অভিধানের হিসেবে তের থেকে উনিশ অর্থাত্ থার্টিন টু নাইনটিন হচ্ছে টিনএজ। অদ্ভুত এক সময় পর্ব—কখনও প্রজাপতির মতো উড্ডীন, কখনোবা স্বপ্নাহত হয়ে বিষণ্ন প্রহর যাপন। কথা নেই বার্তা নেই উত্কট সব সমস্যা তরুণদের! যা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ারও নয়। তরুণরা কখনও একাকী, কখনও দলবদ্ধ, কখনোবা ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার। এদের জিজ্ঞাসা অনেক। জিজ্ঞাসাগুলো মাঝে মাঝেই মুখথুবড়ে পড়ে। অনেক সময় জিজ্ঞাসাগুলোকে অবান্তর মনে হয়। আসলে কিন্তু অবান্তর নয়। সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখে। উপায় খুঁজে পায় না। সামনে আদর্শের ফোয়ারা। ধরতে গেলে গ্যাস বেলুন হয়ে যায়। বড় বড় বুলি কপচানো মানুষের অভাব নেই। পথ দেখাবার কাণ্ডারি? হায় সে কোথায়! সামনে অন্ধকার। বদলে যাচ্ছে পোশাক-আশাক, পছন্দ-অপছন্দ। এমন অনেক কথা বেরিয়ে আসে প্রজন্মের ভাবনায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর ডিপার্টমেন্টের ছাত্র সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের অনেক কিছুই হয়তো মেনে নেওয়া যায় না। হয়তো সময়টাকে আমাদের অগ্রজরা আমাদের উপযোগী করে ধরে রাখতে পারছে না। তাই আমরা আঁকড়ে ধরেছি পাশ্চাত্যের হালচাল। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। যা আমাদের সমাজ সংস্কৃতি মূল্যবোধ সবকিছুকেই আঘাত করছে। দুই প্রজন্মের মাঝে মানসিক দূরত্বই এর প্রধান কারণ বলে আমার মনে হয়।’ কিন্তু ব্যাংক কর্মকর্তা ইমতিয়াজ করিম তা মানতে নারাজ, তিনি বলেন, ‘শুধু মন নয়, তরুণদের যেকোনো বিষয়েই নাগাল পাওয়া কষ্টকর। ওদের অভাব কোথায়। কোন কোন জিনিস ওরা পাচ্ছে না। কেন পাচ্ছে না। চাওয়া-পাওয়ার হিসেবে গড়মিলটি কোথায়? তারুণ্য আজ নানা কারণে বিপথগামী। দেশে চলছে এখন সাময়িক গ্রহণের কাল। অমিত তারুণ্যের একটা বিশাল অংশ হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বহু বিচিত্র মাদক আসক্তিতে ক্রমাগত ছুটে চলছে ধ্বংসের দিকে। একটা অংশ পেশাদার হয়ে উঠছে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি আর অন্যান্য সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডে। আর এসব কর্মকাণ্ডের জন্যই দেশের এক বিশাল অংশ আজ বিভ্রান্ত তরুণ সম্প্রদায়ের হাতে জিম্মি। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দোষ শুধু এটুকুই তারা সময়ের সাথে অতটা আধুনিক হতে পারেনি।’ স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র রাকিব বলেন, ‘রাজধানী ঢাকার মানিকনগর, খিলগাঁও ও বাসাবো এলাকার লোকজন আজ পরিণত হয়েছে তরুণ ফেনসিডিল ব্যবসায়ীদের হাতের পুতুল। এসব এলাকায় প্রতিদিন দশ লাখ টাকার বেশি মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়। এলাকার মাদক বিক্রেতা এবং ক্রেতা অধিকাংশই তরুণ।’ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, প্রতিমাসে প্রায় সত্তর লাখ বোতল ফেনসিডিল সীমান্ত পেরিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। যার মূল্য প্রায় ৮শ কোটি টাকা। দেশের সংবাদ মাধ্যমের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাদকাসক্তের সংখ্যা ১.২ মিলিয়ন। এদের শতকরা সত্তর ভাগই তরুণ। পেশার দিক থেকে অর্ধেকের বেশি বেকার। এসব মাদকাসক্তরা বেশিরভাগ ফেনসিডিল আসক্ত। এক্ষেত্রে প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতাও অনেকাংশে দায়ী। সিরামিক্স ব্যবসায়ী মো. এনায়েতউল্লাহ বলেন, ‘ইদানীং একটি অদ্ভুত প্রবণতা খেয়াল করি এক শ্রেণীর অভিভাবকদের মধ্যে। তারা তাদের ইংরেজি মিডিয়াম পড়া ছেলে বা মেয়েটি যে বাংলায় কথা বলতে পারে না, বা বললেও তা অনেক কষ্ট করে বলতে পারছে এটা অন্যের সামনে জাহির করে একরকম আনন্দ পান। এদের একটি প্রজন্ম একুশে ফেব্রয়ারি কি জানে না, স্বাধীনতা দিবসের সাথে গুলিয়ে ফেলে। এগুলো এদের কাছে ‘পাবলিক হলিডে’ ছাড়া কিছু না। একটুও বাড়িয়ে বলছি না। আমাদের কিছু অতি সচেতন, অতি আধুনিক মা-বাবাই গড়ে তুলছেন এই হাইব্রিড প্রজন্ম। এরা এদেশে থাকলেও এদেশের সাধারণ মানুষের দিকে অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকায়। নদী, পানি, কাদামাটি, গ্রাম, কৃষক, চাষি, শ্রমিক প্রভৃতি শব্দগুলো এদের কাছে সেকেলে, আনস্মার্ট ও ক্ষেতের পরিচয় বহন করে।’ প্রাক্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাদেক খন্দকার বলেন, ‘আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে ও এমন কিছু হাইব্রিড প্রজন্ম পেয়েছি যাদের কাছে গ্রাম, কৃষি শব্দগুলো আনস্মার্ট ও ঘৃণিত। চাষা বলে গালি দেওয়াতে তারা যেন একরকম বিকৃত আনন্দ পায়। দেশের মাটি, সবুজ আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, ছবির মতো আঁকাবাঁকা নদী এদের কাছে ‘উফ্ফ’। যেন এখানে তাদের খুব কষ্ট করে থাকতে হচ্ছে। বিদেশের মাটিতে গেলেই তাদের শেকড় গজাবে। যেন তারা ভুল করে জন্মেছে এই দেশে। ঐশি এখানে কিছুটা চোখ খুলে দিল। তবে সবচেয়ে বেশি অবাক হচ্ছি আমাদের সমাজের চোখে এই হাইব্রিড ঐশিদেরকেই তথাকথিত স্মার্টনেসের প্রতীক মনে করা হয়। বিষয়টা যেন এমন যে কম বা ছোট কাপড় পরা, মাদক/ইয়াবা/গাঁজা প্রভৃতি সেবন করা, ডিজে পার্টি বা বারে নিয়মিত যাওয়া, ডেন্স ক্লাবে যাওয়া আর প্রতিদিন নতুন নতুন ছেলে বন্ধু বা মেয়ে বন্ধুদের নিয়ে মজা করা প্রভৃতি ছাড়া স্মার্ট, কালচারড হওয়া যায় না। যারা এগুলো করে না তারা, আনস্মার্ট আর গাধা প্রকৃতির। সমাজের মাথায় যে পচন এই হাইব্রিড প্রজন্ম ধরিয়েছে সমাজ ও সেটার প্রতিবাদ করছে না। বা করলেও তা ধোপে টিকছে না।’ সংগীতশিক্ষক অনন্যা চক্রবর্তী মিতুল বলেন, ‘নৃ-বিজ্ঞানী রুথ বেনডিক্ট ও মার্গারেট মডিরে র্দীঘ সময়ের গবষেণা শেষে তারা এই তাত্ত্বিক অবস্থানে আসনে যে, মানুষরে ব্যক্তিত্ব তথা আচরণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত।’ তবে, ঐশির ঘটনার পেছনে আমাদের হাইব্রিড সংস্কৃতির নানা অনাকাঙ্ক্ষিত পরির্বতন আর তার সাথে তাল মিলিয়ে চলার প্রচেষ্টা ও তার প্রভাবও দায়ী। মেয়েটির মাঝে বাবা-মাকে হত্যা করার মতো এই ভয়ংকর পৈশাচিক নিষ্ঠুর মানসকিতা একদিনে তৈরি হয়নি। তার মানে ব্যাপারটা কেবল একজনের ব্যক্তিগত মানসিক বৈকল্যেরে নয়। বরং এটা একটা সামষ্টিক চিন্তা। এক ধরনের সামষ্টিক নৈতিক স্খলন।
ব্যাপারটি আপাতভাবে মনে হলেও এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি হাইব্রিড তরুণ প্রজন্মের বিকৃত মনমানসিকতার পরিচয় বহন করছে, যা আমাদের তরুণ প্রজন্ম, সংস্কৃতির প্রতি অশনিসংকেত। তাই ঐশীর শাস্তির পরিমাণ কোনো সমাধান নয়। বরং সচেতন হতে হবে আমাদেরই। ভাবতে হবে এই নতুন সমস্যা নিয়ে। সমস্যার মূল থেকে শোধরাতে হবে। আর তথাকথিক প্রতিষ্ঠিত স্মার্টনেস ধারণার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে সবাই মিলে, এখনই।
