প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকাণ্ডের দিন মিথ্যা জন্মদিন পালন করায় বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, খালেদা জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে নন। শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া জাতীয় শোক দিবসের দিন জন্মদিন পালন করে কেক কেটেছেন। এর মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানকে বুঝিয়েছেন, তিনি এখনো পাকিস্তানের পক্ষেই আছেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে নন।
দেশের সকল গণতান্ত্রিক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, যারা চান বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াক- আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। যারা যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে চায়, আন্দোলনের নামে যারা মানুষ হত্যা করছে, দেশের সম্পদ ধ্বংস করছে, পবিত্র কোরআন শরিফ পুড়িয়ে দিচ্ছে- এসব অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়াই।
শেখ হাসিনা দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে দেশে আবারও বিদ্যুত্ ও গ্যাস উত্পাদন কমে যাবে, দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাবে, শিক্ষার হার কমে যাবে। বিএনপি-জামায়াতরা ক্ষমতায় আসলে দেশ আবারও দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।
নকল জন্মদিন পালন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, খালেদা জিয়ার এসএসসি’র সার্টিফিকেট, সামরিক অফিসার জিয়ার স্ত্রী হিসেবে দেয়া জীবনবৃত্তান্ত, বিবাহের কাবিননামা, পাসপোর্টের কোথাও জন্মদিন হিসেবে ১৫ আগস্টের কথা উল্লেখ নেই। ‘৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর হঠাত্ করেই এমন শোকাবহ দিনে তিনি মিথ্যা জন্মদিনের নামে উত্সব করা শুরু করলেন! এবারও তিনি নকল জন্মদিনের নামে এ বয়সেও যেভাবে জন্মদিন পালন করলেন তা দেখে গোটা জাতি তাকে ধিক্কার জানাচ্ছে। আসলে পরাজিত শক্তির প্রতি তার সমর্থন জ্ঞাপনের জন্যই ১৫ আগস্টের দিন মিথ্যা জন্মদিন পালন করছেন।
বিরোধী দলের নেতাকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আমরা যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি, তখন যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় অনেকে আল্টিমেটাম দেন। জামায়াত-শিবির ও হেফাজতদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের নামে শত শত কোরআন শরিফ পুড়িয়েছে, ঘুমন্ত বাসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করছে, আন্দোলনের নামে সারাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। আর এসব কর্মকাণ্ডের একটাই উদ্দেশ্য- যুদ্ধাপরাধীদের যে কোন মূল্যে রক্ষা করা। খুনি-সন্ত্রাসীদের মদদ দেয়া, লালন-পালন করাই তাদের চরিত্র। দেশের জনগণকে এদের ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। বিএনপি আগে অনেকবার ক্ষমতায় ছিল, কিন্তু ক্ষমতায় থেকে তারা দেশকে কী দিয়েছে? হত্যা, খুন, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, বিদেশে অর্থ পাচার এবং নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়া ছাড়া তো দেশের জন্য কিছুই করেনি।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আমির হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, বেগম মতিয়া চৌধুরী, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, মোহাম্মদ নাসিম, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, আহমদ হোসেন, কৃষিবিদ আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম ও সানজিদা খানম এমপি। বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিলের পরিচালনায় আলোচনা সভার শুরুতেই বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের সকল শহীদদের স্মরণে একটি মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট একরাতে বাবা-মা, তিন ভাইসহ পরিবারের ১৮ জনকে হত্যার মর্মস্পর্শী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বার বার আবেগে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। এই স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ রক্ষা করা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন এ কারণে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই পরাজিত শত্রুরা তাঁকে সপরিবারে হত্যা করে।
জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়া সবাই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের লালন-পালন, পুরস্কার ও প্রতিষ্ঠিত করেছেন অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক বাহিনীর কাঁধে বন্দুক রেখে ক্ষমতা দখল করে জেনারেল জিয়া হাজার হাজার সামরিক অফিসার-সৈনিককে হত্যা করেছে। ইনডেমনিটি দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করে দিয়ে আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের নিয়ে প্রগশ নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। জেনারেল এরশাদ খুনি ফারুক-রশিদদের দিয়ে ফ্রিডম পার্টি বানিয়ে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী পর্যন্ত করেছিলেন। আর খালেদা জিয়া ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনে খুনী কর্নেল রশিদ-হুদাদের জিতিয়ে বিরোধী দলের নেতা পর্যন্ত বানিয়েছিলেন। খুনী-সন্ত্রাসীদের মদদ, লালন-পালন করাই হচ্ছে তাদের চরিত্র।
তিনি বলেন, একজন প্রধানমন্ত্রী হয়েও দুর্নীতির কালো টাকা জরিমানা দিয়ে সাদা করেছেন খালেদা জিয়া। তাঁর ছেলেদের অর্থ পাচারের ঘটনা শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক আদালতে প্রমাণ হয়েছে। আমরা দেশের ইতিহাসে এই প্রথম তাঁর পুত্রদের পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত এনেছি। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর ভাঙ্গা স্যুটকেস আর ছেঁড়াগেঞ্জী দেখিয়ে বলা হলো, কিছুই নাকি রেখে যাননি। কিন্তু এরপরই খালেদা জিয়ার সম্পদের পাহাড় দেখেছে দেশবাসী।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোটের পাঁচ বছরের দুঃশাসন, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের তত্পরতায় দেশের মানুষ ছিল অতিষ্ঠ। এরপর তত্ত্বাবধায়কের নামে দুই বছর জরুরি শাসন দিয়ে দেশ চালানো হয়েছে। এমন কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ নেই যারা ওই সময় নির্যাতনের শিকার হননি। কিন্তু দেশের মানুষকে তারা দাবিয়ে রাখতে পারেনি। তাদের দাবির মুখে তারা নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এতো উন্নয়নের পরও সমালোচনার যেন শেষ নেই। কিন্তু যারা সমালোচনা করছেন তাদের একটু চিন্তা করতে বলবো-আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে রমজান মাসে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ দিয়েছি, তা কি বহাল থাকবে? আবার দেশে দরিদ্রতা বাড়বে, শিক্ষার হার কমবে, জঙ্গিবাদ-দুর্নীতি-সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে দেশ। তিনি বলেন, আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
সাজেদা চৌধুরী বলেন, আগামী নির্বাচনেও দেশের মানুষ দুর্নীতিবাজ, লুটেরা ও জঙ্গিবাদীদের নয়, আওয়ামী লীগকেই ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে।
আমির হোসেন আমু একাত্তরের মতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনসমর্থন হ্রাসের কারণে নয়, আমাদের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য ও সমন্বয়হীনতার কারণে চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আমরা হেরেছি। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টির চক্রান্ত চলছে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত অভিযোগ করেন, খালেদা জিয়ারা বাংলাদেশকে আবারও আলো থেকে অন্ধকারের যুগে নিয়ে যেতে চায়। চারদিকে মিথ্যাচার ও গুজব ছড়িয়ে দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে।
মতিয়া চৌধুরী বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, মা-বাপের বৈধ সন্তান হলে জন্মদিন একটাই হয়। কিন্তু ডাস্টবিন থেকে তোয়ালে পেঁচানো অবস্থায় উদ্ধার পাওয়া কোন শিশুর জন্মদিনের ঠিক থাকে না।
আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত অপশক্তির বিরুদ্ধে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুন থেকেই খালেদা জিয়া এমন মিথ্যা জন্মদিনে কেট কাটছেন।
মোহাম্মদ নাসিম সকল ভেদাভেদ ভুলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে আবারও বিজয়ী করতে জনগণের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়ার জন্য দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ১৫ আগস্ট যখন সারাদেশের মানুষ শোকে মুহ্যমান থাকেন, তখন খালেদা জিয়া বৃদ্ধ বয়সে রঙিন শাড়ি পরে মিথ্যা জন্মদিনের কেক কাটেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শুধু একজন ব্যক্তি নন, এটি একটি বিপ্লবের নাম।
