মিসরের সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজনৈতিক সহযোগীদের যোগসাজশে দেশটির বর্তমান বিচারিক ও সামরিক আমলাদের দ্বারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার সমর্থকদের ওপর ব্যাপক গণহত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নজিরবিহীন ইতিহাস রচনা করা হচ্ছে। এ লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো মিসরের সামগ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার নির্মোহ বিশ্লেষণ করা এবং দেশটির সশস্ত্র সামাজিক, রাজনৈতিক সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করা।
আরব বসন্তের পর তিউনিসিয়া, ইয়েমেন, মিসরসহ আফ্রো-এশীয় আরব রাষ্ট্রসমূহে যে গণতান্ত্রিক জাগরণ শুরু হয়, আঞ্চলিক বৃহত্ শক্তিসমূহের স্নায়ু বিরোধিতায় তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক বৃহত্ শক্তিসমূহও সেই গণতান্ত্রিক গণজোয়ারের প্রতি সতর্ক, কৌশলী ও পরস্পর দ্বিধাগ্রস্ত সমর্থন ব্যক্ত করে। ফলে আরব বসন্তের মৃদুমন্দ সমীরণে গণতন্ত্রের সদ্য রোপিত চারাগাছগুলোতে যে দোলা লেগেছিল তা পুষ্পিত বিকশিত হওয়ার আগেই শুষ্ক মরুভূমিতে এক এক করে ঝরে পড়তে শুরু করেছে। তিউনিসিয়ায় সরকার বিরোধী বিক্ষোভ, ইয়েমেনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সিরিয়ায় অচলাবস্থা, ফিলিস্তিনের ‘শান্তি’ ‘শান্তি’ নাটক, তুরস্কের গেইজি পার্ক বিদ্রোহ প্রভৃতি ঘটনা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহের উদাসীনতার কারণে দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে।
আরব বসন্তের উন্মত্ত যৌবনকালে মিসর যখন দীর্ঘ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তার ইউরোপীয় মিত্ররা স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেনি। বিশ্বের বৃহত্ শক্তিসমূহের ‘অপেক্ষা কর এবং পর্যবেক্ষণ কর’ (Wait and see) নীতি দেখে গণতন্ত্রপ্রেমী বিশ্ববাসী বেশ অবাক হয়েছিল। তিউনিসিয়ার জায়েন বেন আলীর স্বৈরশাসনের অবসানের পর মিসরের তাহরির স্কোয়ার যখন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রকম্পিত, তখন খুব ধীরে ধীরে সতর্ক পদক্ষেপে পাশ্চাত্য দেশসমূহ মজলুম গণতন্ত্রীদের পক্ষে দুই একটা দায়সারা ধরনের সমর্থন বাক্য উচ্চারণ করতে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়ায় তখন এর ব্যাখ্যায় বলা হয় যে, আরব বসন্তের শক্তিশালী গণআন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের নিশ্চিত বিজয়ের পূর্বাভাস পেয়েই তারা বিপ্লবীদের পক্ষে দাঁড়ায়। তাদের এ পদক্ষেপ ছিল কৌশলগত যাতে বিপ্লবীদের গঠন করা সরকার ব্যবস্থায় পাশ্চাত্য মোড়লরা প্রভাব খাটাতে পারেন।
আরব বসন্তের সংগ্রামমুখর মরু আবরের বিস্ফোরণোন্মুখ মুহূর্তে পাশ্চাত্য নেতৃবৃন্দের মাঝে সিদ্ধান্ত-দোদুল্য ছিল প্রকট। স্বৈরশাসকদের রাজনৈতিক সহযোগীদের অধিকাংশ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের গণতন্ত্রী, সেক্যুলার হিসেবে পরিচিত করিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শরীক হন। কিন্তু নবজাগরিত সকল আরব রাষ্ট্রে এই সেক্যুলার, গণতন্ত্রী, উদারবাদীদের সংখ্যা ছিল এতই নগণ্য যে, কোথাও সরকার ব্যবস্থায় বা নির্বাচনে অংশ নিয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। উদাহরণস্বরূপ মিসরের সাবেক জাতিসংঘ কূটনীতিক ও জাতিসংঘের পারমাণবিক ওয়াচডগ (nuclear watchdog) এল বারাদী মোবারকের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন, আবার মোবারক বিরোধী গণবিক্ষোভের নেতৃত্বেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বস্তুত, এল বারাদীর সমর্থক গণতান্ত্রিক, উদারবাদী ও সংখ্যালঘিষ্ট ব্যাপটিক খ্রিস্টানরা সকলে মিলেও ইসলামপন্থি গণতান্ত্রিক বিপ্লবীদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সুবিধাজনক অবস্থানে আসতে পারেননি। মিসরসহ সর্বত্র ইসলামিক গণতন্ত্রী এবং সেক্যুলার গণতন্ত্রীদের মধ্যে আরব বসন্তোত্তর নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইসলামপন্থি গণতন্ত্রীদের পক্ষেই জনগণের ম্যান্ডেট এসেছে। ফলে ইসলামিক গণতন্ত্রীরা তিউনিসিয়া, ইয়েমেন ও মিসরসহ অত্রাঞ্চলে সরকায় গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
মতাদর্শিক বিবেচনায় পাশ্চাত্য ইসলামী গণতন্ত্রীদের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দিতে পারেনি। আবার বাস্তব কারণে এবং আইনগত কারণে ইসলামী গণতন্ত্রীদের আইনগত ও কার্যত স্বীকৃতি (de Facto and de jure recognition and support) ও সমর্থন দিতে হয়েছে তাদের। এমন সিদ্ধান্ত দ্বান্দ্বিকতার কারণে এবং দ্বিমুখী সিদ্ধান্ত সংকটের কারণে দোদুল্যমান পাশ্চাত্য শেষ পর্যন্ত হয়তো তাদের সম-মতাদর্শিক সেক্যুলার গণতন্ত্রীদের অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। আর তাদের আঞ্চলিত মিত্ররা যারা আরব এলাকার বৃহত্ শক্তি তারা বিশ্ব রাজনীতির মৈত্রী-কাঠামোর (alliance structure) কারণে এবং তাদের সাথে পাশ্চাত্যের বন্ধুত্ব চুক্তির কারণে এসব কাঠামোগত অন্তঃতালাবদ্ধতার (structural interlocking) যাঁতাকলে এমনভাবে আটকা পড়ে আছে যে, তারা বৃহত্ শক্তির ইচ্ছের বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক ইসলামিক গণতন্ত্রীদের পাশে দাঁড়াতে সক্ষম হচ্ছে না।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বৃহত্ শক্তিসমূহের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় এখন ‘উভয় সংকট অবস্থা’ সৃষ্টি হওয়ার ফলেই মিসরের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সর্বধ্বংসী নিধনযজ্ঞের রূপ পরিগ্রহ করতে পারছে। মিসরের জনগণের ভোটে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে ডক্টর মোহাম্মদ মুরসি প্রথম থেকেই কঠিন অবস্থার মোকাবেলা করতে থাকেন। দীর্ঘ স্বৈরশাসনে জর্জরিত, ক্ষতিগ্রস্ত একটি দেশ মিসরের নানাবিধ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্যার বোঝা মাথায় নিয়ে মুরসি ও এফ এন্ড জে মিসরের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। মিসরের ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি, ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ভঙ্গুর সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক ও বিচারিক ব্যবস্থা প্রভৃতি ইস্যুর সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয় এবং তার সমাধানের প্রয়োজনীয় সময়, অর্থ ও সুযোগ নবনির্বাচিত সরকারের কাছে ছিল খুবই সীমিত ও সীমাবদ্ধ। আন্তরিক ও নিবিড় অভ্যন্তরীণ সমর্থন, অকপট আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং উদার আন্তর্জাতিক সাহায্য নিশ্চিত হলেই কেবল এমন একটি দেশের নতুন বিপ্লবী সরকার দ্রুত সফল হতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত মিসরের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এ তিনদিক থেকে কোন রকম সহযোগিতা পাওয়া তো দূরের কথা বরং ত্রিমুখী অসহযোগিতা এবং কায়েমী স্বার্থান্ধ চক্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে প্রথম থেকেই এমনভাবে নাকানি-চুবানি খেতে থাকে যে, বুঝা যাচ্ছিল এক সময় না এক সময় এ সরকার টিকে থাকতে ব্যর্থ হবে।
নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজন ছিল একটি সংবিধানের এবং একটি আইনসভার। নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভা গঠন করলেও সামরিক ও বিচারিক হুমকির মুখে সে পার্লামেন্ট শিগগিরই অকার্যকর হয়ে পড়ে। নতুন সরকার একটা সংবিধানও প্রণয়ন করে। কিন্তু সেই সংবিধান কার্যকর হওয়ার আগেই সেক্যুলার গণতন্ত্রী, সংখ্যালঘু, উদারবাদীদের দ্বারা এমনভাবে আক্রান্ত হয় যার পরিণতিতে আজকের সেনা সমর্থিত, সেনা আহূত এবং সেনা পরিচালিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আগমন।
মুরসির সরকার অর্থনৈতিক উন্নতি, চাকরি, সংবিধান প্রণয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে এমন অভিযোগ এনে যারা কায়রোতে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা কারা? মোবারকের শাসন আমলের সেই রাজনৈতিক, সামরিক, বিচারিক আমলারা, যাদের শীর্ষে রয়েছেন এল বারাদী আমর মুসা, আহমেদ শফিক, নকীব সাভিরিস এবং অন্যান্য উদারবাদী, সেক্যুলার গণতন্ত্রী ও ব্যাপটিক খ্রিস্টানরা। এদের গণতান্ত্রিক ইতিহাস একটু দেখা দরকার।
এল বারাদী জাতিসংঘের পারমাণবিক প্রহরার দায়িত্ব পালনকালে আজগুবি, বানোয়াট ও মিথ্যা রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ইরাকে মারাত্মক মারণান্ত্রের মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করে ইরাকে পাশ্চাত্য হামলার সুযোগ করে দেন। আমর মুসা হোসনি মোবারকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আরব লিগের মহাসচিব থাকাকালে মিসর ও আরব বিশ্বের শক্তিশালী পররাষ্ট্র সম্পর্ক তৈরিতে তেমন কোন অবদান রাখেননি। তামারুদ নামক ফেসবুক ও ব্লগার গোষ্ঠী, যারা মুরসি বিরোধী আন্দোলনের উন্মেষ ঘটিয়েছিল, তাদের নেপথ্য শক্তি ও অনুপ্রেরণা ছিলেন বর্ষীয়ান সমমতাদর্শিক এ নেতৃবৃন্দ।
মুরসি বিরোধী আন্দোলনকে জনবিদ্রোহ ও গণবিক্ষোভ হিসেবে চিহ্নিত করার যে প্রয়াস চালানো হচ্ছে তা তো সিএনএন, বিবিসিসহ পাশ্চাত্য মিডিয়া ও পাশ্চাত্য দেশের বেশ সমর্থন পেয়েছে। জনগণের যে অংশ জনগণ দ্বারা নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের গণবিক্ষোভ করার যোগ্যতা ও যৌক্তিকতা কোথায়? মুরসিকে উত্খাতের পর সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল সিসির বন্দুকের ওপর ভর করে বিচার বাহিনীর প্রধান আদলী মনসুর এবং আমলাকূল শিরোমনি এল বারাদীসহ সেই জনপ্রত্যাখ্যাত অংশটি, যারা সেক্যুলার গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে সামরিক বিচারিক কায়েমি স্বার্থবাদীদের দোসর হিসেবে কাজ করেছেন, তারাই এখন মিসরের তখতে তাউসের তুলতুলে আরাম ভোগ করছেন। তুচ্ছ অজুহাতে পাশ্চাত্য বিশ্ব একাট্টা হয়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণ করে সেই দেশ দুটোকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। স্বচ্ছ ও মুক্ত নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট মুরসি ও তৃণমূল জনগণের রাজনৈতিক দল মুসলিম ভ্রাতৃসংঘ (ব্রাদারহুড) তো নিশ্চয়ই গণতান্ত্রিক বিশ্বের সমর্থন পাওয়ার দাবিদার। গত দেড়মাস ধরে মুরসির উত্খাতের পর মুরসি সমর্থকদের ব্যাপক গণবিক্ষোভ দমনে নৃশংস পরিকল্পনা গ্রহণ করে গত ১৪ আগস্ট বর্বর, নিষ্ঠুর, নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে কায়রোসহ সকল শহরের গণবিক্ষোভ স্থানসমূহকে পরিত্যক্ত, ভস্মীভূত নগরীর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। ১৫ আগস্ট সিএনএন জানায়, ‘কায়রোর একটি মসজিদেই শুধু ৫০০ মিসরীয়ের লাশ কাফনে জড়িয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে।’ গত ১৪ আগস্ট ব্রাদারহুডের দাবি অনুযায়ী মৃতসংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। প্রতিদিনই মৃত্যুর নতুন নতুন তথ্য আসছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো কানায় কানায় পূর্ণ আহত মিসরীয়তে। কি হয়েছে বিশ্বের গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক পাশ্চাত্য দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া? আশার কথা:যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওবামা মিসরীয়দের ধৈর্য ধরে গণতন্ত্রায়নের পথে হাঁটার আহ্বান জানিয়েছেন এবং মিসরকে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য পুনর্বিবেচনার হুমকি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসের পথ ছেড়ে গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ফ্রান্স ও জার্মানিও মিসরের অবস্থায় উত্কণ্ঠা ব্যক্ত করেছে। ডেনমার্কের উন্নয়ন মন্ত্রী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ওপর খুবই জোর দিয়েছেন এবং তা না হলে সাহায্য বন্ধের কথা বলেছেন এবং ক্যাথরিন এ্যাস্টনের বরাত দিয়ে ইইউ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিসরে হতাহতের নিন্দা জানিয়েছেন। বিশ্বায়নের এ সভ্য যুগে প্রাগৈতিহাসিক বর্বর গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ও সংস্থাসমূহ তেমন ফলপ্রসূ ও জোরদার নীতি গ্রহণ করেনি এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের দ্বিমুখী নীতিও পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনুমিত হচ্ছে নিশ্চয়ই মিসরের নিপীড়ক নির্যাতক বিচারিক-সামরিক শাসকদের ওপর এখনো পর্যন্ত তেমন কোন আন্তর্জাতিক চাপ নেই বা ভবিষ্যতে কোন বড় ধরনের চাপ আসবে কিনা তাও স্পষ্ট হচ্ছে না। আঞ্চলিক পরাশক্তি সৌদি আরবও দীর্ঘ নীরবতা পালন করে নিপীড়কের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন ব্যক্ত করছে। ইরান, তুরস্ক, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য অনেক দেশ মিসরের পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে। ইরান সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করে ভবিষ্যতে মজলুম মিসরীয়দের পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পূর্ব-প্রস্তুতির তীক্ষ কূটনীতি প্রণয়ন করেছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ গুল হত্যাকাণ্ডকে অনভিপ্রেত, অগ্রহণযোগ্য আখ্যায়িত করে মিসরের নব্য স্বৈরশাসকদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছেন। জাতিসংঘ এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার জন্য আরো কিছু সময় নিচ্ছে। তবে গত ১৬ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি মারিয়া খ্রিস্টিনা নিরাপত্তা পরিষদের উদ্বেগের বিষয় ব্যক্ত করেছে।
মিসরের গণহত্যা, গণতন্ত্র হত্যা এবং অন্যান্য মানবতা বিরোধী অপরাধের সাথে জড়িতদের সমুচিত শাস্তি দিতে এখনই শক্তিশালী আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে পাশ্চাত্যের সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার স্থায়িত্বের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের তৃণমূল জনগণের আস্থা অর্জনের পথে হাঁটাই বেশি ফলপ্রসূ। অত্যাচারী, আগ্রাসীর পক্ষে অবস্থান নিলে পাশ্চাত্যের প্রতি যে গণ-অনাস্থা সৃষ্টি হবে তা কারো জন্য সুখকর হবে না। ইতিমধ্যে স্বার্থপর, দ্বিমুখী, আন্তঃনীতির কারণে মুসলিম বিশ্বে পাশ্চাত্যের যে অগ্রহণযোগ্যতার আত্মবন্দিত্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে সেই অবস্থা যাতে আর সৃষ্টি না হয় সেজন্য পাশ্চাত্য বিশ্বকে মিসর থেকেই আস্থা অর্জনের কৌশল অবলম্বন করতে হবে। জাতিসংঘের ওপরও এ ঐতিহাসিক দায়িত্ব বর্তায় এ মুহূর্তে। কেবল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়-দায়িত্বের বোধই মজলুম মিসরীয়দের গণতন্ত্রের আলোর পথে নিয়ে যেতে পারে।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক,
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
