দেশে দেশে নেতা অনেকেই জন্মান। কেউ ইতিহাসের একটি পঙক্তি, কেউ একটি পাতা, কেউবা একটি অধ্যায়। কিন্তু কেউ আবার সমগ্র ইতিহাস। শেখ মুজিব এই সমগ্র ইতিহাস। একমাত্রই অর্বাচিনরাই শেখ মুজিবকে অস্বীকার করতে পারে। গোটা বিশ্ব জানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সারা বাংলার ইতিহাস। বাংলার ইতিহাসের পলিমাটিতে তাঁর জন্ম। ধ্বংস, বিভীষিকা, বিরাট বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে সেই পলিমাটিকে সাড়ে সাত কোটি মানুষের চেতনায় শক্ত ও জমাট করে একটি ভূখণ্ডকে শুধু তাদের মানসে নয়, অস্তিত্বের বাস্তবতায় সত্য করে তোলা এক মহা ঐতিহাসিক দায়িত্ব। মুজিব মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে মৃত্যুঞ্জয় নেতার মতো এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ইতিহাসের সন্তান ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। এইখানেই তাঁর নেতৃত্বের ঐতিহাসিকতা। সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে বঙ্গবন্ধু নিহত হলেও আমেরিকার সুশীল সমাজ এটা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি। ১৯৮২ সালে আমেরিকার বিখ্যাত সাপ্তাহিক ‘টাইমে’ ৫ এপ্রিল সংখ্যায় বলা হয়েছিল, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দশ বছরের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের আমল ছিল সর্বপ্রথম এবং দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আমল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ও প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে হত্যার পর হঠাত্ গণতান্ত্রিক আমলের অবসান ঘটে।’ ইতিহাস থেকে আমরা জানি, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এমনটি ঘটেছিল। আমেরিকার তখনকার সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু আমেরিকার সিভিল সমাজ বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে ছিল। বঙ্গবন্ধুর নিহত হবার বিষয়টি কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো মেনে নিতে পারেননি। যেমন মেনে নিতে পারেননি শ্রীলঙ্কার তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে। নানা সময়ে মার্কিন দলিলেও বলা হয়েছে—শেখ মুজিব ছিলেন একজন মহান দেশপ্রেমিক নেতা; কিন্তু প্রশাসক হিসেবে একজন ব্যর্থ। কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন জাগে, যে নেতা বাংলাদেশের দায়িত্ব না নিলে দেশ অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়ে যেত তাঁকে নিয়ে কেন এ ধরনের সমালোচনা হয়। বঙ্গবন্ধু আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের যে সমস্ত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন পৃথিবীর আর ক’জন রাষ্ট্রনায়ক তা পেরেছিলেন? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ৪০ লক্ষ টন খাদ্য ঘাটতি ছিল। এমনি সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারকে ৯০ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী, আটককৃত ৩৭ হাজার রাজাকার ও দালাল এবং সোয়া লক্ষ ভারতীয় সৈন্য বাহিনীর খাদ্য সরবরাহের দায়িত্ব তাঁকেই পালন করতে হয়। বঙ্গবন্ধু দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেন। ফলে ১ লক্ষ ৬৫ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি সরকারি হয়। এ কথা কি আমরা স্বীকার করি যে, খুবই কম সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শিক্ষকদের ৯ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করেন এবং ৯০০ কলেজ ভবন ও ৪০০ হাইস্কুল ভবন নির্মাণ করেছিলেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে যারা পরাজিত হয়েছিল, তারাই স্বাধীনতার পর কড়ায়-গণ্ডায় সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে। মনে রাখা দরকার, বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু সাম্প্রদায়িক শক্তি। এই অপশক্তি বাঙালি জাতিকে উল্টোরথের যাত্রী বানিয়েছে। ইতিহাসের ঘটনাগুলো কি চমত্কারভাবে না মিলে যায়। বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশের নাম ভুটান। আবার ভুটানই একমাত্র দেশ, যারা ১৫ আগস্টেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উষ্মা প্রকাশ করেছিল। আজকের নতুন প্রজন্মকে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস সঠিকভাবে জানতে হবে এবং উপলব্ধি করতে হবে। স্বাধীনতার মর্মসত্য অবগাহন করতে হলে বঙ্গবন্ধুর চেতনার সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে হবে।
লেখক :রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]
