কম মজুরি, মাত্রাতিরিক্ত খাটুনি, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নিয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় আছে পুরাতন ঢাকার লালবাগ এলাকার শিশুশ্রম পরিস্থিতি। এই এলাকার শিশুশ্রম নিয়ে সেভ দ্যা চিলড্রেনের সহযোগিতায় প্রদীপন সমপ্রতি এক জরিপ পরিচালনা করে। প্রকাশিত সেই জরিপে দেখা যায় উল্লেখিত বিষয় এছাড়াও শিশুরা কর্মক্ষেত্রে প্রায়শই বিভিন্ন রকম নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকে। নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় বলছে এই সকল শিশুকে শ্রম মুক্ত করা ও বিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য বেশ কিছু সরকারি কার্যক্রম আছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে শিশু আইন গেজেট আকারে প্রকাশ, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম তালিকর প্রচারণা, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রম নয়, বরং অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাকার্যক্রম এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও গণমাধ্যমের সচেতনতা বৃদ্ধি পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব ।
শিশুশ্রম পরিস্থিতি: এলাকার দরিদ্র শিশুরা ট্যানারি, প্লাস্টিকের কারখানা, ওয়ার্কসপ, কেমিক্যাল হাউজসহ বাসাবাড়িতে নানারকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে। এইসব কারখানার পরিবেশ তাদের মানসিক, শারীরিক বিকাশে যেমন বাধা হয় তেমন থাকে যে কোন মুর্হূতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। জরিপে দেখা গেছে লালবাগ এলাকায় কর্মজীবী শিশুদের ৯৩.৯০ ভাগ ১০ ঘন্টার উপরে কাজ করে । মাত্র ৪.৮ ভাগ শিশু নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে। চিকিত্সা সুবিধা পায় ১৬.৫ ভাগ শিশু। সাপ্তাহিক মজুরি ১০০ থেকে ৪০০ টাকা পায় ৫১ শতাংশ শিশু। ৪০১ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি পায় ৩৬.৬ শতাংশ, ৮০১ থেকে ২০০০ টাকা মজুরি পায় ১২.৪ শতাংশ শিশু। এই এলাকার শিশুরা নিম্ন মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হয়। শিশুদের ঠকানো সহজ, তাদের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদ তারা করে না, বিনা বেতনে কাজ থেকে যখন তখন ছাঁটাই করা হয়। তারা তাদের অধিকার ও আইন সম্পর্কে জানে না বলে শিশু শ্রমিকের প্রতি মালিকদের আগ্রহ বেশি বলে মনে করেন শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারপারসন ড. ইমরানূল হক চৌধুরী।
অভিজ্ঞজনেরা যা বলেন: ড. ইমরানূল হক চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন সরকার আইএলও কনভেনসন ৮২ তে স্বাক্ষর করার সাথে সাথে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম রোধে অঙ্গীকারাবদ্ধ। কিন্তু আজও আমাদের দেশ ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত নয়। সংসদের গত অধিবেশনে শিশু আইন ২০১৩ পাস হয়েছে। কিন্তু তা কবে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য তা আবার পড়ে থাকবে। অথচ আইন গেজেট না হলে সেই আইন বাস্তবায়ন হয় না। তাই আইন পাস নয় আইন বাস্তবায়নে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। ড. ইমরানূল হক চৌধুরী আরও বলেন, যে সকল শ্রমে শিশুকে নিযুক্ত করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব, সেসকল ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম তালিকায় ৩৮টি শিশুশ্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আমরা আরও কয়েটিকে অন্তর্ভুক্ত করতে সুপারিশ করি। যা করা হয়নি, কিন্তু করা জরুরি। শিশুর অবস্থা পরিবর্তনে শিশুর জন্য আলাদা বাজেটের উপর জোর দেন তিনি। সমপ্রতি এর একটি কাঠামো প্রকাশ করা হয়।
গণশিক্ষা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শুধু লালবাগ নয় ধোলাইখাল, কমরাঙ্গীরচর, জুরাইন, যাত্রাবাড়ী প্রভৃতি এলাকায় শিশুশ্রম পরিস্থিতি একই রকম। সরকারের গতানুগতিক শিক্ষা কার্যক্রম তাদের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারবে না। তিনি মনে করেন তাদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নিরসন ও শিক্ষার আওতায় আনতে প্রথমত অনানুষ্ঠানিক একই মানের শিক্ষা (দেশে চলমান) ব্যবস্থা চালু, দ্বিতীয়ত সরকার কর্তৃক খাবারের ব্যবস্থা করা, তৃতীয়ত তাদের সুবিধাজনক সময় অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণের সুবিধা দিতে হবে। রাশেদা কে চৌধুরী আরও বলেন বিভিন্ন এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের তালিকা সরকারের কাছে আছে। সেই তালিকা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে অবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব। তার মতে, শিশুশ্রম নিরসনে আমাদের প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ যখন কোন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয় তখন আবার ফান্ড যোগাড় করা ও প্রকল্প চালু করায় যে সময় ব্যয় হয় সে সময়ের মধ্যে শিশুরা পড়া ছেড়ে নিজের মতো জীবিকায় চলে যায়। তিনি এই সমস্যা দূরীকরণে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সরকার শিক্ষা খাতে বাজেট কমাচ্ছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এই সকল ক্ষেত্রে। ১২ শতাংশ শিক্ষাবাজেট কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে। যদিও টাকার পরিমাণ বেড়েছে কিন্তু শিক্ষাগ্রহণ করার মতো শিশুসংখ্যাও বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে : বর্তমান সরকারের এমডিজি পূরণের জন্য সকল শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা জরুরি হলেও এলাকার অধিকাংশ শিশুকে সরকার শিক্ষার আওতায় আনতে পারছে না। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল-ইসলাম বলেন, লালবাগ এলাকায় শিশু অবস্থা উন্নয়নে সরকার দুইভাবে কাজ করছে। প্রথমত ২০১১ সাল থেকে এলাকার একহাজার শিশুকে ১৫ শত টাকা করে বৃত্তি দেয়া হয় স্কুলে যাওয়ার শর্তে। যা বর্তমানে ২ হাজার টাকায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত আরলি লারনিং ফর চিলড্রেন এন্ড ডেভেলপমেন্ট বা ইএলসিডি। এই ব্যবস্থায় এলাকার কর্মজীবী শিশুদের সিটি করপোরেশনে নিয়ন্ত্রিত শিশুদের সুবিধা মত সময় শিক্ষা দান করা হয়। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়. সমাজসেবা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্মিলিতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম রোধে কাজ করছে বলে তিনি জানান। তবে এইসকল ক্ষেত্রে শিশুর সংখ্যা ও চাহিদা অনুযায়ী তাদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন তিনি।
