উইকিলিক্সের অন্যতম প্রধান সোর্স

ব্র্যাডলি ম্যানিং কি আসলেই দোষী

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৩৩
মাত্র ২৫ বছর বয়সী তরুণ মার্কিন সেনা অফিসার ব্র্যাডলি ম্যানিং। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আদালতের রায়ে তাকে দেয়া হলো ৩৫ বছরের কারাদণ্ড। উইকিলিক্সের কাছে সরকারের গোপন দলিল সরবরাহ করার দায়ে ম্যানিংয়ের এই শাস্তি। প্রধান অভিযোগ গুপ্তচরবৃত্তি। ব্র্যাডলি ম্যানিংয়ের দেয়া তথ্য ফাঁস করে দিয়ে গোটা দুনিয়ায় সাড়া ফেলে উইকিলিক্স আর এর প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় ম্যানিং রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করেছেন। কিন্তু রায় ঘোষণার পর তার আইনজীবীর যে প্রতিক্রিয়া, তা বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। তিনি জানান, ম্যানিংয়ের ঐ কাজ ছিলো ‘দেশপ্রেমের ঊর্ধ্বে’। বোঝাই যায়, সামরিক আদালতের রায় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রেই সেই বিতর্ক চলছে। এরই মধ্যে ম্যানিং পেয়েছেন খোদ যুক্তরাষ্ট্রেরই অসংখ্য সচেতন নাগরিকের ভালবাসা আর সমর্থন। অনেকের কাছেই তিনি বীর, সাহসী যোদ্ধা। ম্যানিংকে ক্ষমা করতে বা তার কারাদণ্ডের মেয়াদ কমাতে এরই মধ্যে তার সমর্থকরা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। গত জুলাইয়ে ম্যানিংকে গুপ্তচরবৃত্তিসহ বিশটি অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। দশ সপ্তাহ ধরে আইনী লড়াই চালিয়ে এবং পাল্টা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেও সেনা আদালতের কাছে পরাজিত হন ম্যানিং। গত বুধবার মাত্র কয়েক মিনিটে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন বিচারক কর্নেল ডেনিস লিন্ড। কিন্তু ম্যানিং বা তার মাতৃতুল্য খালা অলস্টাইন এ সময় ছিলেন নিরাবেগ, নির্বিকার। যেন আগে থেকেই সব জানতেন তারা। আইনী লড়াইয়ে হেরে যাবার লক্ষণ দেখে অশ্রুসিক্ত হন আইনজীবী কুম্বস। কিন্তু ম্যানিং তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘আমি জানি আপনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। আমি ভালো থাকবো’। রায় ঘোষণার পরপরই বিচারকের সতর্কতা অমান্য করে আদালতের পিনপতন নীরবতা ভঙ্গ করেন তার সমর্থকরা। তাদের গায়ে ছিলো কালো টি-শার্ট। তাতে লেখা ‘ট্রুথ’। তারা সমস্বরে চিত্কার করতে থাকেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ব্র্যাডলি, উই লাভ ইউ’, ‘আমরা তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকবো’। কিন্তু গোপন তথ্য যতই সত্য হোক, ভবিষ্যতে আর যাতে কেউ তা ফাঁস করতে সাহস না দেখায়, সেজন্য সামরিক আদালতের কৌঁসুলিরা ম্যানিংয়ের ষাট বছরের কারাদণ্ডের আবেদন চেয়েছিলেন। বিচারক সেখানে তার ৩৫ বছরের সাজা মঞ্জুর করেন। পাশাপাশি তিনি অসম্মানের সাথে ম্যানিংয়ের সামরিক পদ কেড়ে নিয়ে তাকে চাকরিচ্যুত করেন এবং জরিমানা দিতে বাধ্য করেন। তবে ম্যানিংয়ের এই সাজাকে বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ ও কৌশলগত বিজয় বলে আখ্যা দিয়েছে উইকিলিক্স। রায় ঘোষণার পর ঐ দিনই ম্যানিংয়ের একটি বিবৃতি পড়ে শোনান তার আইনজীবী কুম্বস। বিবৃতিতে ম্যানিং তার অপরাধের জন্য অনুতপ্ত না হয়ে বরং আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। যা চিন্তাশীল ও যুক্তিবাদী অনেক মানুষকেই ভাবিয়ে তোলে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক নীতির বহু গোপন বিষয়ের সাথে একমত ছিলেন না ম্যানিং। অনেক ক্ষেত্রেই তিনি মনে করতেন, মার্কিন সেনাবাহিনী ও কূটনৈতিক দফতরের কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী। কিন্তু সভ্যতা আর শক্তিতে দুনিয়ার সেরা জাতিকে ঐ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখবে কার সাধ্য? একজন জুনিয়র সেনা অফিসারের পক্ষে তো তা সম্ভব নয়ই। তবে তার পক্ষে যেটা সম্ভব, ম্যানিং তা-ই করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক নীতি নিয়ে গণবিতর্ক তৈরির চেষ্টা করেছেন ম্যানিং। তার ধারণা, বিতর্কের এক পর্যায়ে হয়তো বা পরিশুদ্ধ হবে সব কিছু। বিবৃতিতে তিনি জানান, ‘যে দেশ বা যে বিশ্বে বাস করছি, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ কারণেই আমি ঐ সব তথ্য ফাঁস করার সিদ্ধান্ত নিই। দেশপ্রেমের ঊর্ধ্বে উঠে অন্য সব মানুষের প্রতি করণীয় দায়িত্ব বোধ থেকেই আমি তা করেছি।’ ক্ষমার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি আমার ক্ষমার অনুরোধ আপনারা না রাখেন, তবে আমি হয়তো আমার দিনগুলো ঠিকই পার করবো এই বিশ্বাসে যে, স্বাধীন সমাজে টিকে থাকতে কোন একসময় আপনাদের চড়া মূল্য দিতে হবে’। তবে ইতোমধ্যেই ম্যানিংয়ের ক্ষমার অনুরোধ নাকচ করে দেয় হোয়াইট হাউজ। ২০১০ সালে ইরাকী যুদ্ধক্ষেত্রের কয়েক লাখ প্রতিবেদন এবং কূটনৈতিক বার্তা উইকিলিক্সের কাছে সরবরাহ করেন ব্র্যাডলি ম্যানিং। সেসময় তিনি ইরাকে কর্মরত ছিলেন একজন জুনিয়র গোয়েন্দা বিশ্লেষক হিসেবে। ম্যানিং ২০০৯ সালে ইরাকে মোতায়েন হলেও শিগগিরই যুদ্ধের ব্যাপারে তার সব ধরনের আগ্রহ অনীহায় রূপান্তরিত হয়। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষক হওয়ায় স্পর্শকাতর সব তথ্য জানার অবাধ সুযোগ ছিলো তার। সব তথ্য সংগ্রহ করে অবাধ তথ্য স্বাধীনতার মুখপাত্র উইকিলিক্সকে সরবরাহ করেন তিনি। আফগান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৭৭ হাজার গোপন নথি প্রকাশ করে উইকিলিক্স। আর ইরাক যুদ্ধ ইস্যুতে ফাঁস হয় চার লাখ দলিল। এর মধ্যে বহু ভিডিও ও তারবার্তাও রয়েছে। ম্যানিংয়ের সরবরাহকৃত এক ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, বাগদাদে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে নিরস্ত্র ১২ জন সাধারণ মানুষ হত্যার দৃশ্য। নিহতদের মধ্যে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানও রয়েছেন। হেলিকপ্টারের ককপিট থেকে তোলা ২০০৭ সালের ঐ ছবি দেখে বোঝাই যায়, হত্যাকাণ্ডটি ঘটে নিছক মজার ছলে। এ সময় হেলিকপ্টারে মার্কিন সেনাদের একে অপরকে পিঠ চাপড়াতেও দেখা যায়। এ ধরনের আরো অনেক গোপন ভিডিও চিত্র, কূটনীতিক ও সেনা অফিসারদের তারবার্তা উইকিলিক্সকে দেয় ম্যানিং। সব মিলিয়ে যে অজানা সত্য বিশ্ববাসী জানতে পেরেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নির্মম, অপ্রত্যাশিত ও রাষ্ট্রদ্রোহী। সাজা ঘোষণার পর ব্র্যাডলি ম্যানিংয়ের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে হঠাত্ই সরব হয়ে ওঠে পশ্চিমা গণমাধ্যম। বিচার চলাকালে মিলিটারি সাইকিয়াট্রিস্ট ম্যানিংয়ের বর্তমান ও অতীত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিভিন্ন বিষয় গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেন। ব্যক্তিগত হলেও গণমাধ্যমে তা বেশ ফলাও করে প্রচার করা হয়। যেমন, ম্যানিং নিজের লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে সন্দিহান ছিলেন, ইত্যাদি চটকদার আরো অনেক কিছু। এ সব কিছু সহ্য করেই কানসাসের মার্কিন সেনা ঘাঁটি ফোর্ট লিভেনওয়ার্থের কারাগারে ৩৫টি বছর হয়তো একাকী কাটাতে হবে ম্যানিংকে। তা সত্ত্বেও সত্য যতই নির্মম হোক, তা সময়ই প্রকাশের জন্য উন্মুখ থাকবে।