[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

রক্ত দিয়ে চিন্তা ধুয়ে ফেলার মূর্খতা মিসরে

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৩, ২২:২২
রাজনীতি ও রাষ্ট্রকর্মে ধর্ম ব্যবহারকারীদের মিসরের ক্ষমতা থেকে বলপূর্বক হঠানো হয়েছে কয়দিন আগে। এরপর এদের রাজপথ ছাড়া করা হয়েছে ব্যাপক রক্তপাত-প্রাণহানির মধ্য দিয়ে। সামরিক সমর্থনপুষ্ট কর্তৃপক্ষ একমাসের জরুরি অবস্থাও জারি করেছে দেশটিতে। দেড় বছর আগে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারককে বিতাড়িত করে গণতন্ত্রের বসন্ত এনেছিল মিসরিয়রা। কিন্তু কি ঘটেছে সেখানে এখন? সে বসন্ত গণতন্ত্রের সত্যিকারের ফুলটি ফোটাতে পারলো কই? মিলিটারি আর মৌলবাদীদের কখনো মিত্রতা কখনো শত্রুতার জের ধরে মিসরিয় গণতন্ত্র কীটদষ্ট হয়ে পড়েছে। আর এবার যা ঘটছে তা বলতে গেলে গণতন্ত্রের জীর্ণশীর্ণ ফুলটিকে একেবারে বোঁটা থেকেই ছিঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। মিসরে আবার কবে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইবে তা কে বলতে পারে? রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারওয়ালারা নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসেছিল মিসরে। এরা নানা রকম প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল। আর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে যতটা সম্ভব বাড়িয়ে নিয়ে ক্ষমতাকে কুক্ষীগত করে ফেলার চাতুরি শুরু করেছিল। মিসরিয় গণতান্ত্রিক শক্তি কিন্তু এ সমস্ত কার্যকলাপের যথোচিত গণতান্ত্রিক জবাব দিতেও শুরু করেছিল। দৃশ্যত বিশৃঙ্খল মনে হলেও এমন করেই গণতন্ত্রের নৌকাটি ধীরগতিতে হলেও সামনের দিকে এগুতে শুরু করেছিল নীল নদের দেশে। কিন্তু এ অগ্রগতি দৃশ্যতই মনপছন্দ হলো না মিলিটারির। এরা গণতন্ত্র বাঁচানোর নাম করে গণতন্ত্রবিমুখ কিন্তু নির্বাচিত কর্তৃপক্ষটিকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিলো বাহুবলে। তাহলে কি দেখা যাচ্ছে? দেখা যাচ্ছে এই যে গণতন্ত্রবিমুখ ক্ষমতাসীন শক্তিটির সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব্বে আপাতত জয়ী হয়েছে আরেকটি গণতন্ত্র বিরোধী শক্তি। ক্ষমতা দখলকে জায়েজ করে নেয়ার চালাকি থেকে ক্ষমতা দখলের গায়ে গণতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতার চাদর পরিয়ে দেয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, মতাদর্শের দিক থেকে গণতন্ত্রবিমুখ শক্তিকে ক্ষমতা থেকে হটানোর জন্য অগণতান্ত্রিক শক্তির হস্তক্ষেপকে বৈধ বলে মান্য করা যাবে কি? প্রো-গণতন্ত্রীরা এর উত্তরে অবশ্যই ‘না’ বলবেন। এটা স্পষ্ট যে ‘আদি পাপ’ মিসরিয়দের পিছু ছাড়েনি। মোবারক বিরোধী আন্দোলনের সময় মিসরের গণতন্ত্রীরা গণতন্ত্র আস্বাদনের ব্যাকুলতাতে মিলিটারির গলায় মালা পরিয়েছিল। এই ভ্রান্তি এখনো কাটেনি। এবারো মুসলিম ব্রাদারহুডকে মাঠছাড়া করার গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক না রেখে মিলিটারির ঢুকে পড়াটাকে মেনে নেয়া হলো! রাষ্ট্রকর্মে ধর্মের ব্যবহারের মত মিলিটারির হস্তক্ষেপও অনাকাঙ্ক্ষিত। মিসরি গণতন্ত্রীরা দ্বিতীয়টির ব্যাপারে বারংবার অসচেতনতাকে দেখিয়ে চলছে। গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে হাত ধরাধরি করে চলতে হয়। একটির অভাবে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী হয় না—একটি বড় প্রমাণ হচ্ছে তুরস্ক। মিলিটারি আর সাংবিধানিক আদালতের ঠেকনা দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাকে দীর্ঘস্থায়িত্ব দেয়া যায়নি সেখানে। যত সময় লাগুক না কেন চিন্তাকে চিন্তা দিয়ে প্রতিহত করতে হয়; অগণতান্ত্রিক শক্তিকে গণতান্ত্রিক উপায়ে মোকাবেলা করাটাই লাভজনক—এসব বোধের অভাব মিসরের গণতন্ত্রপন্থিদের মধ্যে প্রকট। তাই তারা মোবারক ঠেকাতে কিংবা মৌলবাদ ঠেকাতে মিলিটারির কাছে চলে যায়। শরীর থেকে রক্ত ঝরিয়ে মনের গোপন কন্দরে লুকিয়ে থাকা চিন্তাকে ধুয়ে-মুছে ফেলা যায় না। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড একটি সুনির্দিষ্ট চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে। মিসরের গণতন্ত্রীরা যদি এই চিন্তাকে গণতন্ত্র বিরোধী মনে করে তাহলে গণতান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করে একে মোকাবেলা করাটাই হবে কাজের কথা। ধর্মান্ধ-প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু রাজনৈতিক নয় এটা সামাজিক পর্যায়েও লড়ার বিষয় বটে, এটাই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা। মিসরি গণতন্ত্রীদের বড় ভুল এখানেই। মৌলবাদের বিরুদ্ধে মিলিটারিকে ব্যবহার করে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা? এত সোজা? মিসরের মিলিটারি কি সাগু-বার্লি খায়? কে কাকে খেলাতে চায়? মনে আছে, মোবারকের বিদায়ের পর মিলিটারি-মৌলবাদী আঁতাতে গণতন্ত্রীরা কিছুদিনের জন্য একেবারে দৃশ্যপট থেকেই উধাও হয়ে গিয়েছিল। পার্লামেন্টে গিয়েছিল ব্রাদারহুড গণতন্ত্রীদের ফাঁকি দিয়ে। পরেতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও জিতে নিয়েছিল। আসলে প্রগতিশীল হোক আর প্রতিক্রিয়াশীল হোক রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে কোন চিন্তাকে জনসমষ্টির মন থেকে মুছে দেয়া যায় না; নিশ্চিহ্ন করে ফেলা যায় না। বরং আক্রান্ত চিন্তাটি গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক যাই হোক না কেন, নিজের আক্রান্ত রূপ ফেরি করে জনমনে দরদ জাগিয়ে আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়ে গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলে পুনরায় প্রগাঢ় আঘাত হানার আশঙ্কা তৈরি করে। ব্রাদারহুডকে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়ার রক্তপাতের সমালোচনাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সোচ্চার হয়েছে; কেবল ব্যতিক্রম প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের কথাবার্তাতে কেমন যেন দায়সারা ভাব। ব্যাপারটা সিরিয়াসলি ভেবে দেখার মত। লেখক :শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়