একটি জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদপত্রে মাঝে মধ্যে লিখে থাকি। ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এ ধরনের সংবাদপত্র। এর পাঠক ছড়িয়ে আছে দেশ-বিদেশে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, বিশেষত তরুণদের কাছে দ্রুত পৌঁছার এটা একটা সহজ মাধ্যম। এতে লিখব না কেন? লিখতে আরও ভালো লাগে এজন্য যে, নিবন্ধের শেষে পাঠক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। কখনো কখনো তারা আবার নিজেদের মধ্যে মেতে ওঠেন বিতর্কে। সুস্থ-সুন্দর বিতর্ক দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। তবে প্রায়ই দেখা যায়, পাঠকরা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন ক্ষুব্ধ হয়ে। ক্ষুব্ধ হওয়াটা দোষের নয়। ক্ষোভের কারণ থাকা সত্ত্বেও কেউ ক্ষুব্ধ না হলে সেটিকে বরং বলতে হবে অস্বাভাবিক। প্রশ্ন সেটা নয়। প্রশ্ন হলো— ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাব কীভাবে? যুক্তিপূর্ণভাবে লিখব কিনা আর তার ভাষা কী হবে?
অনলাইন সংবাদপত্রগুলো অবশ্য সব প্রতিক্রিয়া তুলে দেয় না। বক্তব্য ঠিক রেখে ‘এডিট’ করেও আপলোড করা হয়। প্রিন্ট মিডিয়ার কর্মীরাও করে থাকেন এটি। অবশ্য অভিযোগ আছে, ‘এডিট’ করতে গিয়ে পাঠকের মূল বক্তব্য বিকৃত করে ছাপা হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। কারও মত বিকৃত করাটা এক ধরনের অপরাধ বটে। তার চেয়ে বরং ভালো সেটি প্রকাশ না করা। মোবাইল ফোন যখন হাতে হাতে, ইন্টারনেট সুবিধাও বেড়ে চলেছে; তখন পাঠককে কিন্তু জানিয়েও দেয়া যায়— কেন তার প্রতিক্রিয়াটি ছাপা বা আপলোড করা গেল না। এতে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবারও সুযোগ পাবেন তারা। যে সংবাদপত্রে এ লেখকের চাকরি জীবনের শুরু, সেখানে পাঠকের চিঠি দেখে ছাপতেন প্রয়াত সন্তোষ গুপ্ত। যেসব চিঠি প্রকাশ করতে পারতেন না, দারুণ ধৈর্যের সঙ্গে তিনি সেগুলোর জবাব দিতেন খোদ পত্রিকায়। কিছুদিন আগে প্রয়াত হলেন আতাউস সামাদ। মাঝে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হতো তার সম্পাদনায়। এতে যাদের চিঠি ছাপতে পারলেন না— ‘আপনাদের চিঠি পেয়েছি’ বলে তাদের নামধাম ছেপে দিতেন সামাদ ভাই। অধুনালুপ্ত একটি বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিকের সম্পাদক তো পোস্ট কার্ডে পাঠকের সঙ্গে রাখতেন জীবন্ত যোগাযোগ। পোস্ট কার্ডের দিন অবশ্য গত হয়েছে। এতে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটা কিন্তু সহজ হয়েছে আরও।
প্রায় দেড় যুগ সংবাদপত্রে কাজ করার দাবিতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ রাখব, শুধু নিবন্ধ নয়— যে কোনো বিষয়ে পাঠকের মত নিন যত বেশি সম্ভব। ছাপা বা আপলোডের মতো হলে সেটি অবশ্যই করুন এবং করুন দায়িত্বশীলভাবে। অনেক সংবাদপত্রে লক্ষ্য করছি, পাঠকদের জন্য জায়গা কমে এসেছে যেন। নাকি পাঠকরা আজকাল কম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন? গত এক-দেড় দশকের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন তাদের ব্যস্ত করে ফেলেছে বৈকি। এক মোবাইল ফোনই তো কত ব্যস্ত করে ফেলল আমাদের! দেশ-বিদেশের কত টিভি চ্যানেল আর তাতে কত নিউজ, প্রোগ্রাম আর টক শো। সেখানেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বোদ্ধা দর্শক-শ্রোতারা এর সুযোগ নিচ্ছেন কমই। অনলাইনে অবশ্য দেখছি মতামত প্রকাশে কার্পণ্য কম; উত্সাহ বরং বেশি। তরুণদের অংশগ্রহণ সেখানে বেশি বলেই মনে হয়। তাতে চঞ্চলতা হয়তো আছে; মেধার স্বাক্ষরও রয়েছে। কোনো কোনো অনলাইন সংবাদপত্রের নিউজেও প্রচুর মন্তব্য করেন পাঠকরা। এতে জনমতের অন্তত একাংশের একটা প্রতিফলন ঘটে। সে সব পড়েন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী দেশ-বিদেশের বহু লোক। এ থেকে তারাও নতুন করে চিন্তা-ভাবনার সুযোগ হয়তো পান। এ সব কিছুই ঠিক আছে। প্রশ্ন শুধু এক জায়গায়— যে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি, তা যুক্তিপূর্ণ কিনা আর কোন ভাষায় লিখছি। আরেকটি প্রশ্ন অবশ্য আছে— যুক্তিপূর্ণ ও রুচিশীলভাবে লিখিত সব মতামত আমরা, সংবাদপত্র তথা মিডিয়ায় কর্মরতরা প্রকাশ করছি কিনা বা করতে কতটা প্রস্তুত।
যুক্তিহীন ও অমার্জিতভাবে লেখা প্রতিক্রিয়া তো নয়ই, নিবন্ধও প্রকাশ বা আপলোড করা উচিত নয়। সভ্য সমাজে যুক্তি ও রুচিহীনভাবে কথা বলাকে আমরা নিরুত্সাহিত করি এমনকি আড্ডায়। কাজের কথাও অনেকে বলেন বা লিখেন অমার্জিতভাবে। এটা দেখে বেশি খারাপ লাগে। অনেকের লেখায় থাকে দারুণ পর্যবেক্ষণ; কিন্তু তার স্টাইল হয়তো ভালো নয় বা গদ্য দুর্বল। এটাও দুর্ভাগ্যজনক। একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকের অনলাইনে অনেক পাঠকের মন্তব্য পড়তে-পড়তে এসব বেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করেছি। দায়িত্বপূর্ণ আর বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্যও চোখে পড়ে অনেকের। কারও কারও প্রতিক্রিয়ায় থাকে দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে দুর্ভাবনা। দুর্ভাগা এ দেশের অসহায় নাগরিক তারা। কখনো কখনো মনে হয়, কিছু লোক দল বেঁধে কোনো বিষয়ে একই রকম মন্তব্য করছে। অনেকে ব্যবহার করেন ভুয়া ইমেইল অ্যাড্রেস ও ছদ্মনাম। এগুলো নিরুত্সাহিত করা নাকি কঠিন নয়। প্রিন্ট মিডিয়ায়ও এর চর্চা রয়েছে। কে যে কার নামে চিঠি বা প্রতিক্রিয়া লিখছে, বলা মুশকিল। মাঝে মধ্যে এমন বক্তব্য ছাপতে হয় যে, ‘অমুক নামে প্রকাশিত চিঠিটি আমার নয়’। পরিস্থিতির চাপে পড়েও অনেকে জেনুইন চিঠি প্রত্যাহার করেন। কর্মরত সাংবাদিকরা এসব জানি। অনলাইনেও এমনটি ঘটলে অবাক হওয়া যাবে না। একজন অন্য কারও, বিশেষত পরিচিত কারও নামে কোথাও হয়তো জুড়ে দিলেন উদ্ভট মন্তব্য। মডারেটর সতর্ক হলেও এ ক্ষেত্রে কতটা কী করতে পারবেন, কে জানে। তবে তার সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। অসতর্কভাবে কিছু আপলোড হয়ে গেলে অবশ্য সুযোগ রয়েছে দ্রুত সেটি সরিয়ে ফেলার। ম্যাটার ছাপাখানায় চলে গেলে প্রিন্ট মিডিয়ায় কিন্তু সে সুযোগ নেই। পরদিন ত্রুটি স্বীকার করে ছাপতে হবে সংশোধনী। এ ক্ষেত্রে নিউজ বা নিবন্ধ প্রত্যাহারের ঘটনাও রয়েছে; আছে সম্পাদকীয় পুনর্লিখনের দৃষ্টান্ত। এসবের বেলায় হয়তো রয়েছে কাজের চাপ, বিভ্রান্তি, অদক্ষতা বা পত্রিকার ‘পলিসি’ বুঝে না ওঠার প্রতিফলন; কিন্তু এর পরে যেটি করা হয়, তাতে থাকে স্বচ্ছতা। মিডিয়া স্বচ্ছ না হলে তার গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। আর অগ্রহণযোগ্য মিডিয়ার থাকে না কোনো প্রভাব।
আমরা যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে লেখালেখি করছি, তাদের বেলায়ও এগুলো কমবেশি প্রযোজ্য। লেখক মাত্রেরই পক্ষপাত থাকবে; কিন্তু সেটি যুক্তিপূর্ণভাবে প্রকাশ করছি কিনা এবং প্রকাশভঙ্গিটি রুচিসম্মত কিনা—নিজেকে এ প্রশ্ন যেন করি বারবার। টক শোয় যারা অংশ নিচ্ছি, তাদের সবাই তো আর রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর সদস্য নই। কিন্তু সদস্য না হয়েও অনেকে দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করছি কিনা, এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় টিভি চ্যানেলে এমন কয়েকটি টক শোর কথা তো আমাদের জানা, যেখানে মারামারির উপক্রম হয়েছিল। তার আগে ঘটেছে পরস্পরকে হুমকি প্রদান ও গালাগাল! এটি যে কেবল রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মধ্যে হয়েছে, তা নয়। দুই দল বা গোষ্ঠীর অঘোষিত মুখপাত্র হয়ে যারা এসেছিলেন, তাদের মধ্যেও ঘটেছে এটি। সংবাদপত্রে মারামারির উপক্রম হওয়ার সুযোগ অবশ্য নেই। তবে সুযোগ রয়েছে অন্যায়ভাবে লেখার। প্রভাবশালীরা সেটি করে থাকলে তা রোধ করা কঠিন বৈকি। তাদের বক্তব্যের ওপর প্রতিক্রিয়া ছাপানোও কষ্টকর হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে, এটি তারা করছেন বা করতে পারছেন কিনা। রাজনীতির মতোই মিডিয়াকে দূষণমুক্ত রাখাটা কঠিন। রাজনীতি দূষিত হয়ে পড়ায় আবার মিডিয়ার প্রতি প্রত্যাশা বাড়ছে। মিডিয়ায় কর্মরত ও সক্রিয়দের ‘নিরপেক্ষতা’ আরও বেশি করে দেখতে চাইছে মানুষ। নিরপেক্ষতা মানে মতনিরপেক্ষতা নয়; দল ও গোষ্ঠীনিরপেক্ষতা। ন্যূনতম এ প্রত্যাশা রয়েছে যে, দল বা গোষ্ঠীর প্রতি কিছুটা পক্ষপাত থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি যেন না হারান যুক্তিবোধ ও পরিমার্জিত ভঙ্গি। রাজনীতিকদের কাছে এটি প্রত্যাশা করে বোধহয় লাভ নেই। মন্দের অনুশীলন ও প্রতিযোগিতা যেখানে প্রধান বিষয়, সেখানে ওসব প্রত্যাশা করা যায় না। সন্দেহ কী, এর একটা প্রভাব পড়ছে মিডিয়ায়। এর প্রভাব পড়ছে লেখক-বুদ্ধিজীবী; সেই সঙ্গে পাঠকদের ওপর। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোয়ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ে বিভক্তি রয়েছে। সেটি দলের নয়—মতের। স্বভাবতই একাধিক মতধারায় বিভক্ত তারা। সেখানে যুক্তিপূর্ণ ও রুচিশীলভাবে মত ব্যক্ত করছেন রক্ষণশীল বুদ্ধিজীবীরাও। কেউ কাউকে গালমন্দ তো করছেন না।
কিছুটা বিক্ষিপ্তভাবে হয়তো— এত কথার অবতারণা করলাম এজন্যও যে, একটি অনলাইন সংবাদপত্রে মানবাধিকার ইস্যুতে লেখা নিবন্ধের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে এক পাঠক আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, এত ‘কসরত্’ করার কী দরকার ছিল; অমুকের মতো লিখলেই তো পারতেন! আমার নিবন্ধের আগে ওখানে আপলোড করা হয়েছিল দেশের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখকের নিবন্ধ, যেটি একই বিষয়ে লেখা। পাঠকের বক্তব্য হলো, কেন তার মতো করে (সম্ভবত সরাসরিভাবে) লিখলাম না! তার ও তাদের উদ্দেশে সবিনয়ে বলি, আমি তো আমার মতোই লিখব। কারও মতো করে লিখতে হলে লেখালেখি ছেড়ে দেয়াটাই সঙ্গত। আরেক পাঠক মন্তব্য করেছেন— আপনি যে কোন পক্ষের, তা বুঝতে পারলাম না! পরমুহূর্তেই আমার নিবন্ধের মাঝখান থেকে একটিমাত্র বাক্য তুলে দিয়ে বললেন— বুঝেছি, আপনি দলকানা! ‘দলকানা’ না হলেও একদল লোক যেন ওটা বানিয়ে ছাড়বে। হেনরিক ইবসেনের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত সত্যজিত্ রায়ের ‘গণশত্রু’ ছায়াছবিতে পৌর চেয়ারম্যান নিশিথের একটা প্রশ্ন ছিল তার বড় ভাই ডাক্তার অশোক গুপ্তের হবু জামাইয়ের উদ্দেশে। সেটি হলো, ‘কোন্ দিকে হাঁটেন— ডানে না বাঁয়ে?’ মোটা দাগে এ বিভাজনও মনে হয় মন্দ ছিল না। পরিবর্তিত সময়ে, এ দেশে আমরা পড়ে গেছি আওয়ামী লীগ-বিএনপি বিভাজনে। এদের মধ্যে নীতি-আদর্শের তফাত্ কতটা, সে প্রশ্ন না তুলে একশ্রেণির লোক শুধু জানতে চাইছে— আপনি কোন্ দিকের? আপনার লেখা পড়ে তো ঠিক বোঝা যায় না! লিখতে পারেন না অমুক দলের মাথায় একটা বাড়ি দিয়ে?
মাথায় বাড়ি না দিয়ে মাথা খোলার অর্থাত্ দৃষ্টি উন্মোচন ও শুভবুদ্ধি জাগানোর জন্যও যে লেখা যায়, লেখা উচিত— এমনটি যারা মনে করেন, তারা একটু সোচ্চার হোন। টিভি ও রেডিওর লাইভ অনুষ্ঠানে ফোন করুন বেশি করে; যুত্সই প্রশ্ন করুন যারা দেশের স্বার্থ ফেলে শুধু দল ও গোষ্ঠীর স্বার্থ দেখছেন— তাদের। প্রিন্ট ও অনলাইন সংবাদপত্রে দেশটির ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে জানান যুক্তিপূর্ণ ও রুচিসম্মত প্রতিক্রিয়া। সব দেখে-শুনে আপনাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে ভাবার সাহস পাচ্ছি না; তবে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারলে দেখবেন, আপনারা একটা শক্তি। মিডিয়া আপনাদের গুরুত্ব দেবে বৈকি। রাজনীতিকরাও আপনাদের কথা শুনতে বাধ্য হবেন। এ দেশে দল ও গোষ্ঠীবাজি তত কমবে, যত বৃহত্ আর সোচ্চার হয়ে উঠবে যুক্তিবোধসম্পন্ন ও মার্জিত রুচির জনগোষ্ঠী। এছাড়া গণতন্ত্রও সংহত হবে না।
লেখক : সাংবাদিক
[email protected]
