মোবারকের মুক্তি মিসরকে আরো উত্তপ্ত করবে!

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৩, ১৯:২৯
দুই বছরের বেশি সময় বন্দি থাকার পর মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক মুক্তি পেয়েছেন। তবে তিনি দেশ ছেড়ে যেতে পারবেন না। তাকে এখন গৃহবন্দী থাকতে হবে। গত ২১ আগস্ট কায়রোর কারাগারের কাছের সামরিক হাসপাতাল থেকে তাকে হেলিকপ্টারে করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে মিসরের কর্তৃপক্ষ বলছে, সাময়িক মুক্তি পেলেও দুই বছর আগের অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের নিহতের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে আবার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। ২০১১ সালে গণবিক্ষোভের মুখে হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। পরের বছর মিসরের ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ক্ষমতায় আসেন ইসলামপন্থি দল মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত মোহাম্মদ মুরসি। তারপরও চলতে থাকা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে গতমাসের শুরুর দিকে সামরিক অভ্যুত্থানে মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর তার সমর্থকেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়লে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত। মুরসির পতনের দিন থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার লোক নিহত হয়েছে। দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে, চলছে সান্ধ্য আইনও। মিসরের টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে মোবারকের মুক্তিকে এটা তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আসলে মিসরে মোবারকের সমর্থকের সংখ্যা এখনো কম নয়। তাদেরই একটা অংশ গত বুধবার জড়ো হয়েছিলো কারাগারের বাইরে। অনেকেই মনে করে মুবারকের পতনের মধ্যদিয়ে মিসরের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। তাদের অনেকেই সামাজিক নেটওয়ার্কে মোবারকের পক্ষে প্রচারণা শুরু করেছেন। তারা আগামী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে মুবারকের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে ইতিমধ্যে ফেসবুকে প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন। তাই চলমান এই অস্থিরতার মধ্যে মোবারক মুক্তি দেশটির সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। দেশটির আইন বিশেষজ্ঞ নাসের আমিন বলেন, মোবারকের মুক্তি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেবে। এ বিষয়টি ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলকে ইস্যু করার সুযোগ করে দেবে। তারা বলবে, এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় সেনা সরকার আবারো স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে এগোচ্ছে। অনেক সরকারের কর্মকর্তাও একই মনোভাব পোষণ করে। তাদের মতে, মোবারকের মৃত্যু উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালবে। মিসরের সোস্যাল ডেমোক্রাট পার্টির প্রধান মোহাম্মদ এবলঘার বলেন, মোবারকের মুক্তি জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে। কিন্তু এটা তো এখন আদালতের সিদ্ধান্ত। তার শারীরিক অসুস্থতার জন্য কারাগারে না রেখে নিজ বাড়িতে গৃহবন্দী রাখার সিদ্ধান্ত হয়। যদিও গত বছর একটি মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছিলো। অবশ্য মোবারকের মুক্তির বিষয়টি যে সকলের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিলো তা নয়। কারণ অভিযুক্ত কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া মিসরে কিছু আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয় রয়েছে। কারো বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তিন বছরের মধ্যে প্রমাণ করা না গেলে তাকে আটক রাখা যায় না। আইনি কারণেই তিনি মুক্তি পেয়েছেন। তবে হয়তো সেনাবাহিনী মোবারকের জনপ্রিয়তাটাকে তাদের কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। মিসরের রাজনীতি ও জনজীবনে তাদের প্রভাব আরো বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মিসরের বিচার ব্যবস্থা ও পুলিশে এখনো পুরোনো সরকারের অনেক লোক রয়েছে। তারা এখন কিছুটা হলেও ক্ষমতা ভোগ করছে। আর মোবারকের বিষয়ে তাদের আগ্রহ এখনো রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে হঠাত্ মোবারকের মুক্তি পাওয়াতে নানা ভাবনা কাজ করছে কায়রোবাসীদের মনে। এরকম কয়েকজন বিবিসিকে তাদের মনোভাবের কথা জানিয়েছেন। হেবা শরিফ নামে এক নারী কাজ করেন বইয়ের দোকানে। তার মতে, প্রথম বিপ্লব ও গত মাসে মুরসি বিরোধী বিক্ষোভ ও চলমান সংঘাতের কারণে মোবারকের প্রতি মানুষের সমবেদনা দেখা দিচ্ছে। তবে এ বিচারকে তিনি ত্রুটিপূর্ণ মনে করেন। তার মতে, জনগণকে বোঝানো হতে পারে মোবারক কোনো খারাপ লোক ছিলেন না। তার সময়ে মুসলিম ব্রাদারহুডের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। তবে তার মুক্তিতে এমন চিন্তার কারণ নেই যে বিপ্লব ভেস্তে গেছে। বিপ্লবের সময় একটু ভুল ছিলো। কারণ আমাদের সঠিক পথে অগ্রসর হতে একক কোনো নেতৃত্ব ছিল না। আহমেদ নামের এক বিক্রয়কর্মী বলেন, আমি মোবারকের মুক্তি নিয়ে চিন্তিত নই। আমি মনে করি, তার মুক্তির মধ্যদিয়ে বিপ্লবের ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। তবে এজন্য বিচার ব্যবস্থাকে দায়ী করছি না। তারা তো তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করবে। সালাহ নামের রাস্তার পরিষ্কারক বলেন, মোবারকের সময় আমরা এখনের চেয়ে ভালো ছিলাম। এমনকি মুরসির মেয়াদের চেয়েও আমরা ভালো ছিলাম। যদিও বিচার বিভাগের উপর বর্তমান সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এর আরো উন্নতি হবে। সাংবাদিক খালিদ দাউদ বলেন, আমার সন্দেহ মুবারক যুগের অনেক নীতিই আবারো ফিরে আসবে। তার বিরুদ্ধে আনা বেশির ভাগ অভিযোগই দুর্বল। যে কারণে সে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।