কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার কাঁচকোল গ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবল ভাঙ্গনে ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে ৭৭টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখানে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে ৪৫০ মিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দু’টি তীররক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় ভাঙ্গনের হুমকির মুখে পড়েছে রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের হাজার হাজার একর আবাদি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা। কাঁচকোল ১০ ভেন্টের স্লুইসগেটসহ বিস্তীর্ণ এলাকা রক্ষায় ব্যাগে বালুভর্তি করে ভাঙ্গন রোধের নিষ্ফল চেষ্টা চালাচ্ছে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড।
চিলমারী উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের সড়কটারী গ্রামে সরজমিনে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্রের সর্বগ্রাসী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারানো ঐ গ্রামটির অধিকাংশ পরিবারের মানুষ এখন দিশেহারা। ঈদের দিন আকস্মিকভাবে ভাঙ্গন শুরু হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়ায় বাড়ির মালামাল সরাতে গিয়ে অনেকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করতে পারেনি। আকস্মিক পানি বৃদ্ধির ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙ্গন এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, ১শ মিটার দূরে থাকা ব্রহ্মপুত্র নদ মাত্র ৭২ ঘন্টার ব্যবধানে বাঁধের কাছ ঘেঁষে প্রবাহিত হচ্ছে। একাধিকবার ভাঙ্গনের শিকার সড়কটারী গ্রামের বাঁধে আশ্রয় নেয়া ৭৭টি পরিবারের শেষ সম্বল ঘর-বাড়িটুকুও ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে চলে গেছে। সড়কটারী গ্রামের দুই দিকে বাঁধের ২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আশ্রয় নেয়া প্রায় ২ হাজার পরিবারকে গ্রাস করে ফিরছে ভাঙ্গন আতংক। ইতিমধ্যে গ্রামটির দ্বিতীয় দফায় ভাঙ্গনের শিকার পরিবারগুলো তাদের রক্ষা পাওয়া জিনিসপত্র, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে কোথায় যাবে এই চিন্তায় দিশেহারা। বর্তমানে গ্রামটির ৪৫০ মিটার বাঁধ যে কোন মুহূর্তে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়।
ব্যাপক এলাকাজুড়ে ভাঙ্গন অব্যাহত থাকায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ লাগোয়া দক্ষিণ কাঁচকোল খামার, শিমুলতলা, বৈরাগীরভিটা ও কালিরকুড়া গ্রামের দিকে ব্রহ্মপুত্র নদ দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। ফলে কাঁচকোল স্লুইসগেট, কাঁচকোল বাজার, বাজার মসজিদ, কাঁচকোল খামার সকিনা ইসলামীয়া দাখিল মাদ্রাসাসহ গ্রামগুলোতে থাকা অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ইতিপূর্বে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কালিরকুড়া এলাকায় বাঁধের সাথে দু’টি তীর রক্ষা বাঁধে (টি বাঁধ) ভাঙ্গন দেখা দেয়। শুষ্ক মৌসুমে ঐ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ কুড়িগ্রাম-৪ আসনের এমপি জাকির হোসেন ও কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদেরকে দফায় দফায় অবহিত করলেও তারা বাঁধ দু’টি রক্ষায় ব্যবস্থা নেয়নি। অভিযোগ রয়েছে তীর রক্ষা বাঁধের (টি বাঁধ) ভাঙ্গন ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করে কাগজ-কলমে কাজ দেখালেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রাণীগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান মনজুরুল ইসলাম মনজু টিআর প্রকল্প নিয়ে বাঁশের বান্ডাল দিয়ে ঐ বাঁধ দু’টি রক্ষার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।
সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে আরো দেখা যায়, কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন সহকারী প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে সিনথেটিক এবং জিও টেক্সটাইল ব্যাগে বালুভর্তি করে কোন রকমে ভাঙ্গন রোধের চেষ্টা করছেন। বালুভর্তি ব্যাগ নদীতে ফেলার হিসাব নিয়েও স্থানীয় চেয়ারম্যান এবং প্রকৌশলীদের দেয়া তথ্যে বড় ধরনের গড়মিলের অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রকৌশলীদের দেয়া তথ্যানুযায়ী গত ৩ দিনে জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ৪ হাজার এবং সিনথেটিক ব্যাগ ৩ হাজার নিক্ষেপ করা হয়। অপরদিকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও এলাকাবাসীর দেয়া তথ্যমতে, এ পর্যন্ত জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ১৩শ’ এবং সিনথেটিক ব্যাগ ৩ হাজার নিক্ষেপ করা হয়েছে। পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী আবু তাহের প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সাধ্যানুযায়ী ভাঙ্গন রোধের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কুড়িগ্রাম-৪ আসনের এমপি জাকির হোসেনের সাথে মুঠোফোনে কথা বলার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
