স্মরণ

আমাদের নিঃস্ব করে মিশুক মুনীরের চলে যাওয়া

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০১৩, ২২:০৯
একজন মিশুক মুনীরের চলে যাওয়া। আর আমাদের শূন্যতা। পরিপূরক হবে নাকি অন্য কিছু? বোধ করি এই প্রশ্নের জবাব দেবারও কেউ নেই। কিংবা বলতে পারি জবাব খোঁজার ফুসরত্ই মেলে না। কারণ দায়িত্বতো কাজ করে যাওয়া। সাংবাদিকতার সেই শিক্ষারও নবায়ন হয়েছিল নতুন শিক্ষাগুরু মিশুক মুনীরের কাছেই। মাত্র নয় মাসে যা শিখিয়েছিলেন, যা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তা রপ্ত করতে লাগতো কয়েক বছর। আর হাতে-কলমে প্রাকটিক্যালতো করতেই হতো বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ পাওয়ার পরও। হ্যাঁ, আমাদের মিশুক মুনীর। যার শিক্ষার্থীদের সর্বশেষ ব্যাচের আমি একজন। এটিএন নিউজের শুরুটা বন্ধুরা দলেবলে। আমি, মুন্নী সাহা, প্রভাষ আমিন, কাজী তাপস সবাই একসঙ্গে কাজ করেছিলাম ভোরের কাগজে। তখনও কিছুদিনের জন্য আমাদের চিফ রিপোর্টার ছিলেন মঞ্জুরুল ইসলাম। তিনি আবার এটিএন নিউজের প্রথম সিইও। তার চলে যাওয়ার পর পেয়েছিলাম মিশুক মুনীরকে। কানাডার প্রবাস জীবনের রিয়াল নিউজের দায়িত্ব ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন দেশের রিয়াল নিউজ চ্যানেল করার জন্য। কারণ বাংলাদেশে বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিকতার শুরুটাও হয়েছিল তার হাত ধরেই। তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে টেলিভিশনে যোগ দিয়েছিলেন মিশুক মুনীর। সেই মিশুক মুনীরকে পেলাম এটিএন নিউজেই। মনটা ভরে গেলো। সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকায় প্রায়ই যে পরোক্ষ খোঁচা হজম করতে হতো, তার অনেকটাই উপশম হয়েছিল মিশুক মুনীরের শিক্ষার্থী হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর। দেখি তেমন অনেকেই কিছুটা সমীহই করছে, কারণ আমি এখন মিশুক মুনীরের সহকর্মী। কিন্তু ভালো কিছুই হয়তো বেশিদিন সহজলভ্য থাকে না। আর এজন্যই কি কাজের ফাঁকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন মিশুক মুনীর। এখনও কি বিশ্বাস হয় যে মিশুক মুনীর চেলে গেছেন না ফেরার দেশে। কারণ কাজের ফাঁকেই তিনি কখন বারিস্তায় গিয়ে চুমুক দিতেন কফির কাপে। হায় মিশুক ভাই অফিসে নেই দেখে নিজেই সেখানে গিয়ে ধরা পড়েছি তার কাছেই। কিন্তু কাজপাগল মিশুক মুনীর কফির টেবিলেই বলেছেন এটিএন নিউজকে নিয়ে নিজের ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা। সেই টেবিলে তিনি সিইও বা প্রধান সম্পাদক নন, সত্যিকার অর্থেই সহকর্মী। তাই পিঠে হাত বুলিয়ে বলতে দ্বিধা করেন নাই “প্রযুক্তি নয়, মেধা আর শারীরিক পরিশ্রমেই তোমরা এটিএন নিউজকে এগিয়ে নিয়েছ অনেকটাই কিন্তু এখন বন্ধু বন্ধু বিষয়টি একটু কমাতে হবে। আর বাড়াতে হবে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। ” শুধু মুখের কথাই নয়, কথা আর কাজে কোনো ফাঁক ছিল না মিশুক মুনীরের। সেজন্যই এটিএন নিউজে যোগ দেয়ার অল্পদিনের মধ্যেই ক্যাসেট ক্যামেরাগুলোকে বদলে দিয়েছিলেন। ফলে ক্যমেরা থেকে এডিট প্যানেলে ছবি ট্রান্সফারের সময় কমে গিয়েছিল অনেক, গতি বেড়েছিল বার্তা কক্ষের। নিজের ছেলেকে হাসপাতালে রেখেই কাজের নেশায় মানিকগঞ্জে ছুটে গিয়েছিলেন মিশুক মুনীর বন্ধু তারেক মাসুদের ছবির কাজে ক্যামেরা চালানোর জন্য। যমজ মরণে তাদের বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় হয়েছে কিন্তু আমরা যে বন্ধু হারালাম, যিনি বসের চেয়ার আর গুরুজির আসন ছেড়ে বসেছিলেন কিচের রঙ্গিন টুলে। হাতে ছিল মরণচাঁদের পরোটা আর ভাজিহালুয়া। রাজধানীতে তো আর পাখিডাকা ভোর বলা যায় না কিন্তু অতটা ভোরে অফিসের প্রধান নিবার্হীকে দেখে যারা অবাক, তাদের অনেকেরই অজানা ছিল যে রাতে বাসায় যাননি মিশুক মুনীর। আর প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে কাদতে কাদতে আমাদের জানিয়েছিলেন অধ্যাপক ম তামিম যে তাদের বন্ধুদের যে আড্ডায় উপস্থিত থাকতেন মিশুক মুনীর, সেই আড্ডায় রাত গভীরেই মিশুক মুনীর বলতেন ‘এখনই অফিস যেতে হবে, একটা কাজ এখন না করলেই চলবে না।’ এটিএন নিউজের রিপোর্টাররা ঐ সপ্তাহে ব্যস্ত ছিল ১৫ আগস্টের শোক দিবসের বিশেষ আয়োজনের রিপোর্ট তৈরিতে। কিন্তু তার আগেই আমাদের জন্য তৈরি হয়েছিল বিশেষ এক শোকাবহ ১৩ আগস্ট। মানিকগঞ্জের জোকা থেকে এম্বুলেন্সে আসা যে মিশুক মুনীরকে আমরা পেয়েছিলাম, তার মুখ আমাকে দেখতে হয়েছে অনেক শক্তি সঞ্চয় করে। বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের হিমঘরের ততধিক হিমশীতল ইস্পাতের ড্রয়ারে আরো দুদিন আমাদের সঙ্গেই ছিলেন আমাদের প্রিয় মিশুক ভাই। বনানীর শেষ শয্যায় তাকে রেখে আসার পর আরো দুটি বছর চলে যাচ্ছে কিন্তু আমি এখনও কান পেতে থাকি সেই ফোনের আশায়। বিশ্বাস করি এটিএন নিউজের কেউই অবাক হবে না যদি মিশুক মুনীর চলে আসেন একদিন আর ব্রডকাস্ট্রের প্রধান পিনাকীদাকে ডেকে ধরিয়ে দেন একটি বড় স্যুটকেস। দুঃখিত ঐ স্যুটকেসে কোনো টি-শার্ট বা জিনস থাকবে না, থাকে ছোটো বড় নানা ডিভাইস আর খুচরা যন্ত্রাংশ যার প্রতিটিই আমাদের শক্তি বাড়াবে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দেবার জন্য। কিন্তু মিশুক ভাই সেতো জিনস আর টি-শার্টই বেশি ভালো ভাসতো। লেখক :সাংবাদিক