সংসদ নেই ১৫ মাস

নেপালের রাজনীতিতে শঙ্কা

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৩৪
রাজতন্ত্র অবসানের পর প্রজাতন্ত্রে রূপ নিয়েছে হিমালয়কন্যা নেপাল; স্বাক্ষরিত এবং কার্যকর হয়েছে শান্তিচুক্তি, তবুও শান্তি আসছে না। পাঁচ মাস ধরে দেশ চলছে অন্তর্বর্তী সরকার দিয়ে। এরই মধ্যে সে সরকার হয়ে পড়েছে বিতর্কিত। দেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় কনস্টিটুয়েন্ট এ্যাসেম্বলি (রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র গঠনকর পরিষদ) নির্বাচনের কথা রয়েছে আগামী ১৯ নভেম্বরে। তারপরেও দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে কি-না সে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ, কয়েকটি রাজনৈতিক দল সে নির্বাচনের হুমকি দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলাবলি শুরু করে দিয়েছেন, নেপালের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর হওয়ার স্বপ্ন হয়ত স্বপ্নই থেকে যাবে; সহসাই দূর হবে না ‘প্রধানমন্ত্রী নাটক’ (ক’দিন পরপরই বদল)। বরং নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। অবস্থা বুঝে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি খিলরাজ রেজমি (Khilraj Regmi) ক্রমাগতই সকল রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি-না, সে সন্দেহ তো আছেই, প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচনী আচরণবিধি মানা না মানা নিয়েও। দ্বিতীয় সিএ (কনস্টিটুয়েন্ট এ্যাসেম্বলি) নির্বাচনকে অবাধ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে গতমাসের ২২ জুলাই দেশের নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী আচরণবিধি জারি করে। কিন্তু অধিকাংশ দলই তার তোয়াক্কা করছে না। নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব থাকলেও নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে কাউকে বাধ্য করতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ, গতমাসের শেষদিকে নেপালের শেষ রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ দেশের পশ্চিমাঞ্চলের বন্যাকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। নেপালের মিডিয়া ধারণা করছে, এতে করে রাজতন্ত্রপন্থী দল হিসেবে পরিচিত আরপিপি-এন আসছে নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা পাবে। এখানেই শেষ নয়, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, বিদেশ সফরে গিয়েও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেস পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা শের বাহাদুর দেউবা সম্প্রতি ভারতীয় সরকারের আমন্ত্রণে সেদেশে যান। সেখানে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনার ফাঁকে তিনি দেশের সর্ব-পশ্চিমে মহাকালি নদীর উপর বানবাসা সেতু তৈরিতে ভারতীয় সরকারের সাহায্য কামনা করেন। উল্লেখ্য, ওখানেই দেউবার নির্বাচনী এলাকা। দেশের সর্ববৃহত্ রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপালও (মাওবাদী) এর ব্যতিক্রম নয়। দলের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্ড সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে জলবিদ্যুত্ প্রকল্পে তাদের সাহায্য কামনা করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউসিপিএন তাদের নির্বাচনী এজেন্ডায় জলবিদ্যুত্ প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে বলেই প্রচন্ডর এই প্রচেষ্টা। বাদ যাচ্ছে না কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল ইউনিফাইড মার্ক্সিস্ট লেলিনিস্টও (সিপিএনইউএমএল)। দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাধব কুমার নেপাল ভারত সফরে গিয়ে কাঠমান্ডু-নিগাধ হাইওয়ে নির্মাণে সাহায্য চান। তার নির্বাচনী এলাকা রাউতাহাত জেলা এই প্রস্তাবিত হাইওয়ের পাশেই অবস্থিত। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনার আয়োধি প্রাসাদ যাদব মন্তব্য করেছেন, ‘আমাদের আদেশ-নির্দেশের পরোয়া করছে না কেউ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসবে, আচরণবিধি তত বেশি লঙ্ঘিত হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখা আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। এ অবস্থায় নির্বাচনকে প্রশ্নমুক্ত রাখা কঠিন হবে।’ তাছাড়া ছোটখাটো কয়েকটি দল ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, তারা শুধু নির্বাচন বর্জনই করবে না, সে নির্বাচনকে পণ্ড করে দেবে যে কোন মূল্যে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ক্ষমতা পেয়ে বলেছিলেন, তিন মাসের মধ্যে তিনি নির্বাচনের আয়োজন করবেন। তাতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। রাজতান্ত্রিক নেপালে সংস্কারের ধারায় বহুদলীয় গণতন্ত্র সূচিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। কিন্তু তাতেই তৃপ্ত ছিল না মাওবাদীরা। রাজতন্ত্র বিলুপ্তির লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে তারা বেছে নিয়েছিল বিদ্রোহের পথ। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার মাধ্যমে নেপালে দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে ২০০৬ সালে। সে সূত্র ধরেই ২০০৮ সালে প্রথম সিএ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে (যদিও তা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট ছিল না) কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছিল ইউসিপিএন (মাওবাদী) এবং প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্ড। আর তার পরপরই রাজার সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নেপালের নতুন নামকরণ হয় ফেডারেল রিপাবলিক অফ নেপাল। ২০০৮ থেকে ২০১১’র সময়ে চারটি কোয়ালিশন সরকার প্রত্যক্ষ করে দেশটি। এর মধ্যে দু’বার সরকার গঠিত হয় ইউসিপিএন-এর নেতৃত্বে আর দু’বার সিপিএনইউএমএলের। ২০১১ সালের আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী হন ইউসিপিএন (মাওবাদী) নেতা বাবুরাম ভট্টরাই। ২০১২ সালের মে মাসে সংবিধানের খসড়া প্রণয়নে ব্যর্থ হওয়া সংসদ ভেঙে দিলেও তিনি তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন। সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল সে বছরেরই আগস্টে। ভট্টরাই নতুন নির্বাচনের আহবান জানিয়েও তারিখ ঘোষণা নিয়ে টালবাহানা শুরু করায় শুরু হয়েছিল আন্দোলন ও ধর্মঘট। শেষমেষ তিনি গত মার্চে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হন। ১৫ মাস ধরে সংসদ অনুপস্থিত নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নেপালে। আগামী সংসদ নির্বাচনের পরেও দেশটিতে একটি স্থিতিশীল সরকার আসবে কি-না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ফের শুরু হতে পারে ভাঙাগড়ার খেলা।