সাভারে ছাত্রলীগ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা এলাকায় খুন, দখল, ছিনতাই, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসাসহ হেন অপকর্ম নেই যা করে না। সাভার থানা ছাত্রলীগ আহবায়ক জাহিদুল ইসলাম ফয়সাল ও যুগ্ম আহবায়ক কামরুল হাসান জনি কমিটিতে ঠাঁই পাওয়ার পর গোটা সাভার অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। সম্প্রতি এক প্রতিবন্ধী যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সাভার কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে। ফয়সাল ও তার বাহিনীকে গ্রেফতারের দাবিতে সাভারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছে এলাকাবাসী।
জাহিদুল ইসলাম ফয়সাল সাভার থানা ছাত্রলীগের আহবায়ক হওয়ার পূর্বে ছাত্রলীগের কোন পদে ছিল না। সে আদৌ কোন কলেজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র নয়। পৌর এলাকার বাড্ডা, ছায়াবীথি, আড়াপাড়া, বনপুুকুর, সবুজবাগ, বক্তারপুর, মহল্লায় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। তার বাহিনী ওইসব এলাকায় কেউ নতুন বাড়ি করলে, জমি ক্রয়-বিক্রয়ে চাঁদা দাবি ও আদায় করতো। এছাড়াও অন্যের জমি বা পাওনা টাকা আদায়ে ‘চুক্তিতে’ কাজ করতো। এলাকায় তার রয়েছে নিজস্ব ক্যাডারবাহিনী। আর এ ক্যাডারবাহিনী নিয়ে সাভারের বিভিন্নস্থানে মোটর সাইকেল মহড়া দিলে ফয়সাল বর্তমান আওয়ামী লীগের সাভারের শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আসে। তাকে হাতিয়ার হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে সাভার থানা ছাত্রলীগের আহবায়ক কমিটির আহবায়ক পদটি উপহার দেয়া হয়। আর এতে ফয়সাল ও তার বাহিনী আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নিজ এলাকার বাইরে থানা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতা হওয়ার সুবাদে গড়ে তোলে ওয়ার্ডে-ওয়ার্ডে নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী ।
এ বাহিনী এলাকার গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা, জমি দখল, মানুষ খুন, চাঁদাবাজি, সন্ধ্যার পর ছিনতাই ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে নিজ দলের অনেকের সঙ্গেই ফয়সাল বাহিনী সংঘর্ষ ও কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে। একাধিক হত্যা ছাড়াও অস্ত্রের মহড়ার কারণে গোটা সাভার অঞ্চলে সে মূর্তিমান এক আতংকে পরিণত হয়।
কে এই ফয়সাল
বরিশালের হাকিম আলী ওরফে হাইক্যার পুত্র রাসেল ও ফয়সাল পিতার সাথে শিশুবয়সে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বসবাস শুরু করে । জীবিকার তাগিদে হাইক্ক্যা সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে হকারি শুরু করে। এসময় বনপুকুর এলাকার একটি ঝুপড়ি বাড়িতে ভাড়া থাকতো। পরে হাইক্যা বনপুকুর এলাকায় বিহারীদের ৪৯ শতাংশ জমি জোর পূর্বক দখল করে অন্যত্র বিক্রি করে। এতে সে মোটা অংকের টাকা পাওয়ায় তার ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে। ওই এলাকাতেই জনৈক বুদ্দুমিয়া ওরফে বুইদ্দার জায়গা জোর পূর্বক দখল করে অট্টালিকা তৈরি করে বর্তমানে সেখানে সে বসবাস করছে। আর তার অশিক্ষিত পুত্র রাসেল , ফয়সাল ও টিটু গড়ে তোলে এলাকায় বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী।
সন্ত্রাসী ফয়সাল ও রাসেলের
যত অপকর্ম
ফয়সাল ও তার বাহিনী তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ১৫ আগস্ট প্রতিবন্ধী যুবক শামিম (২৫) কে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করে। এনাম মেডিক্যালে ৩ দিন চিকিত্সাধীন থাকার পর শামিমের মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনায় নিহতের মা বিউটি বেগম ফয়সালকে প্রধান আসামি করে মামলা করেছে।
ধসে পড়া রানা প্লাজায় ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহকে ডেকে নিয়ে ২০০৮ সালে গুলি করে হত্যা করে ফয়সাল বাহিনী। এ মামলায় সে এক নম্বর আসামি। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। কথিত রয়েছে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার নির্দেশেই মোটা টাকার বিনিময়ে আব্দুল্লাহকে হত্যা করেছিল ফয়সাল।
চলতি বছরের জুন মাসে হাজী আনোয়ার হোসেনের পুত্র জাহিদকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ফয়সাল ও তার ভাই রাসেলের বাহিনী। এ ব্যাপারে নিহতের পিতা থানায় মামলা দিতে গেলে পুলিশ সাভার থানা আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার তদবিরে প্রথমে মামলা নিতে গড়িমসি করে পরে মামলা নেয়।
একই মাসে এ বাহিনী সাভার ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মৃত আব্দুল খালেকের পুত্র সৈকত (১৫)কে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে ফেলে রাখে। এলাকাবাসী তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় এনাম মেডিক্যালে ভর্তি করলে দীর্ঘদিন চিকিত্সার পর প্রাণে বেঁচে গেলেও বর্তমানে সম্পূর্ণ পঙ্গু।
গত ২ মাস পূর্বে ছায়াবীথি এলাকার সিমেন্ট ব্যবসায়ী আইয়ুব আলী ফয়সালকে রড সিমেন্ট বাকি না দেয়ায় তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এ বাহিনী আড়াপাড়াস্থ রাজবাড়ী ফার্মেসির মালিক সোহেলের নিকট জোরপূর্বক বিশ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করে ।
১ বছর পূর্বে ফয়সাল র্যাবের হাতে বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেফতার হয়। কয়েক মাস জেল খেটে জামিনে সে বেরিয়ে আসে।
আড়াপাড়ার দিন-মজুর বুদ্দুমিয়ার বাড়ি দখল করে ফয়সার দোতলা বাড়ি তৈরি করে বসবাস করছে।
আড়াপাড়াস্থ বালুর মাঠের সামনে ফয়সাল জুয়ার আসর বসিয়ে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, গার্মেন্টস অধ্যুষিত সাভারের বিভিন্ন নারী শ্রমিক কলোনিতে ফয়সাল ও তার বাহিনীর হাতে ধর্ষিত হয়েছে শত শত নারী শ্রমিক । কিন্তু এ বাহিনীর এতটাই দাপট যে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
সাভার বাজার রোডের একাধিক ব্যবসায়ী নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেছেন , তারা ব্যবসার স্বার্থে ফয়সালকে নিয়মিত চাঁদা দিতো । এছাড়া বাজার বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি পার্কিং স্ট্যান্ড ও ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতো।
আড়াপাড়ার মাদক ব্যবসায়ী পারভিনের সাথে ফয়সালের মাদক ব্যবসা ছিল ওপেন সিক্রেট।
মালঞ্চ এলাকার আব্দুল করিম বলেন,এ বাহিনীর বিরুদ্ধে মুখ খোলাটাও বিপদ। যে কোন মুহূর্তে যে কাউকে খুন করতে দ্বিধা করে না এ বাহিনীর সদস্যরা। এরকম অভিযোগ বনপুকুর, আড়াপাড়া, সবুজবাগ , বাড্ডা, বক্তারপুর , ছায়াবীথি, জামসিং মহল্লার শত-শত মানুষের।
সাভার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মশিউদ্দৌলা রেজা ফয়সাল বাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, মানুষ ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না করায় ইতিপূর্বে গ্রেফতার করা যায়নি। তবে প্রতিবন্ধী যুবক শামিম হত্যা মামলায় সে প্রধান আসামি। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। শামিম হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাভার থানার ওসি (তদন্ত) আমিনুর রহমান বলেন, ফয়সাল ও তার বাহিনীর সদস্যদের গ্রেফতারের জন্য বিভিন্নস্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
