বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহতদের এখনও তাড়া করে ফেরে সেদিনের ভয়াবহ স্মৃতি। বারুদ আর রক্তের মাখামাখির সে দৃশ্য ভেসে ওঠে তাদের সামনে। হুইল চেয়ার , ক্র্যাচে ভর করে অনেকে জীবন কাটাচ্ছেন। অনেকে শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রেনেডের বিষাক্ত স্প্লিন্টার। এদেরই একজন রাজধানীর থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি দৌলতুন্নাহার। হামলায় তিনি বাম চোখ হারিয়েছেন। ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল ডান পা। লাঠিতে ভর করে চলাফেরা করতে হয়। সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, সেইদিন মারাও যেতে পারতাম। কিন্তু আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি। দীর্ঘ নয় বছর ধরে শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছি গ্রেনেড হামলার স্মৃতি। কিন্তু এখন আর চাইবার কিছু নেই, দাবি একটাই- ঘাতকদের বিচার চাই। জীবদ্দশায় ঘাতকদের বিচার হয়েছে দেখে যেতে পারলে মরেও শান্তি পেতাম। একই কথা জানিয়েছেন, সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেত্রী সাহিদা তারেক দিপ্তি, যিনি শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিন শতাধিক গ্রেনেডের স্প্লিন্টার।
সেই ভয়াবহ স্মৃতি সম্পর্কে দৌলতুন্নাহার বলেন, আহত হবার কারণে স্কুলের চাকরিটাও হারাতে হয়েছে। কেমন আছেন জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ঘটনার পর চার বছর খুব কষ্টে ছিলাম। নেত্রী (প্রধানমন্ত্রী) দায়িত্ব গ্রহণের পর খোঁজ-খবর নিয়েছেন। এটাই বড় সান্ত্বনা।
পুরানো ঢাকার ৮১ নম্বর গেন্ডারিয়া ইউনিটের সভাপতি শরীফ হোসেন খোকন। চলাফেরা করছেন ক্র্যাচে ভর করে। এখনও রাজনীতি আঁকড়ে ধরে আছেন। তিনি বলেন, সেদিনের কথা মনে হলে এখনও সারা শরীর ঘেমে একাকার হয়ে যায়। মাঝে মধ্যে রাতে ঘুমাতে পারি না। এ নিয়ে এখন আর ভাবি না। তবে ঘাতকদের উপযুক্ত বিচার হয়েছে , মৃত্যুর আগে এটা দেখে যেতে চাই।
ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার তুহিন খান জানান, ঘটনার দিন মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানের পাশে যে তিনজন মহিলা কর্মী ছিন্নভিন্ন হয়ে ঘটনাস্থলে পড়ে ছিলেন তাদের একজন ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা মাহবুবা পারভীন। বাসা সাভারের ব্যাংক কলোনিতে।
শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রেনেডের অসংখ্য স্প্লিন্টার। ক্র্যাচে ভর দিয়ে তাকে চলতে হয়। তিনি বলেছেন, শত কষ্টের মাঝেও একটাই দাবি ঘাতকদের বিচার।
গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ নিহতদের মধ্যে ৭ জন ছিলেন ঢাকার বাসিন্দা। এ ৭ জনের একজন রফিকুল ইসলাম ওরফে আদা চাচা। বাসা খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগে। আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটি সমাবেশে তার ছিল উপস্থিতি। নেতাকর্মীদের আদা খাওয়ানোর মধ্যে ছিল তার মহাআনন্দ। এই নির্বিবাদী মানুষটিকে বাঁচতে দেয়নি ঘাতকরা। গ্রেনেড হামলায় যে চারজন মহিলা কর্মী নিহত হয় তাদের দুইজন ছিলেন হাজারীবাগের। এরা হচ্ছেন রেজিনা বেগম ও সুফিয়া বেগম। রেজিনা পাসপোর্ট অফিসে চাকরি করতেন। দেখভাল করতেন বাবা মাকে। সুফিয়া বেগম ছিলেন কারুশিল্পী। গ্রেনেড হামলায় আহতদের মধ্যে ৫০ জনই হাজারীবাগ এলাকার। এরা সবাই এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন অভিশপ্ত গ্রেনেড হামলার ক্ষত চিহ্ন।
চাঁদপুর প্রতিনিধি গোলাম কিবরিয়া জীবন জানান, গ্রেনেড হামলায় নিহত চাঁদপুরের বাসিন্দা কাঠমিস্ত্রি আতিকুল ইসলাম ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আঃ কুদ্দুছের পরিবারে এখনো শোক কাটেনি।
কুদ্দুছের মা আমেনা বেগম পুত্রের স্মৃতি স্মরণ করে কেঁদে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবন রক্ষার্থে আমার ছেলে সে দিন প্রাণ দিয়েছিল। মা হিসেবে পুত্রের এ মহত্ কাজের জন্য আমি আজ গর্বিত। আমি বেঁচে থাকতে গ্রেনেড হামলাকারী ঘাতকদের বিচার দেখে যেতে চাই।
খোকসা ( কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা মনিরুল ইসলাম জানান, গ্রেনেড হামলায় নিহত শেখ হাসিনার দেহরক্ষী কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ফুলবাড়ী গ্রামের কৃতী সন্তান ল্যান্স কর্পোরাল (অব.) মাহবুব রশিদের মা হাসিনা বেগম বলেন, ‘এই মাস (আগস্ট) আসলিই সামবাদিকরা (সাংবাদিকরা) আইসে আরো জ্বালা বাড়ায়ে দেয়। কেউ কি আমার ছেলেকে আইনে দিতি পারবি। আমার কেউ তালাশ নেয় না, আমি কিরম আছি। যা যাওয়ার তো আমারই গ্যাছে, আপনারা কি ফিরে দিতি পারবেন।’ মাহবুবের স্ত্রী শামীমা আক্তার আছমা ও তার দুই ছেলে আশিক ও রবিন কুষ্টিয়া জেলা সদরে থাকেন । প্রথম প্রথম মাহবুবের মা-বাবার সাথে যোগাযোগ রাখলেও এখন আর কেউ যোগাযোগ রাখেন না।
