রানা প্লাজা ট্রাজেডি

ঈদের খুশি হাসি ফোটাতে পারেনি ওদের মুখে

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪১
প্রতিবন্ধী জীবন নিয়ে এক দুর্বিষহ সময় কাটছে সাভার রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহতদের। গত বছর যাদের ঈদ কেটেছিল স্বামী-স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের সাথে, আনন্দঘন পরিবেশে। এবার তাদের অনেকেরই ঈদ কেটেছে হাসপাতালে, নিরানন্দে। তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে নি এবারের ঈদ। নিজেদের পঙ্গু দেহ ও ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত জীবনের কথা ভেবে নিরবে চোখের পানি ফেলেই ঈদের দিনটি পার করেছেন অনেকে। এ ছাড়া তাদের যেন আর কিছুই করার নেই! গত শনিবার এই প্রতিনিধি ইত্তেফাকের সাভার রিপোর্টার তুহিন খানকে সঙ্গে নিয়ে সরেজমিনে সাভারের প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ও চিকিত্সা সেবা কেন্দ্রে (সিআরপি) গিয়ে সেখানে চিকিত্সাধীন রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহতদের সঙ্গে কথা বলেন। হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, এদের কারো এক হাত, এক পা নেই, কারো দুই পা ও দুই হাত নেই। কেউ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত, চলাফেরা করতে পারেন না। জীবনে এমন চরম দুর্দশা নেমে আসবে তা কেউ-ই আগে ভাবেন নি। নিজের অসহায়ত্বের কথা ভেবে তাই চোখের পানিতে ঈদের দিন বুক ভাসিয়েছেন তারা। গত ঈদের সময়ও সুস্থ হাত-পা নিয়ে তারা ছিলেন স্বাভাবিক মানুষ। একটি দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে তাদের সেই স্বাভাবিক জীবন। এখন মানুষের করুণা নিয়ে বাঁচতে হবে- এ বলে কেউ কেউ হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। পাশে উপস্থিত স্বজন কিংবা কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্সরা তাদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কি সান্ত্বনা দেবেন! সেই ভাষা কি তাদের জানা আছে! তাই সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজের চোখের পানি-ই ধরে রাখতে পারলেন না অনেকে। সিআরপি সূত্রে জানা গেল, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে এখানে মোট ১৭ জন চিকিত্সাধীন রয়েছেন। এদের ২ জন পুরুষ এবং ১৫ জন নারী গার্মেন্টস শ্রমিক। আহতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অনেকে ১৯ হাজার টাকা সরকারি সাহায্য ছাড়া আর কোন অনুদান কিংবা সহায়তা পাননি। এদের অনেকেই তরুণী ও অবিবাহিত। অনেকের হাত-পা নেই এবং চলাফেরা করতে পারেন না। এ অবস্থায় কে তাদের বিয়ে করবে! এ অবস্থাকে তারা ‘জীবিত থেকেও মৃত’ বলে উল্লেখ করলেন। রানার প্লাজার তৃতীয় তলার গার্মেন্টসের শ্রমিক ফেলি বেগমের (৩৫) বাম হাত ও বাম পা ভেঙ্গে গেছে। কোমরে আঘাত পেয়েছেন। ঘটনার দিন রাত ১০টায় তাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি এখন প্যারালাইসিসে আক্রান্ত, পাশাপাশি কিডনি সমস্যাও রয়েছে। হুইল চেয়ারে হাসপাতাল গেটে অপেক্ষা করছিলেন। হয়তো তার কোন আপনজন দেখা করতে আসবেন। সঙ্গে আছে একমাত্র কন্যা পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী বীথি (১১)। মেয়েকে নিয়েই ঈদ কেটেছে হাসপাতালে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, গত বছরতো তার এ অবস্থা ছিল না। এ পর্যন্ত মাত্র ১০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন। এ ছাড়া আর কোন সাহায্য পান নি বলে জানান। রানা প্লাজার সাত তলার গার্মেন্টস শ্রমিক শাহিদা বেগমের (৩০) ঈদ কেটেছে একই হাসপাতালে। চিকিত্সাধীন অন্য রোগীদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। তিনি কোমর ও মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছেন। সরকারি কোন অনুদান পাননি বলে জানালেন। দুই পা ও কোমরে গুরুতর আঘাত পেয়ে রানা প্লাজার ষষ্ঠ তলার গার্মেন্টস শ্রমিক ইয়ানুর বেগম (১৪) এখন প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। তা মা আনোয়ারা বেগম রানা প্লাজার সাত তলার গার্মেন্টস শ্রমিক। তিনি ঘটনাস্থলে মারা যান। ইয়ানুরকে ঘটনার ১২ ঘন্টা পর গুরুতর আহত অবস্থায় ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার করা হয়। ঈদের দিন ইয়ানুরের পাশে তার পিতা ইউনুছ মিয়া ছিলেন। সরকারিভাবে মাত্র ১০ হাজার টাকা সাহায্য ছাড়া আর কোন অনুদান পান নি বলে তিনি জানান। একই গার্মেন্টসের শ্রমিক মরিয়ম বেগমের (২০) বাম হাত কবজি পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে। বাম পায়ে গুরুতর আঘাত। ৩৬ ঘন্টা পর ধ্বংসস্তুপ থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। সে ১০ লাখ টাকা সরকারি অনুদান পেয়েছে। ঈদ কাটে সিআরপি বেডে । সঙ্গে ছিলেন বড় বোন জয়নব বানু । ঈদ কেমন কাটলো - জানতে চাইলে মরিয়ম কোন উত্তর না দিয়ে কাটা হাতের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন। এক পর্যায়ে তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো পানি। সাত তলার গার্মেন্টস শ্রমিক শিল্পী রানী দাসের (১৮) বাম হাত পুরোটা কেটে ফেলা হয়েছে। ডান পা প্যারালাইসিস। তিনিও ১০ লাখ টাকা সরকারি অনুদান পেয়েছেন। হাত-পা কাটা প্রতিবন্ধী সকলেই সরকারি এই অনুদান পেয়েছেন বলে শিল্পী জানান। তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। এখন আর তাকে কে বিয়ে করবে- বলে কেঁদে ফেলেন। আট তলার গার্মেন্টস শ্রমিক রেহেনার (২২) বাম পা কেটে ফেলা হয়েছে। ৫ বছর বয়সী একমাত্র পুত্রকে বুকে জড়িয়ে ঈদের দিন কাটিয়েছেন। সাত তলার গার্মেন্টস শ্রমিক রেহেনার (১৮) দুই পা হাঁটু পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে। গত ঈদে তিনি হেঁটে বেড়িয়েছেন। এ ঈদে তার দুই পা নেই। বিয়ের বিষয়টি ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু সবই তার শেষ- বলে আক্ষেপ করলেন। তিনি কোন সরকারি অনুদান পাননি বলে জানান। আহতদের মধ্যে রোজিনা (২৩) ও তার ছোট বোন মজিনা আকতার (১৮) রানা প্লাজার তিন তলার গার্মেন্টস শ্রমিক। একই লাইনে দুই বোন কাজ করতেন। রোজিনাকে তিনদিন পর উদ্ধার করা হয়। তার বোন মজিনার লাশ আজও পাওয়া যায়নি। রোজিনার বাম হাত কবজি পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে। তার একটি শিশু কন্যা সন্তান রয়েছে। তিন তলার আরেক গার্মেন্টস শ্রমিক শিল্পীর (২২) বাম পা হাঁটু পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়। ঈদে হাসপাতালে তার পাশে স্বামী বিপ্লব ও একমাত্র কন্যা উপস্থিত ছিলেন। রানা প্লাজার ছয় তলার গার্মেন্টস শ্রমিক জাহানারা বেগম (৪০)। দুই পা হারিয়ে তিনি এখন পঙ্গু। মাত্র ১০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন বলে জানালেন। ৭ তলায় গার্মেন্টস শ্রমিক রুবিনা বেগমের (৩০) পিঠের হাড় ভেঙে গেছে। তিনি এখন শয্যাশায়ী। তিনিও মাত্র ১০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন। পঞ্চম তলায় গার্মেন্টস শ্রমিক পিলুসা বেগমের (৩৫) ডান পা ভেঙে গেছে এবং কিডনি সমস্যা জটিল। স্বামী শহীদুল রং মিস্ত্রী। ঈদ কাটে সিআরপিতে। মাত্র ১০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন। নূরজাহান বেগম (২৫) ৭ তলায় গার্মেন্টস শ্রমিক। মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ায় তিনি এখন প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। একাই ঈদ কাটিয়েছেন বিছানায় শুয়ে। মাত্র ১০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন তিনি। একই গার্মেন্টসের শ্রমিক মনিকার (২৫) ডান পা ভেঙে গেছে। পরিবারের কেউ ঈদের দিন তাকে দেখতে আসেনি। তিনিও মাত্র ১০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন। সিআরপি’র কর্তব্যরত চিকিত্সক ডা. আদনান বলেন, সিআরপিতে ভর্তি হওয়া ১৭ জনই প্রতিবন্ধী। তাদের নিয়মিত চিকিত্সা সেবা দেয়া হচ্ছে। ঈদের দিন তাদের নতুন পোশাক ও খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এদের দীর্ঘমেয়াদী চিকিত্সা দিতে হবে। এখানে তাদের ফ্রি চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে তাদের চিকিত্সায় সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।