গণআন্দোলনের বাতাসে সব চুল উড়ে যাবে :খালেদা জিয়া

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪৫
‘সংবিধান থেকে এক চুলও নড়বো না’ আগামী নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের জবাবে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, বেশি আস্ফাালন করবেন না, এত লাফালাফি করা ভালো নয়। জনগণের আন্দোলনের বাতাসে এক চুল কেন, সব চুল উড়ে যাবে। এমন বাতাস শুরু হতে যাচ্ছে যে, সব চুল এলোমেলো হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়বেন, নড়ে যাবেন। জনগণের আন্দোলনের বাতাসের চাপে চুল তো থাকবেই না, আপনাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষাও কঠিন হয়ে উঠবে। তাই বলবো-এখনও সময় আছে, সংসদে বিল এনে যে নামেই হোক নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনুন, আপনারাসহ সবাই মিলে সুন্দর নির্বাচন করি। তা না হলে পরে আপনাদেরই পস্তাতে হবে। স্বেচ্ছাসেবক দলের ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল সোমবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। খালেদা জিয়া বলেন, সরকার ভয়ে লাফালাফি করছে। কিন্তু আমাদের দাবি অত্যন্ত ছোট-নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক কিংবা যে নামেই হোক, নাম নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, মূল কথা তা হতে হবে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার। আমরা আন্দোলন করতে চাই না, শান্তি চাই, সবার অংশগ্রহণে অবাধ ও সুন্দর নির্বাচন চাই। গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখতে চাই। সরকারকে বলবো, খুন-গুমের কারণে জনগণ আর আপনাদের বিশ্বাস করে না। আপনারা নিজেরাই দাবি করছেন-অনেক উন্নয়ন নাকি করেছেন। তাহলে এত ভয় কেন, সবার জন্য নির্বাচনের সমতল মাঠ তৈরি করুন। আসুন সমানে সমানে খেলি, সমতল মাঠে খেলতে ভয় কিসের। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাই করুন। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, কোনো লোক একা অন্ধকারে হাটলে ভয়ে জোরে চিত্কার দিয়ে গান করেন। সরকার আজ জনবিচ্ছিন্ন। এজন্য ভয় পেয়েই তিনি চিত্কার করছেন, তার ভয়-যদি ক্ষমতা ছেড়ে দিই তাহলে পরদিন কী হবে। আমরা চাই সবাই মিলে একটি ভালো নির্বাচন করবো, কাউকে কিছু করা হবে না। কিন্তু একথাও তো ঠিক যে, আপনারা জনগণের সঙ্গে যে আচরণ করেছেন, ক্ষমতা থেকে যাবার পর, তাদের কাছ থেকে সুন্দর আচরণ কীভাবে আশা করছেন! জনগণ তখন ক্ষিপ্ত হয়ে রাস্তায় নেমে আসতে পারে। সামনের কঠোর আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিতে নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে সরিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে ১৮ দল সরকার গঠন করে দেশের উন্নয়ন করবে, একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলবে। খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী কথায়-কথায় আমাদের ভয় দেখান, বলছেন-আবার অসাংবিধানিক সরকার এলে মাইনাস-টু হবে, আমাদের জেলে যেতে হবে, ইত্যাদি। আমি কখনও মাইনাস-টু’র ভয় করিনি। সবসময়েই বলেছি-দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সে সময় পালিয়েছিলেন আপনি, ফখরুদ্দীন-মইনের সঙ্গে আপস করে আপনি দেশে ফিরেছেন। এখনও যদি সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা না হওয়ার কারণে সেরকম কোনো সরকার আসে তাহলে এর সব দায় বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে। আর আমরা তো বিরোধী দলে, অসাংবিধানিক সরকারকে আমাদের ভয় পাওয়ারও বা কী আছে। আমাদের কাছে তো কিছু নেই, তাই আমাদের কিছু হবে না। যা ক্ষতি হবে আপনার ও আপনাদের লোকজনের। কারণ চুরি করেছেন আপনি, টাকা-পয়সা সব আপনাদের কাছে। আমাদের কাছে এলে ওদেরকে আপনাদের কাছে পাঠিয়ে দেব। তাই বলছি, ভালো পথে আসুন। না হলে পাঁচ বছরে যে টাকা-পয়সা বানিয়েছেন তা ভোগ করার সময়ও পাবেন না। তিনি বলেন, জরিপে দেখা গেছে-দেশের ৯০ ভাগ মানুষ নির্দলীয় সরকার চায়। এখন হয়তো তা ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ হয়ে গেছে। তাই সরকারের উচিত সময় থাকতে ভালো কাজ করা, গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসা। প্রায় সব দল বলছে তারা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবে না। তাহলে এ সরকার নিজেদের অধীনে কাদের নিয়ে নির্বাচন করবে। মহাজোটের একটি শরিক দলও (জাতীয় পার্টি-জাপা) বলেছে, তারা কোনো প্রহসনের নির্বাচনে অংশ নেবে না, অবশ্য এদের কথা কতক্ষণ ঠিক থাকবে জানি না। তবে যেহেতু জনগণের সামনে তারা ওয়াদা করেছে তাই কথা রাখা উচিত। না হয় পরে জনগণ তাদেরও বিশ্বাস করবে না। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এখানে যে যত কাজই করুন না কেন, পাঁচ বছরের বেশি কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারে না, গত কয়েকটি টার্ম এরকমই দেখছি, জানি না ভবিষ্যতে কী হয়। আওয়ামী লীগের কাছে প্রশ্ন রেখে খালেদা জিয়া বলেন, ’৯৫, ’৯৬ সালে কি সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ছিল? কিন্তু জনগণের স্বার্থে সেদিন আমরা তা মেনে নিয়েছি। এই ব্যবস্থার অধীনে কয়েকটি নির্বাচন অবাধ হয়েছে; কিন্তু ফখরুদ্দীন-মইনের সরকার কোনো তত্ত্বাবধায়ক কিংবা সাংবিধানিক সরকার ছিল না। সেটি ছিল একটি অসাংবিধানিক সরকার। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ফখরুদ্দীন-মইনের ঐ অসাংবিধানিক সরকারকে আপনারাই নাচানাচি করে ডেকে এনেছিলেন। পরে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে সাজানো-পাতানো নির্বাচনে আপনারা ক্ষমতায় এসেছেন। রাজনৈতিক দল গঠন করে সরকারে থাকার কোনো ক্ষমতা মইন-ফখরুদ্দীনের ছিল না। তাই যে অল্প সময় ছিল, সেসময়ের মধ্যেই তারা লুটপাট করেছে, তারা লোভ সামলাতে পারেনি। গত ৫ ও ৬ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের ঘটনার কথা উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, মহানবী (সা.) সম্পর্কে যেসব ব্লগার কটূক্তি করেছে, তাদের কারণেই এই হেফাজত তৈরি হয়েছে; কিন্তু রাতের অন্ধকারে সরকার নিরস্ত্র লোকজনের ওপর ১ লাখ ৫৫ হাজার রাউন্ড গুলি ব্যবহার করেছে। বহু লোক হত্যা করা হয়েছে; কিন্তু সরকার স্বীকার করছে না। যদি তাদেরকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়ার জন্য অভিযান চালানো হয়, তাহলে রাস্তার আলো নিভিয়ে দেয়া হলো কেন? কেন দুইটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল? এর ফলেই বুঝতে আর বাকি থাকে না, সেদিন কী ঘটেছিল। তিনি বলেন, এসব কাণ্ড করে এ সরকার এখন আবার বেশি মুসলমান সাজতে চাচ্ছে, তারা কথায়-কথায় নামাজের কথা বলছে। যে সরকারের চরিত্র মানুষ খুন আর মানুষ গুম, সে সরকারকে কেউ বিশ্বাস করে না। বিরোধী দলীয় নেতা তার বক্তব্যে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর সম্পাদক অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান ও আমারদেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবি করেন। তিনি বলেন, এ সরকার বহু লোককে গুলি করে মেরেছে। এর হিসাব একদিন দিতে হবে। হলমার্কওয়ালারা এত টাকা নিয়ে চলে গেল, সেটির হিসাবও দিতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উপ-নির্বাচনসহ কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। সরকার সবখানে মাস্তান, অস্ত্র, প্রশাসন ও অর্থের ব্যবহার করেছে। শেষ পর্যন্ত তারা বলতে চায়, এতকিছুর পরেও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির লোকেরা জিতলো কিভাবে? সরকারকে বলবো-আপনারা পচে গেছেন। এখন আর প্রশাসন, অস্ত্র ও টাকা দিয়েও কোনো লাভ হবে না। আপনারা বিএনপির উন্নয়ন চুরি করে নিজেদের খাতায় দেখাচ্ছেন, তাই জনগণ আপনাদের বিশ্বাস করে না। ৪৫ মিনিটের বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারপারসন তার দল ও জোট আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে দেশের জন্য কি কি করবে, খাতওয়ারি তার বিবরণ তুলে ধরেন। খালেদা জিয়া বলেন, আমরা শুধু নতুন ধারার রাজনীতিই করবো না, নতুন ধারার সরকারও প্রতিষ্ঠা করব। বিভক্তি নয়, আমরা সবাইকে নিয়ে ঐক্যের রাজনীতি করবো। সরকারে যেতে পারলে আমরা দুইটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করব। রাস্তাঘাটসহ সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক উন্নয়ন করা হবে। বিদ্যুত্ ও গ্যাসের উন্নয়ন করব। সুশাসন নিশ্চিত করব। প্রশাসন থাকবে সম্পূর্ণ দলীয়মুক্ত, দক্ষতা-যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি হবে। কোটা পদ্ধতি সীমিত করবো, অল্প কিছু কোটা রাখা হবে। মানবাধিকার কমিশনকেও আরো শক্তিশালী করবো আমরা। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবীব-উন নবী খান সোহেলের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন-বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, তরিকুল ইসলাম, মির্জা আব্বাস ও ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা প্রমুখ। আলোচনা শেষে প্রজেক্টরের মাধ্যমে সম্প্রতি লন্ডনে দেয়া বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি বক্তব্য প্রচার করা হয়।