৮ আগস্ট শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের (বীর বিক্রম) শাহাদাত্বার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এ দিনে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার মুক্ত করতে গিয়ে সম্মুখ সমরে শহীদ হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার শহীদ সিরাজ। তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দাফন করা হয়। তার নামে সাচনার নামকরণ করা হয়েছিল ‘সিরাজনগর’। সম্ভবত শহীদ সিরাজ হচ্ছেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের মধ্যে (FF) সর্বোচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। কিন্ু্ত তার স্মৃতি রক্ষার্থে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তিনি ছিলেন কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজের ছাত্রনেতা এবং সে সময়ে কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি পদপ্রার্থী। তাঁর সহযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, সুধী মহল ও স্থানীয় জনতা শহীদ সিরাজের দেহাবশেষ তার জন্মভূমিতে সমাহিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন।
শহীদ সিরাজ ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানার ছিলনী গ্রামের মকতুল হোসেন এরং গফুরুন্নেছা দম্পতির একমাত্র ছেলে। যুদ্ধের সময় সিরাজ ছিলেন কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজের ছাত্রনেতা। যুদ্ধের শুরুতেই সিরাজ এলাকার যুবকদের সংগঠিত করেন এবং তার গ্রামের ৭ জন যুবককে নিয়ে যুদ্ধে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর আমরা (ক্ষুদে মুক্তিযোদ্ধারা) শহীদ সিরাজ ও শহীদ জগেজ্যাতি দাসের অনেক বীরত্বগাথা কাহিনী শুনি। আমাদের বাড়ি, লাইমপাশা গ্রামটি এ দুই বীর মুক্তিযোদ্ধার বাড়ির মধ্যবর্তী স্থানে, প্রায় ১০ মাইলের মধ্যে। তারা দুইজন একই কোম্পানির অধীনে যুদ্ধে বীরত্বের জন্য বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত হন। এ কোম্পানির নাম ছিল শহীদ জগেজ্যাতি দাসের (বীর বিক্রম) নামে ‘দাস কোম্পানি’। তারা দুইজনে মিলে অনেক সম্মুখ ও গেরিলা যুদ্ধে হানাদার বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তুলেন। স্বাধীনতার এক মাস আগে জগেজ্যাতি হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে রাজাকার সর্দার আলী রেজা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে লাশ থানার সামনে কয়েকদিন টানিয়ে রাখা হয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে সামপ্রদায়িক উস্কানিমূলক কথা ছড়িয়ে দেয়া হয়।
শহীদ জগেজ্যাতির নামে সুনামগঞ্জ কলেজের লাইব্রেরির নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু শহীদ সিরাজের স্মৃতিকে ধরে রাখতে এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই করা হয়নি। এ অঞ্চলের বেসরকারি মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সর্বোচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা (বীর বিক্রম) হলেও নীরবে-নিভৃতে তার শাহাদাত্বার্ষিকী চলে যায়। ক’দিন পর তার কবরটিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আমাকে তাদের সঙ্গী সাথী হিসাবে চান। তার দেহাবশেষ জন্মভূমিতে আনার দাবিতে তারা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে আবেদন করেছেন। আবার এ বিষয়ে ফোনে কথা বলি মতি ভাই-এর সাথে। তিনি বলেন, বয়স হয়েছে, শরীর ভাল না, আমি যেতে না পারলেও বড় ছেলে যাবে। এ দাবির সাথে তিনিও একমত। শহীদ সিরাজের এক বোন মতি ভাই-এর স্ত্রী মারা গেছেন। আরেক বোনের বিয়ে হয়েছে কিশোরগঞ্জে। তিনি বলেন, এমন একটা কিছু করেন যেন শহীদ সিরাজের স্মৃতি অমর থাকে। দূর বিদেশে অযত্ন- অবহেলায় অচেনা পরিবেশে তার দেহাবশেষ ফেলে রেখে আত্মত্যাগের কথা হারিয়ে যেতে দেবেন না। শহীদ সিরাজের বাড়িতে কিছু একটা করা এবং ইটনা-ছিলনী সংযোগ সড়ক নির্মাণের দাবি করেন তিনি। আমার দাবি, শহীদ সিরাজের দেহাবশেষ তার স্মৃতিবিজড়িত গুরুদয়াল কলেজ চত্বরে যথাযথ মর্যাদায় সমাহিত করা হোক, যেখানে শহীদ বেদিতে তার ঐতিহাসিক চিঠিটি লিপিবদ্ধ থেকে দেশপ্রেমের অপার মহিমার কথাই ঘোষণা করবে। মাননীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে আমি আবেদন করেছি। শহীদ সিরাজের (বীর বিক্রম) দেহাবশেষ জন্মভূমিতে এনে সমাহিতের দাবিতে সকল মহলের সহমর্মিতা ও সহযোগিতা কামনা করছি।
লেখক : সিনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার,
সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা
