শোকাবহ আগস্ট

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪৯
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সংবাদ শুনে সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডট বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবকে হত্যার পর বাঙ্গালি জাতিকে আর বিশ্বাস করা যায় না।’ লন্ডনের টাইমস পত্রিকায় ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয় ‘সবকিছু সত্ত্বেও শেখ মুজিবকে চিরকাল স্মরণ করা হবে। কারণ তাকে ছাড়া বাংলাদেশের সত্যিকার কোন অস্তিত্ব নেই।’ একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশের মানুষ শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’ পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকদের বুলেট প্রাণ কেড়ে নেয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর। বাঙ্গালি জাতি যতকাল থাকবে, ততকাল ধরে এ দেশের মানুষ এই একটি ঘটনার ক্ষত বুকে বয়ে বেড়াবে। সেই রাতে ঘাতকদের বুলেটে প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল। পৃথিবীর এই ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ড থেকে রক্ষা পাননি বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি, তার সহধর্মিণী আরজু মনি, কর্নেল জামিলসহ ১৬ জন। সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক বিপথগামী সদস্য সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর সদম্ভে ঘোষণা করে সে কথা। সারাদেশে নেমে আসে শোকের ছায়া এবং ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প। বিশ্ব নেতৃবৃন্দও তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা প্রকাশ করেন এ ঘটনায়। এই মহান নেতার আত্মত্যাগ ও অর্জনকে ’৭৫ সালে হত্যার পর নিশ্চিহ্ন করার চক্রান্ত হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর তাকে হত্যার কথা দম্ভভরে স্বীকার করেছিল খুনিচক্র। আত্মস্বীকৃত খুনি মেজর ফারুক বলেছিল, ইচ্ছা করলে বাংলাদেশ সরকার আমার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। সেদিনের সেই দম্ভ বঙ্গবন্ধু হত্যার রায় ঘোষণার পর ধূলিস্মাত্ হয়ে গিয়েছে। ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগে অন্তিম সময়ে এসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছিল এই কুখ্যাত খুনি ও তার দোসররা। ১৯৭৬ সালের ৩০ মে লন্ডনের ‘দি সানডে টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে সৈয়দ ফারুক রহমান স্বীকার করেছিল, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্রে সে জড়িত ছিল। ‘আই হেল্পড টু কিল মুজিব, ডেয়ার ইউ পুট মি অন ট্রায়াল?’ শিরোনামে প্রকাশিত এ নিবন্ধে সে দম্ভের সঙ্গে বলে ‘শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার ইচ্ছা করলে আমার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে।’...‘আমি শেখ মুজিবকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছি।’ ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মধ্যদিয়ে জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কময় অধ্যায়ের অবসান ঘটে। জাতি হয় কলঙ্কমুক্ত। তবে সাধারণ মানুষের মত সাধারণ আদালতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ সম্পন্ন হতে সময় লেগেছে এক যুগের বেশি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনিদের রক্ষা করতে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটিকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন।