জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪৮
আজ ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। এই দিনে বাঙালি জাতি হারিয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। এই দিনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ৭১ পরবর্তী ইতিহাসের চাকা উল্টোপথে শুরু করা হয়। এই কাজটি সুচারুভাবে সম্পাদনের পরই ৭১ সালের হানাদারদের দোসররা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মোড়কে যুদ্ধকালীন সময়ের লুণ্ঠিত সম্পত্তিকে পুঁজি করে প্রগতির ধারাকে প্রতিক্রিয়াশীল পথে ধাবিত করে। শুরু হয় স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া। অংশ হিসাবে দেশি-বিদেশি চক্রের নীলনক্সা তৈরি করা হয়। মুশতাক, মাহবুবুল আলম চাষীরা মিলিত হয় কুমিল্লা BARD-এর বিশেষ জায়গায়। চাঙ্গা হতে থাকে পাক-চীন-মার্কিনপন্থি সকল স্তরের খেলোয়াড়রা। যোগাযোগ শুরু হয় তত্কালীন NSI-এর DG সফদারের সাথে। প্রশাসনকে বাগে আনার প্রচেষ্টা করা হয়, এদের অনেকে এখনো বিভিন্ন কাজে জড়িত আছেন কালের খলনায়ক হিসাবে। কিলার মিশনের কেন্দ্রবিন্দু সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু অফিসার, যাদেরকে প্রত্যক্ষ প্রেরণা যুগিয়েছেন তত্কালীন ডিপুটি চিফ জিয়া সাহেব। উনার উদ্দেশ্য পরিষ্কার। তিনি সেনাবাহিনীতে উত্তেজনা এবং আবেগ সৃষ্টির নিমিত্তে জঘন্য কাজটি সুচারুভাবে সম্পাদন করেছেন। প্রমাণ মিলে পরবর্তীকালে বাঙালি জাতিসত্তার সাথে বেইমানি করা লোকদের নিয়ে সরকার গঠন করার মধ্য দিয়ে। এখানেই শেষ নয়। জেলখানা থেকে ছেড়ে দেয়া হয় চাঞ্চল্যকর ৭ মার্ডার কেসের আসামি শফিউল আলম প্রধানকে। সৃষ্টি করা হয় গাল কাটা কামাল, ইমদু, আবুল কাশেমের (কুমিল্লা) মতো লোকদের করা হয় রাজনীতির দূর্বৃত্তায়ন। সম্পাদন করেন উনার প্রতিশ্রুতি to make politics difficult, তাই হলো শেষ পর্যন্ত। ফিরে দেখা দরকার এ হত্যাকাণ্ডের ক্ষতির পরিমাণ কত? এ হত্যাকাণ্ডের ক্ষতির বহুমাত্রিক দিক পরবর্তীতে দেখা গেছে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করা হয়েছে আইন প্রণয়ন করে। ঐ আইনের খসড়া যারা করেছেন তারা এখনো জীবিত আছেন বলে নিশ্চিত করেছেন তত্কালীন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউদ্দিন। বিচার ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করার বিষবৃক্ষ রোপণ করা হত্যাকারীদের বিচার বহির্ভূত রেখে। সেনাবাহিনীর চাকরিতে থেকে আর্মি এ্যাক্ট Violate করে প্রশাসনের হ্যাঁ-না ভোট দিয়ে দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন জে. জিয়া। ভঙ্গ করেছেন আর্মি এ্যাক্ট এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এতে সদ্যজাত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সেনা এবং প্রশাসনিক কাঠামো বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। যার প্রমাণ মেলে ৪২ বার সেনা বিদ্রোহের ঘটনার মধ্যে। সরকারি ক্যাডার সার্ভিসে অনুপ্রবেশ অন্য সার্ভিসের লোক করা হয়। ধ্বংস করা হয় সংবিধান স্বীকৃত জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচনে পেশিশক্তি ব্যবহার করে ‘আমার ভোট আমি দেব’ জনগণের অধিকার হরণ করা হয়। শুরু করা হয় রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের যাবতীয় প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক অধিকার বন্দী হয় পেশিশক্তির কাছে। জানা যায়, একজন নেতা কুখ্যাত খুনি এরশাদ সিকদারকে নোয়াখালীতে ২ মাস রেখেছেন ১৯৮৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে। কালো টাকার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠে মৌলবাদের অর্থনীতি। প্রফেসর আবুল বারকাতের গবেষণায় আমরা দেখি কালো টাকা এবং মৌলবাদের অর্থনীতির বিভীষিকাময় চিত্র। পরনির্ভরশীলতার গ্যাঁড়াকলে আবদ্ধ হয় বাংলাদেশ। আমরা অবাক হই মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান থাকাকালীন বাংলাদেশের কোন লোক মধ্যপ্রাচ্যের চাকরি পাই নাই। কিন্তু স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালিদের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করেন। আজ বাংলাদেশের অবস্থা অন্যরকম থাকতো যদি বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা না হতো। স্কুল ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৭০ সালের নির্বাচন দেখেছি। দেখার সুযোগ হয়েছে কিভাবে একটি প্রদেশকে জাতিরাষ্ট্রে রূপান্তর করেছেন। স্মরণে পড়ে ১৯৭০-এর ডিসেম্বরে নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি রেসকোর্স মাঠে কিভাবে দেশ চালাবেন এর একটি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা ঐ জনসভায় পেশ করেন। সরকারি archive-এ ঐ বক্তৃতার রেকর্ড আছে। বক্তৃতাটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বঙ্গবন্ধু ঐ কর্মপরিকল্পনার ৫০ ভাগ বাস্তবায়ন করলেও বাংলাদেশ আজ মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডের মতো Newly Industrialized কাতারে থাকত। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের পর জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ১০ জানুয়ারি লন্ডন এবং দিল্লী হয়ে ঢাকায় আসেন। লন্ডনে দেয়া প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু তুলে ধরেন পাকিস্তানি অত্যাচারের কথা। পাশাপাশি পাকিস্তানি এবং বৃটিশ শোষণের ইতিহাস ব্যক্ত করেন, অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের কথা। পরনির্ভরশীল বিদেশ নীতির ঘোষণা দেন। আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা “নিজ অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের” সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধুর রক্তের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। স্বনির্ভর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে নেত্রীর প্রত্যয়ে সমগ্র জাতি আশ্বস্ত। অনেকে বিশ্বাস করেন এবং আনন্দিতও হয়েছেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সাথে বঙ্গবন্ধুর ইন্টারভিউতে তিনি তার জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তিনি এক পর্যায়ে বলেছেন, যার বাংলা অনুবাদ দাঁড়ায় “আমি দৃঢ়চিত্তের লোক। সাধারণত আমার চোখ দিয়ে পানি আসে না, কিন্তু আমি যুদ্ধে নিহত আমার কর্মী, সাধারণ লোক, শিশু, আহতদের দেখি, আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। আমি আহতদের দেখতে হাসপাতালে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি। কারো হাত নাই, চোখ নাই, পা নাই, পঙ্গু। তবুও তারা বলে আমরা নিঃস্ব; কিন্তু তোমাকে জীবিত পেয়ে আমরা সন্তুষ্ট।” তিনি আরো বলেন, “পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুরতা নাত্সী জার্মানীর অত্যাচারকে হার মানিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও এত লোক মারা যায় নাই, যা পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা করেছে। এই অপরাধের অবশ্যই বিচার হবে। আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, প্রেসিডেন্ট হতে চাই না। জনগণের ভালবাসার তুলনায় এসব পদ আমার কাছে অনেক ছোট। আমি আনন্দিত আমার ৭ কোটি বাঙালি আজ স্বাধীন, শত্রুমুক্ত। আমি এদের শিক্ষা দিতে চাই, কাজ দিতে চাই, স্বাস্থ্যসেবা দিতে চাই, বাসস্থান দিতে চাই, উন্নত বাংলাদেশ দিতে চাই।” অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের সংস্কারের ফসল আজকের বিদ্যুত্ ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং এবং অর্থনৈতিক সংস্কার, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যোগাযোগ এবং ICT ব্যবস্থায় প্রয়োগ, রেমিটেন্স প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করা সম্ভব। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হার বাড়িয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্য অর্জন করতে পারলেই জাতির জনকের স্বপ্ন পূরণ হবে। একমাত্র ১৫ আগস্টের শোককে শক্তিতে রূপান্তরের মধ্য দিয়েই এটা সম্ভব। লেখক :সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি