সমাজে একটি ঘটনা হয়ে উঠতে পারে বিশাল একটি উদাহরণ। একটি ঘটনা নাড়িয়ে দিতে পারে জীবনের অনেক হিসাব-নিকাশ। এ সময়ে তরুণদের বেপরোয়া জীবনযাপন ভাবিয়ে তুলছে সচেতন মানুষদের। সামাজিক সমীকরণ নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে সবাই। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন শেষ পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের কত নিচে ছুড়ে ফেলে, সাম্প্রতিক একটি ঘটনা তারই উদাহরণ হলো। এ নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন তাহের মানিক
সারা পৃথিবীর বড় মাপের মানুষেরা যারা কোনো না কোনোভাবে পৃথিবীর প্রেক্ষাপটকে বদলে দিয়েছেন তাদের সবার মুখেই উচ্চারিত হয়েছে তারুণ্যের জায়গান। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ওরে নবীন ওরে আমার কাঁচা/ আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’ নেতাজী সুভাষচন্দ্রের দৃষ্টিতে তারুণ্য এক অনাবিল সৃষ্টির প্রতীক। তিনি তারুণ্যকে চিত্রায়িত করেছেন এভাবে—‘আশা, উত্সাহ, ত্যাগ ও বীর্য লইয়া আমরা আসিয়াছি। আমরা আসিয়াছি সৃষ্টি করিতে, কারণ সৃষ্টির মধ্যেই আনন্দ। মন-প্রাণ-বুদ্ধি ঢালিয়া দিয়া আমরা সৃষ্টি করিব। নিজের মধ্যে যা কিছু সত্য, যা কিছু সুন্দর, তা আমরা সৃষ্টি পদার্থের মধ্যে ফুটাইয়া তুলিব।’ আমাদের কবি সুকান্ত, যার নামটিই হয়ে গেছে তারুণ্যের প্রতীক। যার আকাঙ্ক্ষা ছিল—‘এ পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/ নব জাতকের প্রতি এ আমার অঙ্গীকার।’
অভিধানের হিসাবে তের থেকে উনিশ অর্থাত্ থার্টিন টু নাইনটিন হচ্ছে টিনএজ। অদ্ভুত এক সময় পব—কখনও প্রজাপতির মতো উড্ডীন, কখনোবা স্বপ্নাহত হয়ে বিষণ্ন প্রহর যাপন। তরুণরা কখনও একাকী, কখনও দলবদ্ধ, কখনোবা ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার। এদের জিজ্ঞাসা অনেক। জিজ্ঞাসাগুলো মাঝে মাঝেই মুখথুবড়ে পড়ে। অনেক সময় জিজ্ঞাসাগুলোকে অবান্তর মনে হয়। আসলে কিন্তু অবান্তর নয়। দ্বারে দ্বারে প্রশ্ন থাকে। উত্তর পায় না। সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখে। উপায় খুঁজে পায় না। সামনে আদর্শের ফোয়ারা। ধরতে গেলে গ্যাস বেলুন হয়ে যায়। বড় বড় বুলি কপচানো মানুষের অভাব নেই। পথ দেখাবার কাণ্ডারি? হায় সে কোথায়! সামনে অন্ধকার। বদলে যাচ্ছে পোশাক-আশাক, পছন্দ-অপছন্দ, জীবন যাত্রার গতিবিধি। অমিত তারুণ্যের একটা বিশাল বিচিত্র মাদক আসক্তিতে ক্রমাগত ছুটে চলছে ধ্বংসের দিকে।
তারুণ্য মানেই গতি, গতি মানেই তারুণ্য। কেবলই ছুটে চলা, সামনে ছুটে চলা। অন্ধকার চিরে আলোর দিকে ছুটে চলা, পেছনে ফিরে তাকানো নয়। সৃষ্টির নেশায় মত্ত তরুণ আটকে থাকা কিংবা আঁকড়ে রাখায় বিশ্বাসী নয়, ভাঙা-গড়াই তার ধর্ম। এ ধর্মে বিশ্বাসী তরুণরাই গড়ে তুলছে নব নব সভ্যতা, জন্ম দিচ্ছে নিত্য নতুন ধ্যান-ধারণার, উন্মেষ ঘটাচ্ছে নবচেতনার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে শাণিত করেছে তার উচ্চ শির। অন্যায়কে মেনে নেওয়া নয়, শোষণকে হজম করা নয় অবিচারের কাছে নতি স্বীকার নয়। শির খাড়া করে, জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এগিয়ে চলেছে সে।
যত দোষ নন্দ ঘোষ
অপরাধ করার আগ পর্যন্ত অপরাধী অধিকাংশ সময়ই জানে না যে সে একটি অপরাধ করতে চলেছে। এ ঘটনাগুলোকে সাধারণ বা স্বাভাবিক ধরে নিলে ভুল হবে। কারণ, যেসব তরুণ-তরুণী অপরাধ করে, তারা কেউই পেশাদার অপরাধী নয়। আসলে আমাদের সামাজিক কাঠামোতে এমন কিছু পরিবর্তন হয়েছে এবং হচ্ছে, যার ফলে তরুণ-তরুণীরা অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ে। তাই প্রথমেই পরিবার, সমাজের ওপর দোষ চাপানোটা ঠিক নয়। আর এটা তো অবশ্যই স্বীকারযোগ্য যে, তরুণ-তরুণীরাও সবসময় ধোয়া তুলসিপাতা হয় না। অনেক সন্তান বাবা-মায়ের অতি আদরে উচ্ছনে যায়। আবার অনেকে অতিরিক্ত শাসনের কারণে বিপথে যায়। মা-বাবাকে বোঝানোও সন্তানদের দায়িত্ব। কয়েকটা সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করলে ব্যাপারটি
পরিষ্কার হবে।
সমস্যা যখন বাবা-মা
জানি, বাক্যটি পড়ার পরপরই বাবা-মায়েরা প্রবল আপত্তি জানাবেন। লেখকের বিরুদ্ধে আন্দোলনও ঘোষণা করতে পারেন। তাই তো, বাবা-মায়ের মতো আপন কি পৃথিবীতে আর কেউ আছে? কথাটা সত্য বটে। তবে অনেক সময় তাদের শাসন সীমা ছাড়িয়ে যায়, যা সন্তানের ওপর অবাঞ্ছিত চাপ তৈরি করে। মূলত বাবা-মা চান, তাদের অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো সন্তানের মধ্যদিয়ে পূরণ করতে। কিন্তু তারা ভুলে যান, প্রত্যেকটি মানুষের স্বতন্ত্র ইচ্ছা আছে। নিজের ইচ্ছাগুলো অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ ধরনের ঘটনায় অধিকাংশ সময়ই মা-বাবার ইচ্ছার কোপে বলি হতে হয় সন্তানদের। সবসময় এ ব্যাপারটি বড় হয়ে না দাঁড়ালেও ভেতরে ভেতরে তুষের আগুনের মতো মিটিমিটি জ্বলতে থাকে ইচ্ছাধ্বংসের যন্ত্রণাটুকু। অতিরিক্ত শাসনের ফলে অনেক সময় মানসিক শূন্যতা দেখা দেয়। কোনো সন্তান যদি আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলে যে, সে গান গেয়ে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তাহলে সফল হয়ে দেখানোর দায়িত্বটাও তার। সাময়িকভাবে বাবা-মা নাখোশ হলেও সফল হওয়ার পর ঠিকই তারা মেনে নেবে।
আসলে আমাদের তারুণ্যের যে সমস্যাগুলো, তাকে আমরা যা বলেই চিহ্নিত করি না কেন তাতে সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। তার জন্য তারাও খুব বেশি দায়ী নয়। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আর পারিবারিক মূল্যবোধই এই সমস্যাগুলোর মূল আবাসভূমি। এই জায়গাগুলোকে যদি আমরা ভালোভাবে মেরামত করে দিতে পারি তবে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে। কারণ আমরা শুধু আমাদের পূর্ব পুরুষদের রেখে যাওয়া কীর্তির উপর ভর করেই পথ চলি। তবে সবকিছুর পরও টিনএজ ছেলেমেয়েদের সুস্থ মানসিক ও শারীরিক বিকাশের মূল ভূমিকাটি পালন করে তার পরিবার। আর প্রতিটি পরিবারকে মনে রাখতে হবে, বাড়ির তরুণ বা তরুণীটি পুরোপুরি ফুলের বাগান কিংবা কুমারবাড়ির মাটি। সঠিক পরিচর্যা আর পালনের মধ্য দিয়েই পেতে পারি একেকটি সুবাসিত ফুল। কিংবা কুমারের নিখুঁত ও চৌকস হাতের স্পর্শে পেতে পারি একেকটি চমত্কার মানুষ।
