শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বয়াতির অন্তিম যাত্রা

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০৪
‘এই পৃথিবী যেমন আছে/ তেমনি ঠিক রবে/ সুন্দর এ পৃথিবী ছেড়ে/ একদিন চলে যেতে হবে...।’ নিজের গানের কথাকে সত্যি প্রমাণ করে, সুন্দর এ পৃথিবী ছেড়ে চির বিদায় নিলেন বাউল গানের কিংবদন্তীতুল্য শিল্পী আবদুর রহমান বয়াতি। মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে যাত্রা করলেন অন্তিম পথে। গতকাল মঙ্গলবার বাদ আছর স্বামীবাগ পঞ্চায়েত কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিল্পীর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সর্বস্তরের মানুষ। সকাল সাড়ে ১১টায় আবদুর রহমান বয়াতির শেষ শ্রদ্ধানুষ্ঠান শুরু হয়। সর্বস্তরের মানুষের পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তার আবাসস্থল মাতুয়াইলের মৃধাবাড়ী ও সূত্রাপুর নূর মসজিদে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়। শহীদ মিনারে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি অনেকে ব্যক্তিগতভাবে আসেন মরমী এই সঙ্গীত সাধককে শ্রদ্ধা জানাতে। এ সময় মাইকে বাজে শিল্পীর অমর সে গান ‘মন আমার দেহঘড়ি, সন্ধান করি/কোন মেস্তুরি বানাইয়াছে...’। শুরুতেই সচিব ড. রনজিত্ কুমার বিশ্বাসের নেতৃত্বে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে নিভৃতচারী এই শিল্পীর কফিনে। এরপর একে একে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বাংলা একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ টেলিভিশন শিল্পী সংস্থা, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা, জিয়া সাংস্কৃতিক সংস্থা, জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, কণ্ঠশীলন, গণতন্ত্রী পার্টি, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, বাউল শিল্পী সমিতি, বিজিএমইএ, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, ঢাকা পদাতিক, দেশ টেলিভিশন, পথনাটক পরিষদ, বহ্নিশিখা, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, ছায়ানটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। শ্রদ্ধাজ্ঞাপন শেষে সংস্কৃতি সচিব ড. রনজিত্ কুমার বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এ বাউল শিল্পীর শূন্যস্থান কখনো পূরণ হবে না। বয়াতির সকল ঋণ পরিশোধ ও পরিবারকে সাহায্য করার জন্য শিল্পী কল্যাণ তহবিল ও প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণ তহবিল থেকে সাহায্য করা হবে।’ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বলেন, ‘গত নয় বছর ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন; কিন্তু আমাদের ব্যর্থতা আমরা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তার পাশে দাঁড়াতে পারেনি। এমনকি সরকারিভাবেও তার চিকিত্সা ও অন্যান্য কোন ধরনের সহায়তা করা হয় নি।’ আইটিআইয়ের বিশ্ব সভাপতি রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘তিনি বাউল গানকে নাগরিক জীবনে জনপ্রিয় করেছিলেন। বহু শিল্পী তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে লোকসঙ্গীতের ধারায় এসেছেন।’ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মফিদুল হক বলেন, ‘লোকসঙ্গীতকে তিনি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে নব-রূপায়ণ করেছিলেন। শহর ও গ্রামের পার্থক্য ঘুচিয়ে মাটির এই গানকে সার্বজনীন করে তুলেছিলেন।’ শিল্পী ফকির আলমগীর সরকারের কাছে আবদুর রহমান বয়াতিকে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দেয়ার দাবি জানান। আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘আমিও চাই, তিনি যেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পান; কিন্তু পুরস্কার পাওয়া নিয়ে বয়াতির মতো মানুষের কোন কিছু এসে যায় না। কারণ তিনি মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছেন, এটাই তার সবচেয়ে বড় পাওয়া।’ লোকসঙ্গীত শিল্পী ইন্দ্রমোহন রাজবংশী বলেন, ‘বয়াতি ছিলেন প্রকৃতির শিল্পী। তার গায়কীতে পরিশীলিত ভাব না থাকলেও মূল সুরটি ছিল অনন্য।’ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘তিনি সারাজীবন শিল্পী সমাজ ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’ পরে এক মিনিট নিরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠান। লোকসঙ্গীত শিল্পী আবদুর রহমান বয়াতির জন্ম ১৯৩৬ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার দয়াগঞ্জে। তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, গায়ক ও কবি। প্রায় ৪২টি দেশে তিনি লোকগান পরিবেশন করেছেন। নিজের দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে তার ৫০০ একক ও ২০০টি মিক্সড অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে।