প্রজন্ম প্রত্যাশা

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৩, ২০:২১
বাড়ছে জনবসতি, বাড়ছে যানজট; তাই জনগণের অবস্থার উন্নয়ন এবং তাদের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলাই নগর পরিকল্পনাবিদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। প্রতিদিনই গ্রাম ছেড়ে অনেক মানুষ অভিবাসিত হয়ে চলে আসছে নগরে অর্থনৈতিক এবং শহরের আকর্ষণে; ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নাগরিক সমস্যা। যাতে জনগণ সুষ্ঠুভাবে বসবাস করতে পারে, যাতে নগর ও গ্রামে জনগণের সুযোগ-সুবিধা, বিনোদনসহ সব ধরনের সুবিধা প্রদান পরিকল্পিত উপায়ে করা যায় সেই কাজটিই সম্পাদন করেন একজন নগর পরিকল্পনাবিদ। এমনই কয়েকজন মেধাবী নগর পরিকল্পনাবিদ আমাদের জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনা নিয়ে তাদের প্রত্যাশার কথা। ‘প্রতি ইঞ্চি ভূমি যৌক্তিক ও অর্থপূর্ণভাবে ব্যবহূত হবে’ ড. মো. আকতার মাহমুদ ক্যাডেট কলেজ থেকে পাস করে বুয়েটের আর্কিটেকচারে চান্স পেয়েছিলেন, কিন্তু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা’ নামের একটি নতুন বিষয়ে পড়তে চলে গেলেন। ১৯৯৬ সালে নগর পরিকল্পনায় স্নাতক পাস করেই চাকরি পেয়ে গেলেন বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্পে। কাজটিতে তার মন ভরল না। যোগদান করলেন খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে। ২০০০ সালে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনাবিদের পদ ছেড়ে যোগদান করলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ভবিষ্যতের জন্য কতটুকু ঝুঁকি নিয়ে আসবে এবং বর্তমানে আমরা কতটা ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছি—এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মো. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ন অসংবেদনশীল-অমানবিক সমাজ তৈরি করে, যা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ। অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলাভূমি, উন্মুক্ত স্থান, খেলাধুলার মাঠ, পার্ক হারিয়ে যায়। শিশু-বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ চারদেয়ালের মাঝে বন্দী হয়ে পড়ে। খোলা আকাশ দেখার সুযোগ পায় না। মানুষের মাঝে মানবিক দিকগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে। এতে সামাজিক অপরাধসমূহ বাড়তে থাকে।’ ড. মো. আকতার মাহমুদের ভবিষ্যত্ স্বপ্ন, ‘এ জনবহুল দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমি যৌক্তিক ও অর্থপূর্ণভাবে ব্যবহূত হবে—এই আমার স্বপ্ন। তবে এরজন্য দরকার সমগ্র দেশের একটি মাস্টার প্ল্যান বা ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা। এ দেশের পাঁচ শতাধিক নগরকেন্দ্রসমূহের সুন্দর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে পারলে যেমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে তেমনি মূল্যবান কৃষি জমি রক্ষা করা যাবে। এমন শহরের স্বপ্ন দেখি যেখানে শিশু-বৃদ্ধ, ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারবে।’ ড. মো. আকতার মাহমুদ সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। === ‘দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ না জন্মালে এ ধরনের কাজে আগ্রহ জন্মায় না’ স্বপ্ন ছিল দেশের প্রকৌশল শিক্ষার শীর্ষ বিদ্যাপীঠ বুয়েটে পড়াশোনা করার। ছোট্ট সেই মেয়েটি কি জানত, শুধু বুয়েটে পড়াশোনাই নয়, শিক্ষকতা করার সুযোগও তার জন্য অপেক্ষা করছিল! সেই মেয়েটি এখন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের প্রভাষক নায়লা শারমিন। প্রজন্মের এই নগর পরিকল্পনাবিদ নগরকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য অনেকগুলো বিষয়ে জোর দেন, আর এগুলোর সঠিক সমন্বয় করতে পারাটাই একজন পরিকল্পনাবিদের সফলতা বলে মনে করেন। যেমন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বাসস্থানের মান উন্নয়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থা, নির্মাণ বিধিমালা—সবকিছুর সমান গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের অপরিকল্পিত নগরায়ন নিয়ে জানতে চাইলে নায়লা বলেন, ‘আমরা এখন অনেক ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছি। সঠিক পদক্ষেপ আর পূর্ব প্রস্তুতি না থাকলে ভবিষ্যতে ক্ষতির মাত্রা অনেক ভয়াবহ হতে পারে।’ একটি গবেষণাসূত্র উল্লেখ করে নায়লা জানালেন, সাধারণ ভূমিকম্পে ঢাকা শহরের ৭০ হাজার ভবন ধসে পড়বে, যার ভয়াবহতা অনুধাবন করার মতো শক্তিও আমাদের নেই, নেই কোনো সঠিক প্রস্তুতি। নতুন প্রজন্মকে নগর পরিকল্পনাতে নতুন নতুন চিন্তাভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রজন্মের প্রতিনিধি নায়লা শারমিন। তাদের কাজের মাঝে অনেক দায়িত্ববোধের ছাপ খুঁজে পান তিনি। তিনি মনে করেন, নতুন প্রজন্ম স্বপ্ন দেখতে জানে, তার চেয়ে বড় বিষয়, তারা দেশকে অনেক ভালোবাসে। দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ না জন্মালে এ ধরনের কাজে আগ্রহ জন্মায় না। তবে তাদের মাঝে কিছুটা অস্থিরতা আছে বলে মনে করেন নায়লা। এ সাময়িক দোষটি কাটিয়ে উঠতে পারলে তাদের কাজ দেশের জন্য আরও মান বয়ে আনবে বলে তার বিশ্বাস। নায়লা শারমিন প্রভাষক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় === ‘আধুনিক প্রয়োজনীয় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশই গড়ে তোলা’ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে ১৯৯৮ সালের আগস্ট মাসে বিইউআরপি (ব্যাচেলর অব আরবান অ্যান্ড রুরাল প্ল্যানিং) পাস করার সাথে সাথেই খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চলমান খুলনা শহরের মাস্টার প্ল্যান (মহাপরিকল্পনা) প্রণয়ন প্রকল্পে নিয়োজিত কনসালটিং ফার্ম একুয়া-শেলটেক কনসোর্টিয়ামে আরবান প্ল্যানার হিসেবে কাজ শুরু করেন তুষার কান্তি রায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি পরিকল্পনা ও গবেষণাধর্মী প্রকল্প, সুশীলন নামে একটি জাতীয় বেসরকারি সংস্থা এবং খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে সহকারী টাউন প্ল্যানার হিসেবে ৫ বছরসহ মোট প্রায় ১২ বছর চাকরি করেছেন। একজন নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তুষার কান্তি রায় বলেন, ‘একজন নগর পরিকল্পনাবিদ হয়ে আমি গর্বিত। বাংলাদেশের অধিক জনসংখ্যার জন্য এর স্বল্প ভূমি সম্পদের পরিকল্পিত, যথোপযুক্ত এবং সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নগর পরিকল্পনাবিদগণের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খুলনা শহরের পরিকল্পিত উন্নয়নে আমি পরিকল্পনা প্রণয়ন, গবেষণা এবং বাস্তব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে খুবই গর্বিত বোধ করি। পাশাপাশি, বর্তমানে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে বইয়ের জ্ঞান এবং বাস্তব জ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে পাঠদান করতে আমি খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। শহরের সমস্যাবলি চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলো সমাধানের জন্য আমি ইতিমধ্যে বেশ কিছু গবেষণা সম্পাদন করেছি। আর এসবই সম্ভব হয়েছে স্বাচ্ছন্দ্যবোধের কারণে।’ এরপর তার ভবিষত্ পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আধুনিক প্রয়োজনীয় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত দেশের পরিকল্পিত নগরায়ন, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত এবং সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশই গড়ে তোলাই আমার ভবিষত্ স্বপ্ন। শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আমি নিজেকে সর্বদা নিয়োজিত রাখতে চাই।’ তুষার কান্তি রায় সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, খুলনা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি