তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বঙ্গবন্ধু এটা জানতেন। জ্যামাইকায় কমনওয়েলথ সম্মেলনে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু যেখানে বসেছিলেন সেখানে উঠে এসে বলেছিলেন, ‘শেখ সাহেব, আমাদের কাছে উদ্বেগজনক খবর আসছে। আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম ইন্দিরা, চিন্তা করবেন না। কোন বাঙালি আমার গায়ে হাত তুলবে না। যদি তোলে চাদর ঘাড়ে নিয়ে গ্রামে চলে যাব। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার লোক শেখ মুজিব না।’
বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন করেন তখন ড. কামাল হোসেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে চলে যান উচ্চতর পড়াশোনার জন্য। মার্চে বঙ্গবন্ধু তাকে ডেকে পাঠান। ড. কামাল হোসেন এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলে তিনি বলেন, ‘খবর রাখো। কিছু ক্যাপ্টেন, মেজরের সঙ্গে মন্ত্রিসভার সিনিয়র কলিগরা রাতে মিটিং করছে।’ তিনি তখনই আমাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে জয়েন করার কথা বলেন। তারপর পরই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জ্যামাইকা যাই।
ড. কামাল বলেন, ১৫ আগস্টের সময় আমি যুগোশ্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে ছিলাম। জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কী ভাষণ দেবেন এ নিয়ে পরামর্শ করতে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। বেলগ্রেডে থাকতেই আমি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার খবর পাই। সেই সময় শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা জার্মানির কালর্সরুই শহরে ছিলেন ড. ওয়াজেদ মিয়ার কাছে। খবর পেয়ে প্রথমেই ঠিক করি বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ের সঙ্গে দেখা করবো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জার্মানিতে পৌঁছে যাই। ১৫ আগস্ট বিকাল সাড়ে চারটায় শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও ড. ওয়াজেদ মিয়া বনে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বাসায় পৌঁছান। সেখানেই আমি শেখ হাসিনাদের সাথে মিলিত হই। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
আমি ঠিক করি প্রথমে লন্ডনে যাব। সেখানে গিয়ে ঠিক করবো পরবর্তী করণীয়। এসময় ড.ওয়াজেদ মিয়া ও শেখ হাসিনা আমাকে বলেন, আমি যেন কোনভাবেই মোশতাকের সরকারে যোগ না দেই। আমি তাকে আশ্বস্ত করি যে, কোনভাবেই আমি এই ঘৃণ্য কাজ করবো না। এবং আমি তা করিওনি।
লন্ডনে পৌঁছেই আমি হাইকমিশনারকে লাল পাসপোর্টের বদলে সবুজ পাসপোর্ট দিতে বলি। এ সময় ঢাকা থেকে বারবার আমার খোঁজ করা হচ্ছিল। লন্ডনেও ফোন করে বলা হয়েছে ড. কামাল হোসেনকে পেলে সঙ্গে সঙ্গে যেন ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় আমার খবর তারা পাননি। আমি সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে অক্সফোর্ডে উচ্চতর পড়াশোনা শুরু করি।
এ সময় বারবার ঢাকা থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। মেজর জিয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছিলেন সরকারে যোগ দিতে। এমনকি বিদেশে ডেলিডেট টিমের নেতৃত্ব দিতেও অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু আমি রাজি হইনি। সরাসরি না করেছি। বলেছি, এই অবৈধ সরকারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক রাখা সম্ভব না।
এ সময় দেশে আওয়ামী লীগের সংগঠনকে গুঁড়িয়ে দেয়ার সব রকম প্রচেষ্টা চলছিল। কিন্তু জোহরা তাজউদ্দিনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। তিনি সারাদেশে ঘুরে ঘুরে ঐতিহ্যবাহী এই দলটিকে আবারও মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্ত ভিত্তি দেন। এ সময় ১৯৮০ সালে সংগঠন আবারও পুরোপুরিভাবে দাঁড়িয়ে যায়। এসময় লন্ডনে আসেন শেখ হাসিনা। সেখানেও আমার সঙ্গে কথা হয়। বলেন, আমাকে ছেড়ে যাবেন না।’ আমরা তখন শেখ হাসিনার সম্মানে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করি। এসময় দলের সাংগঠনিক কাঠামো বদলানো হয়েছিল। কেননা, তখন দলের ভেতরে গ্রুপিং-এর আভাস দেখা দিয়েছিল। সেইজন্য যৌথ নেতৃত্ব কাঠামোর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা দলের চেয়ারম্যান হন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে দলের হাল ধরেন শেখ হাসিনা।
