জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযমের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল দায়ের করেছে সরকার। একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে দলটির বিতর্কিত ভূমিকার জন্য আপিলে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার আবেদন করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আপিল দায়ের করা হয়।
আপিলে বলা হয়, “যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতকে একটি অপরাধী সংগঠন (ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। গোলাম আযমের মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘দালিলিক প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, অধ্যাপক গোলাম আযমের নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি অপরাধী সংগঠনের মতো কাজ করেছে, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে। বিভিন্ন নথি ও সাধারণ ধারণা থেকে দেখা যায়, অভিযুক্ত গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো প্রত্যক্ষভাবে একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রটি এখনো সক্রিয়। আর এর ফলে নতুন প্রজন্মের জামায়াত-সমর্থকরাও মনস্তাত্ত্বিকভাবে স্বাধীনতা বিরোধী এবং সাম্প্রদায়িক মানসিকতায় পুষ্ট। এটা একটি জাতির জন্য বিচারে উদ্বেগের বিষয়। আমাদের জাতির কাছে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে একাত্তরে জামায়াত যে স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকা পালন করেছিল, তাদের সেই মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে এবং ৩০ লাখ শহীদের প্রতি সমবেদনা ও শ্রদ্ধার কোনো নিদর্শন তারা এখনো দেখায়নি।’ অতএব আপিল বিভাগ ন্যায় বিচারের স্বার্থে ট্রাইব্যুনালের রায় বিবেচনায় নিয়ে সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলটি নিষিদ্ধের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান করতে পারেন।”
প্রসঙ্গত ট্রাইব্যুনালের দেয়া ৯০ বছরের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে গত ৫ আগস্ট আপিল করেন গোলাম আযম। আপিলে রায় বাতিল করে তাকে বেকসুর খালাস দেয়ার আবেদন করেন তিনি। এর সাতদিন পরই দলটির সাবেক এ আমীরের সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে আপিল করল সরকার।
এ নিয়ে বর্তমানে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে ঘোষিত রায়গুলোর ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চারটি আপিল বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের ওপর শুনানির জন্য ১৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য রয়েছে। তবে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের করা আপিলের ওপর শুনানির দিন এখনো ধার্য হয়নি। ইতিমধ্যে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজার রায়ের বিরুদ্ধে করা দুটি আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়েছে। বিষয়টি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছে আদালত।
আপিল দায়েরের পর অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এমকে রহমান সাংবাদিকদের বলেন, জামায়াত এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য। জামায়াত যারা করে তারাও বলবেন না যে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায়ে এটা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, যেহেতু যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতকে ক্রিমিনাল সংগঠন হিসাবে উল্লেখ করে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, তাই আমরা আপিলে দলটিকে নিষিদ্ধ করার আবেদন জানিয়েছি। এ বিষয়ে সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে ‘পরিপূর্ণ ন্যায় বিচারের’ ক্ষমতা আপিল বিভাগের রয়েছে। সেই ক্ষমতার আলোকে আপিল বিভাগ জামায়াতকে নিষিদ্ধও করতে পারে। কবে নাগাদ শুনানি হবে এমন প্রশ্নের জবাবে এমকে রহমান বলেন, আপিলের সার-সংক্ষেপ জমা দেয়ার পর শুনানির উদ্যোগ নেয়া হতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ১৫ জুলাই যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে গোলাম আযমকে ৯০ বছরের সাজা দেয়। তার বিরুদ্ধে আনীত অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য হলেও বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে এ সাজা দেয়া হয় বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। রায়ে বলা হয়, আসামি গোলাম আযমকে প্রথম (ষড়যন্ত্র) ও দ্বিতীয় (পরিকল্পনা) অভিযোগে ১০ বছর করে ২০ বছর কারাদণ্ড, তৃতীয় (উস্কানি) অভিযোগে ২০ বছর কারাদণ্ড, চতুর্থ (সহযোগিতা) অভিযোগে ২০ বছর কারাদণ্ড এবং পঞ্চম (সিরু মিয়া হত্যাকাণ্ড) অভিযোগে ৩০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হল। কারাদণ্ডের প্রতিটি শাস্তি ধারাবাহিকভাবে একটির পর একটি বা মৃত্যু পর্যন্ত চলবে।
