খেলনা পিস্তল হাতে পোঁ পোঁ শব্দ করতে করতে বন্যার মাথার কাছে এসে দাঁড়ালো প্রজ্ঞা। ঈদের দিন থেকে আজকে পর্যন্ত প্রজ্ঞার পিস্তলের শব্দে বাড়ির সবার কান নষ্ট হবার জোগাড়। এটা ওর ঈদের নতুন উপহার, খালা দিয়েছে। প্রজ্ঞা এখনও স্কুলে যায় না আর বন্যা এবার ক্লাস ফোরে। ছোট বোনের মজা দেখে ওর কান্না আসে। আর প্রজ্ঞা ওর সাথে স্কুলে যেতে না পেরে কাঁদে! ঈদের পর সাতদিনই ও খুব মজা করেছে। গত সপ্তাহে পার্কেও বেড়াতে গিয়েছে। সারাদিন তেমন মন খারাপ ছিল না, কিন্তু এখন ঘরের কোণে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছে। একে তো এবার ঈদে আগের চেয়ে কমই মজা হল, যদিও অনেক খাওয়া-দাওয়া, এমনকি বিকালে বেড়ানো হয়েছে, তারপরও! এছাড়া মাত্র একদিন পর স্কুল খোলা। তখন আগের পরীক্ষার নম্বর দিবে, আবার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে। এই একমাস কত মজা করেছে। স্কুলের কথা মনে হলে ভয়ে জ্বর এসে যাচ্ছে। কিচ্ছু পড়েনি ছুটিতে, আর বাজে নম্বর পেলে মা-বাবা যে ওকে কি করবে? তাদের প্রতিনিধি হয়েই প্রজ্ঞা যেন খেলনা পিস্তলটা মাথার কাছে ধরেছে, যেন মারতে আসছে। বন্যার মনে হচ্ছে আবার যদি প্রথম থেকে রোজার ছুটি শুরু করা যেত।
শুধু শিক্ষার্থীরাই না, শিক্ষক, চাকরিজীবী সব পেশার মানুষের জন্য ঈদের ছুটি শেষে আবার নিয়ম অনুযায়ী চাকরিজীবন শুরু করা বেশ কঠিন। বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে চাকরিজীবী এবং শিক্ষার্থীদের সাথে ছুটি শেষে আবার নিয়মিত জীবন শুরুর অভিজ্ঞতা জানতে আলোচনা হচ্ছিল।
নীলা ক্লাস সিক্সে ভিকারুননিসায় পড়ে। প্রায় একমাস ছুটি শেষে স্কুলে যেতে কেমন লাগে জানতে চাইলে নীলা বলে— কেন ক্লাসের সবারই খুব খারাপ লাগে ছুটির পর স্কুল খুললে। তবে বন্ধুদের কাছে ঈদের মজার কথা জানতে পারব। আমাদের আগামীকালই স্কুল খুলবে। আমি গতকাল স্বপ্ন দেখলাম খোলার দিনই ক্লাস টেস্টের অংক খাতা দিয়েছে আর আমি খুব খারাপ করেছি। আমি পুরো ছুটিতে খুব ভালো করে পড়েছি। কেননা স্কুল খোলার পর সামনের মাসের আগেই আমার ফাইনাল। কিন্তু ঈদে মজা করে বেড়িয়ে, পার্কে ঘুরে সব পড়া ভুলে গিয়েছি। গত দু’দিন ধরে আবার পড়ছি, দেখি কিছুই পারি না। তবে প্রথম দিন টিচারদেরও পড়ানোর ইচ্ছা থাকে না। ক্লাসও ঠিকমত হয় না। তাই স্কুলে এক ঈদ ঈদ ভাব থাকে আর মজাই লাগে। ছুটি শেষে হলে, আবার যদি প্রথম দিন থেকে শুরু হত!
স্বর্ণা পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিল। ওর বাড়ি বগুড়া। স্বর্ণা জানায়, ‘বাড়িতে ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে ঘুরে ঘুরেই কেমনে যে দিনগুলো পার হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। প্রায় বারো ঘন্টার বাসের ভিড় ঠেলে গতকাল খালার বাসায় উঠেছি। আজকে হলে ফিরেছি। হলের বান্ধবীদের সাথে এখন ঈদ পর্ব চলছে। কে, কেমন মেহেদী দিল, কার বাড়িতে কী অভিজ্ঞতা। হলে ওঠার মাস খানেক পর, ঢাকায় মন বসে। গ্রামের বাড়ির খাবার, পুকুরঘাট, বন্ধুদের কথাই খালি মনে হয়, আর মোবাইলে খালি গল্পই চলতে থাকে। অবশ্য প্রথম দিন ক্লাস কেউ করেই না। এবার খুলেই পাঁচদিন পর পরীক্ষা শুরু। তাই মাত্র পাঁচদিনের জন্য বাড়ি গিয়েছিলাম। সারা ছুটি ধরে পুরো বছরের পড়া শেষ করেছি। তাই পাঁচ দিনই ঈদের মজা পূর্ণ হয়েছে ।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মী রিনাকে জিজ্ঞেস করলাম ঈদের ছুটি শেষে অফিস শুরু করতে কেমন লাগল? সে বলল, এবার ব্যাংকারদের ঈদ মাটি। ঈদের আগে কাজের চাপে মনে হচ্ছিল জীবন শেষই হয়ে যাবে। সব বারের মত রেমিটেন্স আর ক্যাশ আর কার্ড সেকশনে ঈদের ছুটির আগের দিন পর্যন্ত চাপ ছিল সর্বোচ্চ। ছুটি বলতে তো হল শুধু একদিন বৃহস্পতিবার। শুক্র, শনি তো এমনি ছুটি। ইচ্ছা হচ্ছিল ঈদ যদি একদিন পরে হত। শ্বশুরবাড়িতে, বন্ধুর বাড়িতে ঈদের দু’দিনই দাওয়াত পর্ব চলেছে। ইচ্ছা ছিল আমরা ঈদের পর দু’দিন ছুটি নিয়ে কোথাও যাব তাও হয়নি। গত এক সপ্তাহ অফিসে লোক কম, ঢাকা ছিল ফাঁকা। তাই অফিস গল্প আর আড্ডার মাঝেই কেটেছে। বিকালে একটু ঘোরাঘুরিও হয়েছে। এই সপ্তাহ থেকে শুরু হবে আবার পুরোদমে কাজ, একই নিয়মমত জীবন। ঈদে দেশের বাড়ি না গেলে ভাল লাগে না। মা-বাবা দেশেই থাকেন। প্রতিবার ঈদের পরে যাই এবার হল না।
আমেরিকায় আইটি সেকশনে সফটওয়্যার কোম্পানীতে আছেন রিজিয়া আহমেদ। তিন বছর পর এবার দেশে ঈদ কাটালেন। একমাসের জন্য সম্পূর্ণ পরিবার দেশে এসেছে। তার কাছে জানতে চাই ঈদ শেষে আমেরিকায় গিয়ে আবার নিয়মমতো কর্মজীবন শুরু করতে কেমন লাগবে? রিজিয়া বলেন, বহুদিন পর দেশে আসা। এত আত্মীয়ের বাসায় বাসায় বেড়ানো আর ঈদের দিনের আনন্দ বলে বোঝাতে পারব না। বাবা-মায়ের পাশে বসে যে ঈদ করতে পেরেছি, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি আছে। তবে যত ফেরার দিন এগিয়ে আসছে, মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে। গিয়েই মিটিং ডাকতে হবে। তিনটা এ্যাসাইনমেন্ট করার কথা ছিল, সবগুলাই প্রায় বাকি। যাবার পরেরদিন থেকে চাকরি শুরু। তবে মন বসতে মাস খানেক লেগে যাবে। তার তেরো বছরের মেয়ে অদ্রিতা বলছিল, আমার মনে হচ্ছে কেন আমেরিকায় ফিরতে হবে? আবার ক্লাস আর পরীক্ষা। বাসায় একা একা কিছুই ভাল লাগে না। দাদু-নানুর সাথে কাটানো দিনের স্মৃতি, আর ছবি দেখতে দেখতেই কেটে যাবে কয়েক মাস। পড়াশোনা আর হবে না। ঈদের মজা এখনও চলছে। আর ৭ দিন পর আমরা বিদেশে চলে যাব। তার একদিন পর আমার ক্লাস শুরু। পরীক্ষা, পড়া,সব চিন্তা ভুলে গেছি। মনে করতেও চাই না।
ঈদ শেষে নিয়মমত কর্মজীবনের ব্যস্ততায় ফিরে যাবার ইচ্ছা কারোরই করে না। সবারই ছুটির দিনগুলোতেই ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কাজে মন বসানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বা ফলাফল অপেক্ষা করতে থাকে ছুটি শেষে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। আবার ঈদের মজা ফেলে পরীক্ষার পড়ায় মন বসানো হয়ে পড়ে দুঃসাধ্য। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জন্য দীর্ঘ ছুটি শেষে প্রথম দিনে ঘন্টা খানেকে ক্লাস নিয়ে আবার দিন শুরু করা হয়ে পড়ে কষ্টসাধ্য, কারোর মন বসে না ক্লাসে। তাই প্রথম দিন ক্লাসেও ছুটি ছুটি ভাবই থাকে। ছুটি শেষে কর্মজীবনে ফেরা সবার জন্য কঠিন একটি প্রক্রিয়া যা চিরকাল কষ্টের ও কঠিনই থেকে যাবে।
