সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই!

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৩, ২২:৫৫
কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকারের আমলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই। বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ঘোষণা দিয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে তারা এ সংক্রান্ত বিল পার্লামেন্টে উত্থাপন ও পাস হতে দেবে না। একই কথা জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস। ভারতের অভ্যন্তরীণ এই রাজনৈতিক বিরোধে তাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে এ চুক্তি বাস্তবায়নের আর আশা নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে স্থল সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে ভারত বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করলেও কংগ্রেস সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ২০ আগস্ট সীমান্ত চুক্তি অনুমোদনে সংবিধান সংশোধন বিল রাজ্যসভায় পেশ করার তৃতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। এবার বিজেপি নয় তৃণমূল কংগ্রেস ও আসাম গণপরিষদের বিরোধিতার মুখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ বিল উত্থাপনে ব্যর্থ হন। তিনি এসব দলের সঙ্গে আলোচনার পর চলতি সপ্তাহেই আবারো বিলটি উত্থাপনের চেষ্টা করবেন বলে জানান। কিন্তু গত শনিবার লোকসভায় সাংবাদিক সম্মেলন করে বিজেপি নেত্রী সুষমা স্বরাজ জানিয়েছেন, সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন বিলটি কোনোভাবেই তারা রাজ্যসভায় পেশ ও পাস হতে দেবেন না। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে এ বিষয়ে জানিয়ে দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার দাবি সরকার অত্যন্ত হালকাভাবে এ চুক্তি করেছে। এ চুক্তির কারণে কোনোভাবেই ১০ হাজার একর জমি হাতছাড়া হতে দেয়া হবে না। যদিও এ বিল অনুমোদনে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা হিসেবে বিজেপি নেতা অরুণ জেটলির সঙ্গে গত মাসে নয়াদিল্লিতে সাক্ষাত্ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ঐ সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষর এবং সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিজেপির প্রকাশ্যে ঘোষণার একদিন পর গতকাল রবিবার সীমান্ত চুক্তিতে বিরোধিতার কথা জানালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। নিজের ফেসবুকে এক পোস্টে মমতা লিখেছেন, সীমান্ত চুক্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রীর (সাবেক ও বর্তমান) সঙ্গে গত দুই বছরে বহুবার কথা বলেছে। আমরা বলেছি যাদের জমি হস্তান্তর করা হচ্ছে, তাদের মতামত নেয়া দরকার। কিন্তু রাজ্যকে অন্ধকারে রেখে, বাসিন্দাদের মতামত ছাড়াই জমি বিনিময় করতে সরকার অগ্রসর হচ্ছে। মমতার অভিযোগ, তিস্তা চুক্তির সময়ও চুক্তির খসড়া নিয়ে রাজ্যকে এক রকম বলেছিল দিল্লি, পরে চূড়ান্ত হওয়ার পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। এ জন্যই প্রথমে এগিয়েও পরে তিস্তা চুক্তি থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন তিনি। বার বার বিল উত্থাপনে ভারতের বিরোধী দলগুলোর বিরোধিতার বিষয়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান বলেন, ভারতের সঙ্গে ভূমি নিয়ে চুক্তি করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ছোট ছোট দলের বাধার কারণে তারা একটি বিল সংসদে তুলতে পারে না, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কংগ্রেস সরকারের আন্তরিকতা থাকলে সবার সঙ্গে আগে থেকেই আলোচনা করে একটা সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ। কিন্তু তিনি সে চেষ্টাই করেননি। কংগ্রেস আসলে এসব করে সময়ক্ষেপণ করছে। তিনি মনে করেন, কংগ্রেস সরকার আর এ বিলটি রাজ্যসভায় তুলতে পারবে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, উচ্চ পর্যায়ে এমনিতেই কঠিন মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে। পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে খুব একটা মনোযোগ দেয়ার সুযোগ নেই মনমোহন সিংহের সরকারের। তিনি বলেন, আগামী বছর ভারতের পার্লামেন্ট নির্বাচন। বিজেপি ও তৃণমূল চাইবে এ বিষয়টি ভোটের ইস্যু করতে। আগামীতে সরকারের পরিবর্তন হলে হয়তো তারাও নতুন করে চুক্তি করতে চাইবে। আসলে পানি, ভূমি কোন কিছুই সঠিকভাবে ভারতের কাছ থেকে বুঝে পাওয়া সত্যিই কঠিন। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে তিস্তার পানি চুক্তি ও সীমান্ত চুক্তি খুবই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ভারতের মতো মিত্রের কাছ থেকে নির্বাচনের আগে এ ধরনের সহযোগিতা না পেয়ে শেখ হাসিনার সরকার অনেকটাই হতাশ। উল্লেখ্য, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থলসীমান্ত চুক্তি এবং ২০১১ সালে সই হওয়া এ সংক্রান্ত প্রটোকল বাস্তবায়নে ভারতের সংবিধান সংশোধন করতে হবে। কোনো বিল পাস করতে হলে ভারতীয় পার্লামেন্টের উভয়কক্ষ লোকসভা ও রাজ্যসভায় অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন দরকার। যা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকারের নেই। স্থলসীমান্ত চুক্তি ও প্রটোকলের আওতায় ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের মোট সাত হাজার ১১০ একর আয়তনের ৫১টি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের মোট ১৭ হাজার ১৬০ একর আয়তনের ১১১টি ছিটমহল বিনিময়ের কথা রয়েছে। ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সে সফরে ঢাকায় স্থলসীমান্ত চুক্তির প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়, ওই সময়ই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হওয়ার কথা ছিল দুই দেশের মধ্যে। সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হলেও শেষ মুহূর্তে চুক্তি আটকে যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতার কারণে।