রাজধানীসহ সারাদেশে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য আর আনন্দ-উত্সব-উচ্ছ্বাসের মধ্যদিয়ে গত শুক্রবার পালিত হয়েছে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের জামাতে নামাজ আদায়শেষে দেশ জাতি ও মুসলিম উম্মার সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। মোনাজাতের পর পরস্পরের শান্তি, সুখ কামনা ও আনন্দ নিয়ে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
রাজধানীতে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। আর দেশের সবচেয়ে বড় জামাত হয়েছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়ায়।
পঞ্জিকার হিসাবের চাকায় বর্ষাকাল বিদায় নেয়ার পথে। শ্রাবণের ২৫ তারিখ ঈদের দিন আকাশে মেঘের বিচরণ থাকলেও তেমন একটা বৃষ্টিপাত হয়নি। মাঝেমধ্যে কয়েক মুহূর্তের জন্য গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেও সারাদেশেই আবহাওয়া অনেকটা ভালো ছিলো। রাজধানীতে বিকালের শুরুতে কয়েকটি স্থানে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য এ বৃষ্টি ঈদের আনন্দে ঘুরে বেড়ানোর ক্ষেত্রে কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ঈদের জামাত
রাজধানীতে সকাল সাড়ে ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় ঈদগাহে। জামাত শুরুর ১০ মিনিট আগে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ঈদগাহ ময়দানে এসে উপস্থিত হন। রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি নামাজ আদায় করেন প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিচারপতি, বিদেশি কূটনীতিক, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সশস্ত্রবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ সমাজের সর্বস্তরের লোকজন। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা প্রফেসর মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন প্রধান জামাতে ইমামতি করেন। জামাতশেষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সর্বস্তরের মানুষের সাথে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
প্রধান জামাতে নামাজ আদায় করেছেন প্রায় দেড় লাখ মুসল্লী। মহিলাদের জন্য নামাজ আদায়ের ছিলো বিশেষ ব্যবস্থা। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলেছিলো, প্রায় সোয়া লাখ মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারবেন। সকাল সাড়ে ছয়টার পর থেকেই ঈদগাহর দিকে মুুসল্লীরা আসতে শুরু করেন। ঈদগাহ ময়দান ও আশেপাশের এলাকা আগে থেকেই পুলিশ ও র্যাবের কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছিলো। এছাড়া নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ প্রশিক্ষিত ‘সোয়াত স্কোয়াড’। নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রধান গেট না খুলে দেয়া পর্যন্ত ঈদগাহে কেউ প্রবেশ করতে পারেননি। সকাল ৭টায় গেট খুলে দেয়া হলে এক ঘন্টার মধ্যেই ঈদগাহ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। শিক্ষা ভবন ক্রসিং, কদমফুল ফোয়ারা, স্টার গেট, মত্স্য ভবন ক্রসিং, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তা পার হয়ে সচিবালয় লিংক রোড পর্যন্ত বিস্তৃত হয় জামাত।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সকাল ৭টা থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি জামাতে মুসল্লীদের ছিলো উপচেপড়া ভীড়। উত্তর ও দক্ষিণ গেটের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মুসল্লীরা নামাজ আদায় করেন।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ভাঙ্গাপ্রেস কাজলারপাড় জেনিথ প্যাকেজেস লিমিটেড সংলগ্ন বায়তুল জান্নাত জামে মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সকাল সাড়ে ৮টায়। ইমামতি করেন মসজিদের খতিব মাওলানা মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া। জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং স্থানীয় গণ্যমান্য লোকজন এ জামাতে নামাজ আদায় করেন। নামাজশেষে দেশ ও জাতির উন্নতির জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়। জেপি চেয়ারম্যান সবার সাথে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সকাল ৮টায় জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জামাত পরিচালনা করেন সংসদ মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. আবু নঈম মোহাম্মদ ইব্রাহীম। হুইপ আসম ফিরোজ, হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, সংসদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সচিব মো. মাহ্ফুজুর রহমান, সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারী, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সংসদ ভবন এলাকার সাধারণ মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজশেষে দেশ ও জাতির কল্যাণ, সুখ-সমৃদ্ধি ও জাতীয় অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
সরাসরি চাঁদ দেখা...
পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার ইফতার এবং মাগরিবের নামাজের পর ৭-১০ মিনিটে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি বৈঠকে বসে। কিন্তু কমিটি চাঁদ দেখা যাওয়ার সংবাদ পর্যালোচনা করার আগেই বিদ্যুত্গতিতে সারাদেশে চাঁদ দেখার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। সেসময় মসজিদে মাগরিবের আজান হচ্ছিল। আজানের সাথে সাথে রোজাদাররা ইফতার সারতে ব্যস্ত। আজান শেষ হতেই বেসরকারি ‘সময়’ টিভি চ্যানেলের পর্দায় ভেসে উঠে চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি সন্ধ্যার পশ্চিম আকাশে কালো মেঘের উপরে বাঁকা চাঁদ। যতক্ষণ না চাঁদ অস্ত যায় ততক্ষণ এ দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। আর সাথে এ খবর দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে মোবাইল টেলিফোনে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় বাঙালির জাতীয় রুচি ও মননের অধীশ্বর জাতীয় কবি কাজী নজরুলের অবিনাশী বাণী ও সুরে- ‘ও মন! রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’।
শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা
ঈদের চাঁদ দেখার পর প্রায় বাসা-বাড়ি থেকে লোকজন বের হয়ে কাঁচাবাজারে যায়। ইফতারির পরই কসাইদের দোকানের সামনে পড়ে যায় লম্বা লাইন। সেই সাথে মধ্যরাত অবধি কাঁচা বাজারগুলোতে ছিলো উপচেপড়া ভীড়। অপরদিকে একই চিত্র দেখা গেছে মার্কেট, বিপণি বিতান ও ফুটপাতে।
খাবার, চলচ্চিত্র ও বঞ্চিত শিশুরা
ঈদের দিন রাজধানীসহ সারাদেশের সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও ভবঘুরে কেন্দে সকালের নাস্তাসহ দুপুর ও রাতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। রাজধানীর বিভিন্নস্থানে গণযোগাযোগ অধিদফতরের উদ্যোগে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। শাহবাগ শিশুপার্কে প্রবেশ ও রাইড ফ্রি করায় রাজধানীর সুবিধাবঞ্চিত বস্তি ও পথশুিদের ছিলো উপচেপড়া ভীড়। এসব শিশুরা কোন টিকেট ছাড়াই ঢাকা জাদুঘর দেখেছে। দিনভর দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিচালনায় শিশুপার্কে ছিলো শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা।
ঈদ পুনর্মিলনী
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আজ সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় মাজার, দরবার ও খানকা শরীফের পীর-মাশায়েখ, খাদেম ও মোতওয়াল্লীদের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হবে। বায়তুল মোকাররম কেন্দ ীয় লাইব্রেরি মিলনায়তনে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন ফাউন্ডেশনের ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজাল।
চট্টগ্রামে প্রধান জামাত হয়
জমিয়াতুল ফালাহ ময়দানে
চট্টগ্রাম অফিস
চট্টগ্রামে আনন্দঘন পরিবেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনায় নগরীতে ঈদের প্রধান দু‘টি জামাত অনুষ্ঠিত হয় দামপাড়া জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে।
সকাল সাড়ে ৮টায় প্রথম জামাতে ইমামতি করেন জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের খতিব মাওলানা মুহাম্মদ জালালুদ্দিন আল-কাদেরী। এতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এম মনজুর আলম, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
সকাল পৌনে ৯টায় দ্বিতীয় জামাতে ইমামতি করেন মসজিদের সিনিয়র ইমাম মাওলানা নূর মোহাম্মদ সিদ্দিকী। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনায় নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম কেন্দ ীয় ঈদ জামাত কমিটির উদ্যোগে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৯টায় এমএ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন মাঠে। এতে ইমামতি করেন বায়তুশ শরফের পীর অধ্যক্ষ মাওলানা সাইয়েদ আবু নোমান। এতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নানসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
এছাড়া কেন্দ ীয় ঈদ জামাত কমিটির ব্যবস্থাপনায় প্যারেড ময়দান, পলোগ্রাউন্ড ময়দান, নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠসহ নগরীর ৯৩টি ময়দানে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
