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল। তিনি আওয়ামী লীগের প্রয়াত জনপ্রিয় নেতা আহসান উল্লাহ মাষ্টারের পুত্র। রাসেল গত ২০০৪ সালে উপ-নির্বাচনে এবং গত ২০০৮ সালে দু’বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবারও তিনি দলের শক্তিশালী প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন চাইবেন।
১৮ দলীয় জোট থেকে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব হাসান উদ্দিন সরকার দলের একক প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন চাইবেন এটা অনেকটা নিশ্চিত বলে দলের নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন। জাতীয় পার্টির (এ) প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জেলা সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) কাজী মাহমুদ হাসানও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও গত ৬ জুলাই গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পরাজিত মেয়র প্রার্থী এড. আজমত উল্লাহ খানও মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে কানাঘুষা চলছে।
গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর-সদর)
এ আসনের ভোটার ৩ লাখ ৮০ হাজার ৭৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৬ হাজার ২২১ ও মহিলা ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৪৬ জন। শ্রীপুর উপজেলা এবং গাজীপুর সদর উপজেলার মির্জাপুর, ভাওয়াল গড় ও পিরোজালী ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসন। বর্তমান সংসদ সদস্য এডভোকেট মো. রহমত আলী। তিনি পর পর ৪ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আগামী নির্বাচনেও তিনি এ আসনের জন্য মনোনয়ন পাবেন বলে আশা ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শ্রীপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল হেসেন সবুজ মনোনয়ন চাইতে পারেন।
বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট থেকে বেশ কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে রাজাবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মোঃ কুতুব উদ্দিন আহমেদ, থানা বিএনপি সভাপতি শাহজাহান ফকির, ওলামা দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আলহাজ্ব রুহুল আমিন এবং জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন সবুজ ও ডা: শফিকুল ইসলাম, ব্যারিস্টার ফজলুল করিম মন্ডল জুয়েল, ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু রয়েছেন। এক্ষেত্রে রাজাবাড়ী ইউনিয়নের পর পর দু’বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও সাখাওয়াত হোসেন সবুজ মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসাবে জোর তত্পরতা চালাচ্ছেন। তারা কেন্দ্রে লবিং ও এলাকায় ব্যাপক জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। জাতীয় পার্টি (এ) থেকে জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম এম.এ দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী।
গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া)
এ আসনের ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ৮৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ১১ হাজার ৬৬৭ ও মহিলা ১ লাখ ১৮ হাজার ২১৬ জন। বর্তমান সংসদ সদস্য শহীদ বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমি। গত ২০১২ সালের উপ-নির্বাচনে তিনি নির্বাচিত হন। আগামী নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে।
অপরদিকে বিএনপি থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আসম হান্নান শাহ দলের মনোনয়ন পাবেন অনেকটা নিশ্চিত বলে নেতা-কর্মীরা মনে করছেন। ১৯৯১ সালে জয়ী হয়ে তিনি পাটমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় পার্টি (এ) থেকে মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা ও সামসুদ্দিন খান প্রার্থী হতে পারেন। তাজউদ্দিন আহমেদের ভাই সাবেক প্রতিমন্ত্রী আফসার উদ্দিন আহমেদ খানও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।
গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ ও সদর)
এ আসনের ভোটার ২ লাখ ৬০ হাজার ২৬৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৩১ হাজার ১৫৪ ও মহিলা ১ লাখ ২৯ হাজার ১৬১ জন। বর্তমান সংসদ সদস্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। তিনি ইতিপূর্বে সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য এবং ২০০৮ সালে গাজীপুর-৫ আসন থেকে সরাসরি এমপি নির্বাচিত হন। তিনি বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা শহীদ ময়েজউদ্দিনের কন্যা। এবারও তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন। তবে এ আসনে তার সাথে মনোনয়ন লড়াইয়ে আছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি ও বর্তমান গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. আখতারউজ্জামান।
বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক এমপি ও গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি একেএম ফজলুল হক মিলন দলের মনোনয়ন লাভে অনেকটা নিশ্চিত বলে দলীয় নেতা-কর্মীরা মনে করছেন। অপরদিকে জাতীয় পার্টি থেকে আজম খান অংশ নিতে পারেন।
