রাজনীতি

রাজনীতির আলোচনা বনাম সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে ভাবনা

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৩, ২২:০০
সবাই শুধু রাজনীতি নিয়ে কথা বলে। কে ক্ষমতায় আসবে আর কে ক্ষমতার বাইরে থাকবে সেই হিসাব-নিকাশ হয় প্রায় সর্বত্র। নাশতার টেবিলে, রেস্টুরেন্টে, পত্রিকার পাতায়, টকশো বা অন্য প্রায় সব ধরনের সামাজিক বা ঘরোয়া আলোচনাতে আপনা-আপনিই চলে আসে দেশের রাজনীতির কথা। সামনের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা। আবার নির্বাচন হলেও দেশের ক্ষমতায় আসলে কে আসবে এবার—জোট না মহাজোট সে প্রশ্ন তো থেকেই যায়। নিকট অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ১৯৯১ সালের পর থেকে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। পাঁচ বছর ক্ষমতায় যদি বিএনপি বা জোট থেকেছে তাদের উপর বিরক্ত হয়ে মানুষ পরের পাচ বছরের জন্য ক্ষমতায় বসিয়েছেন আওয়ামী লীগ বা মহাজোটকে। আবার আশায় বুক বেঁধে আওয়ামী লীগ বা মহাজোটকে ভোট দিলেও দুরাশা যেন কাটে না মানুষের, বিরক্তির পুনঃপ্রকাশ ঘটে এবং পরিবর্তনের তাগাদা দেখা দেয় আবার। এ যেন এক ভাইস-ভারসা (vice-versa) প্রসেস অর্থাত্ ঘুরে-ফিরে হয় বিএনপি বা জোট, নয়তো আওয়ামী লীগ বা মহাজোট। মাঝে-মধ্যে ওত পেতে থাকতে দেখা যায় তৃতীয় শক্তিকেও। যারা মূলত দেশের রাজনৈতিক ঘোলা পরিস্থিতির দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকেন। সুযোগ পেলেই কায়দা-কৌশল করে ছোঁ মেরে ক্ষমতার আসনে অভিষিক্ত হন। ইদানীং অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত এই তৃতীয় শক্তির জুজুর কথা আবারো মানুষের মুখে মুখে উঠে আসছে। এরূপ যখন রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে দেশ অগ্রসর হচ্ছে, তখন আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার তনয় তারেক রহমান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর তনয় সজীব ওয়াজেদ জয়কে ঘিরে। অনেকেই মনে করেন যে, তারেক রহমান বিএনপির রাজনীতিতে অভিষিক্ত হলেও জয়ের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অভিষিক্ত হওয়াটা হয়তো সময়ের ব্যাপার মাত্র। যদিও বাংলাদেশের পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাবাহিকতায় দুই পরিবারের এই দুই তনয়কে দেশের মানুষ কিভাবে গ্রহণ করবে তা হয়তো সময়ই বলে দিবে। তা দেখার জন্য ধৈর্য ধরে তাই অপেক্ষা করতে হবে আমাদেরকে বেশ কিছুদিন। এসব আলোচনার ফাঁকে আরও যেসব তর্ক-বিতর্ক উঠে আসে তা হলো—৭১-এর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শাহবাগে গণজাগরণের সৃষ্টি এবং এই গণজাগরণকারীরা মূলত ৭১-এর ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ চত্বরে এসে একত্রে মিলিত হয়েছিল। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন যে, এই শাহবাগের প্যারালাল শক্তি হিসাবে হঠাত্ করেই হেফাজতে ইসলামের সৃষ্টি, যারা মূলত ৫ মে নারীর অধিকার খর্ব ও ব্লগারদের ফাঁসিসহ ১৩ দফা দাবি নিয়ে শাপলা চত্বরে এসে বিপুল সমাগমে বসে পড়ে এবং যারা তেঁতুল তত্ত্বেও বিশ্বাসী। একদিকে শাহবাগের গণজাগরণের পক্ষে যেমন নৈতিক সমর্থন দেয় আওয়ামী লীগ, তেমনি হেফাজতের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায় বিএনপি। আবার ভোটের হিসাব-নিকাশে ৭১- এর স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলাম তো বিএনপির পাশেই রয়েছে। তাছাড়া দেশে আস্তিক-নাস্তিক নিয়ে তর্ক-বিতর্ক নতুন করে উদিত হয়েছে। এরূপ অনেক রাজনৈতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে আমরা নিজেরা অনেক সময় অযথা তর্ক-বিতর্ক ও মন কষাকষিতে জড়িয়ে পড়ি। যার আড়ালে সমাজের অনেক বড় সমস্যা বা অবক্ষয়গুলো ঢাকা পড়ে যায়। কথায় আছে ধর্ম যার যার দেশ সবার। তাই রাজনীতির আলোচনা বা দেশকে নিয়ে ভাবনা তো দোষের কিছু নয়। তবে রাজনীতির আলোচনার আড়ালে আমরা যেন প্রতিনিয়ত ঢেকে ফেলছি সামাজিক অবক্ষয়ের ভাবনাগুলোকে। সমাজের অন্ধকার গলির দূষণকে মুক্ত করতে আমাদের যে নিজ নিজ দায়-দায়িত্ব, তা থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আমরা। তাই আজ সমাজের হানাহানি ক্রমে বেড়েই চলেছে। খুন-খারাবি যেন নিত্যদিনের ঘটনা। হিংসা-বিদ্বেষে যেন ছেয়ে গেছে সমাজ। দুর্নীতির আগাছাগুলো যেন সব জায়গায় পৌঁছে গেছে। সমাজের বিবেকবান মানুষের তাই সময় এসেছে সমাজকে নিয়ে ভাবার, সমাজের দূষণগুলোকে পরিশোধিত করার দায়িত্ব নেবার। আর এই সামাজিক অবক্ষয়গুলো দূরীকরণের জন্য আদর্শিক, সত্ ও চারিত্রিক নাগরিকের কোনো বিকল্প নেই। সামাজিক অবক্ষয়গুলো যত দ্রুত দূরীভূত হবে অসুস্থ রাজনীতির পরিধিও তত হ্রাস পাবে। একটি আদর্শিক দেশ তো হওয়া উচিত একটি আদর্শিক সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। চারিত্রিক সংশোধন ও আদর্শিক নাগরিক ব্যতীত সেই অর্জন কী করে সম্ভব? লেখক:যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত [email protected]