ক’জন মানুষ আছে নানা প্রতিকূল অবস্থা ও প্রতিনিয়ত নানা বাধা অতিক্রম করে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে। এ ধরনের গুণী মানুষের সংখ্যা খুব একটা বেশি নয় এ পৃথিবীতে। এমনি একজন মানুষের বাস্তব জীবন চিত্র নিয়ে এ প্রতিবেদন লিখেছেন জাহিদ হাসান
প্রতিদিন পেট পুরে খেতে পারেন না যিনি, অভাব যার প্রতি মুহূর্তের ছায়া—সেই মানুষটা উচ্চশিক্ষিত হতে বিসর্জন দিয়েছেন সব চাওয়া-পাওয়া। করতে হয়েছে ৭৫০ টাকা বেতনে অফিস সহকারীর চাকরি। সুযোগ হয়নি নিয়মিত ক্লাস করার। এ রকম একজন মানুষ দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিতে ছুটে বেড়ান। শুধু তা-ই না তাদের নিয়ে আয়োজন করেন দরিদ্র ও মেধাবীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, যাতে করে এসব শিক্ষার্থীর মনোবল ভেঙে না পড়ে বরং আরও যেন শক্ত হয়। আর এসব খরচ জোগাতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন জেলার বিভিন্ন সচ্ছল মানুষেরা। শিক্ষার্থীদের নিয়ে এ যেন এক আন্দোলন তার। এমনই এক মানুষ বগুড়ার সোহেল রানা। নিজেও থেমে নেই, সব বাধা জয় করে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি নিজের খরচ মেটাতে ও পরিবারের সহযোগিতার লক্ষ্যে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। ‘জোরে জোরে পড়লে ক্ষুধা লেগে যায়। তাই জোরে জোরে পড়তাম না। অভাবের সংসার, ক্ষুধা লাগলে ঘরে খাওয়ার মতো কিছু থাকত না। আর জোরে জোরে না পড়লে পড়া মুখস্থ করতে খুব কষ্ট হতো। মনে মনে পড়েই প্রাথমিক পেরিয়ে বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান শাখা থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হই। মাটির ঘরে চার ভাইবোনসহ ছয় সদস্যের পরিবার আমাদের। বাবা প্রথমে মাসিক ৪ হাজার টাকা বেতনে একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। পরে ঘরের সঙ্গে মিলিয়ে ছোট একটি দোকান দেন। তখন আমরা তিন ভাইবোন পড়ালেখা করি। যা আয় হতো তা দিয়ে আমাদের পরিবারের খরচ চালানোই ছিল খুব কষ্টকর। তার ওপর আমাদের লেখাপড়া। মাধ্যমিক পাসের পর গ্রামের অনেকেই আমাকে বলল, ‘‘তোর আর পড়াশোনার দরকার নেই। অভাবের সংসার, কাজ শুরু করে দেওয়াই ভালো।” কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম উচ্চশিক্ষিত হব, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। শুধু তা-ই না, পাশাপাশি গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কিছু করব। আমার আগ্রহ দেখে পরিবার দোটানায় পড়ে যায়। একবার বলে, নিজের খরচে পড়তে পারলে পড়। আবার বলে, আর পড়ার দরকার নেই। সব বাধা জয় করে উচ্চশিক্ষার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছি নিজেকে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানি স্টাডিজে স্নাতকোত্তরে পড়ছি।’ এভাবেই নিজের সংগ্রামী জীবনের বর্ণনা করলেন মো. সোহেল রানা। এখানেই শেষ না, রয়েছে তার না-বলা আরও কিছু কথা—‘মাধ্যমিক পাসের পর যখন পরিবার থেকে বলল, নিজের খরচ নিজেকেই জোগাড় করে পড়তে হবে। সে সময়ে সরকারি আযিযুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আবদুর রশীদ স্যারের সঙ্গে পরিচয় হয়। স্যার কলেজে সেই বিভাগে অফিস সহকারী পদে মাসিক ৭৫০ টাকা বেতনের চাকরির সুযোগ করে দেন। তবে নিয়মিত ক্লাস করার সুযোগ পেতাম না। সহপাঠীরা যখন ক্লাসে পড়া নিয়ে মগ্ন, তখন আমি কলেজের শিক্ষকদের টেবিল মোছায় ব্যস্ত। তখন বারবার মনে হয়েছিল, আমার বড় হওয়ার স্বপ্নটা কি ভেঙে যাবে? আবার মনকে বোঝাতাম, স্বপ্ন দেখার জন্য, ভাঙার জন্য নয়। পিয়নের কাজ করতাম বলে সহপাঠীরা আমাকে এড়িয়ে চলত। চা আনা, খাওয়ানোসহ অফিস সহকারী হিসেবে সব দায়িত্বই পালন করতাম। কাজ শেষে শিক্ষকদের কাছ থেকে পড়া বুঝে নিতাম। তবে শিক্ষকেরা আমার প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক ছিলেন। এভাবেই উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হই। তারপর এই কলেজেই ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক কোর্সে ভর্তি হলাম। পড়ার কথা ভেবে অসুবিধা হলে চাকরিটা ছেড়ে দিই। খরচ জোগাতে টিউশনি করতে থাকি।’ ২০০৭ সালে ‘বগুড়া সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আসর’ নামে একাই একটি সংগঠন গঠন করেন। একই বছর বিগত কয়েক ব্যাচের মোট ৮৫ জন গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় এ সংগঠন থেকে। পাশাপাশি জেলার কৃতী ও গুণী ব্যক্তিদের সংগঠনের মাধ্যমে সংবর্ধনা দিয়ে থাকে। এসব অনুষ্ঠানে সোহেল রানা চেষ্টা করেন জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দায়িত্বশীল মানুষকে উপস্থিত রাখতে। এতে গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জাগবে, তেমনি নতুন প্রজন্ম গুণী ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানতে পারবে এবং তাদের আদর্শ থেকে ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা পাবে। এর মধ্যে ‘বগুড়া তথ্যকোষ’ নামের একটি বই বের করেছেন। যেখানে বগুড়ার বিভিন্ন গুণী, নামীদামি ব্যক্তিদের এবং দর্শনীয় স্থানের বর্ণনা আছে। এখানে ছাপা হয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে লেখা একটি দুর্লভ চিঠি। যার প্রাপক ছিল এই এলাকার একজন গুণী ব্যক্তি। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাজে লাগে এমন কিছু বই বের করার কাজ করছেন মো. সোহেল রানা। বগুড়া সরকারি আযিযুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক আবদুর রশীদ বলেন, ‘সোহেল রানা ছিল খুবই পরিশ্রমী। নিয়মিত ক্লাসের সুযোগ পেত না। তারপর নিজেকে এগিয়ে নিয়েছে অনেক দূর। সততা তার বড় গুণ ছিল। সত্যি বলতে, সে যখন স্নাতক কোর্সে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হয়, আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আর এগোতে পারবে না। কিন্তু না, সে নিজেকে জয়ী করে দেখিয়েছে। আমি দোয়া করি, সে অনেক বড় হোক।’ সোহেল রানার সম্পর্কে তার বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করছে। জানি না তার প্রতিষ্ঠিত হওয়া দেখে যেতে পারব কি না। আমি সোহেলকে লেখাজোখা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম না করতে বললে, সে বলত, ‘বাবা, একদিন এগুলোই আমাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
