ঘটনা-১ : ১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিল। একজন স্কুলপড়ুয়া ছেলে তার বাবা ও বোনের সঙ্গে একাগ্রচিত্তে রেডিও শুনছিল। বাংলাদেশ-কেনিয়া আইসিসি ট্রফির ফাইনালের শেষ ওভার। ১ বলে বাংলাদেশের প্রয়োজন ১ রান। মার্টিন সুজির বল, শান্তর পায়ে লেগে ফাইন লেগে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ১ রান পূর্ণ। বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন। ছেলেটি, তার বোন, তার বাবা আনন্দে আত্মহারা হয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো। তাদের এই আনন্দে একাত্মতা ঘোষণা করলো সমগ্র বাংলাদেশ। এখান থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেট এক নব দিশা পেলো।
ঘটনা-২ : ১৯৯৯ সালের ৩১ মে। ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ ম্যাচে মুখোমুখি বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক শত্রু পাকিস্তান, ক্রিকেটীয় গুণবিচারে এক অসম দানব। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে নামা বাংলাদেশ ৬২ রানে পাকিস্তানকে হারিয়ে দিলো। জয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ আনন্দে উত্তাল হয়ে উঠলো। উত্সবের রঙে রঙিন হলো গোটা বাংলাদেশ। সেই উত্সবের হোলিতে রঙিন হলো সদ্য স্কুলপাস করা সেই ছেলেটি ও তার পুরো পরিবার। আর এই জয়ে বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির পথ সুগম হলো।
ঘটনা-৩ : ২০০৫ সালের ১৮ জুন। ইংল্যান্ডের কার্ডিফে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দল ও তত্কালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ ম্যাচ। আশরাফুলের উত্তাল শতকে খড়কুটোর মতো উড়ে গেলো টিম অস্ট্রেলিয়া। ১৯৯৭ সালের সেই ছোট ছেলেটা ততদিনে অনেক বড়। অস্ট্রেলিয়াকে হারতে দেখে লাল-সবুজের উন্মাদনায় সেদিন সে এবং তার পরিবারও ভেসে ছিল।
ঘটনা-৪ : ২০০৭ সালের ৭ এপ্রিল। ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষ করে তড়িঘড়ি করে রওনা দেয় ছেলেটি। কারণ বাড়িতে কর্কট রোগে আক্রান্ত মূমুর্ষ অবস্থায় তার বাবা। সেদিন বিশ্বকাপের সুপার এইট পর্বে বাংলাদেশ-সাউথ আফ্রিকা ম্যাচ। মাঝরাতে ছেলেটির বাবা, ছেলেটিকে ফোন দেয়—তুই তো বাসে, ম্যাচ তো দেখতে পারিসনি। আশরাফুলের ব্যাটিংয়ে আজ বাংলাদেশ সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়ে দিয়েছে। ছেলেটা প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে,বাংলাদেশের মানুষের কাছে ক্রিকেটের মাহাত্ম্য, একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষও এই আবেগকে উপেক্ষা করতে পারেনি। তার ৬ দিন পর ১৩ এপ্রিল ছেলেটার বাবা মারা যায়।
সর্বশেষ ঘটনা : ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট। আকসুর (দুর্নীতি, বিরোধী সংগঠন ) রিপোর্ট প্রকাশ। রিপোর্ট অনুসারে আশরাফুলসহ বাংলাদেশের বেশ কিছু ক্রিকেটার ম্যাচ পাতানোর সঙ্গে জড়িত। তারা টাকার বিনিময়ে ম্যাচ পাতায়। বাংলাদেশসহ সমস্ত বিশ্বের চোখে ধুলো দিয়ে জুয়াড়িদের পুতুল হয়ে তারা ম্যাচকে প্রভাবিত করে।
দায় কার? বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা কেন ম্যাচ পাতাচ্ছে—যেখানে বোর্ড থেকে লাখ লাখ টাকা শুধু বেতন হিসাবেই পাচ্ছে। বর্তমান বেতন কাঠামো অনুসারে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা শুধু বেতন হিসাবে মাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮ হাজার থেকে সর্বনিম্ন ৩৬ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। পাঁচটি গ্রেডে এই বেতন দেওয়া হচ্ছে, খেলোয়াড়দের পারফরমেন্সের ওপর ভিত্তি করে এ+, এ, বি, সি ও রুকি এরকম পাঁচ গ্রেডে বিসিবি খেলোয়াড়দের বেতন দিয়ে থাকে। বেতনভাতা ছাড়াও ম্যাচ ফি আছে। প্রতিটি টি ২০ ম্যাচ খেলে খেলোয়াড়রা পাচ্ছে ৩৫ হাজার, ওয়ানডের জন্য ৬৫ হাজার এবং টেস্ট ম্যাচের জন্য ১ লাখ টাকা। এছাড়া জাতীয় লীগ, প্রিমিয়ার লীগ, বিপিএল, আইপিএল, সিপিএল, কাউন্টি তো আছেই। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আয় পৃথিবীর অনেক দেশের খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি। এখন প্রশ্ন হলো— কত টাকা পেলে এইসব খেলোয়াড় এই দুর্নীতি, এই কপটতার আশ্রয় নেবেন না?
খেলোয়াড়দের এই অন্যায়ের দায়ভার অনেকটা বিসিবির ওপরেও বর্তায়। কোনো পরিকল্পনা ছাড়া অনেকটা অবিমৃষ্যকারিতা দেখিয়ে শুরু করলো বিপিএল। কোনো চুক্তি নেই, টিভি স্বত্বের কোনো বালাই নেই, মালিক পক্ষের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই ,তার মধ্যেই তড়িঘড়ি করে শুরু করা হলো বিপিএল। ভাবটা এরকম— ইন্ডিয়া শুরু করেছে অতএব আমাদেরও শুরু করতে হবে। দ্বিতীয় বিপিএলের কথা বাদ দিলাম, প্রথম বিপিএলের পেমেন্টও এখনও খেলোয়াড়রা পাননি। আর এবার তো পাপন, সাবের ও ঢাকা ক্লাবগুলোর সার্কাসে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের প্রধান আয়ের উত্স প্রিমিয়ার লীগই আয়োজনই করা গেলো না।
শেষ কথা : হাজার সমস্যার দেশ বাংলাদেশ। সমস্যায় জর্জরিত মানুষগুলো ক্রিকেটের মধ্যেই একধরনের প্রশান্তি খোঁজে। ক্রিকেটই এখানে একমাত্র আনন্দ, এক নিষ্পাপ আবেগ। সেদিনের সেই স্কুলপড়ুয়া ছেলেটি আজ অনেকটাই পরিপক্ব। ক্রিকেট নামক এই আবেগকে, এই অনাবিল আনন্দকে, বাংলাদেশের মর্যাদাকে যেসব খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা সামান্য টাকার বিনিময়ে ভূলুণ্ঠিত করছে তাদের আজ সে হূদয়ের অন্তস্তল থেকে ধিক্কার জানাচ্ছে। তার এই ধিক্কার, সমস্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তদের মধ্যেও একই সুরে প্রতিধ্বনিত্ব হচ্ছে।
ঢাকা
