মূল ফিচার

সুদৃঢ় হোক পারিবারিক বন্ধন

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৩৬
যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে পড়েছে এবং বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্ষেত্রে মা-বাবা দুজনই চাকরিজীবী, সে ক্ষেত্রে তাদের কর্মক্ষেত্র থেকেই মাঝেমধ্যে ছেলেমেয়েদের খোঁজখবর নেন। বন্ধুবান্ধব ও তাদের পরিবার সম্পর্কে জানা, দিন শেষে রাতে একসঙ্গে ডিনার করা এবং ফাঁকে ফাঁকে কথা বলে নেওয়া, তাদের সমস্যা, ভালোলাগা জেনে নেওয়া প্রয়োজন। পারিবারিক বন্ধন যদি শক্ত হয়, মা-বাবা যদি ছেলেমেয়ের বন্ধু হতে পারেন তবে নির্ভরতা বাড়বে এবং একে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতার জন্যই ভুল বোঝাবুঝি কমে যাবে। পরিবারই হচ্ছে সামাজিক সহনশীলতা ও নৈতিকতা সৃষ্টির মূল ভিত্তিভূমি। এর পরই আসে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশালত্বের কারণে সম্ভব না হলেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ ও স্কুলগুলোতে ন্যূনতম একজন করে মনোবিজ্ঞানী রাখা উচিত। সেই মনোবিজ্ঞানীর কাজ হবে ছাত্রছাত্রীদের মানসিক বিকাশ গঠনে সহায়তা দেওয়া এবং মানসিক সমস্যা দূরীকরণে কাজ করা। একই সঙ্গে মাদক সেবন থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থাও নেওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেমন প্রোক্টরিয়াল বডি থাকে, তেমনি কলেজ, হাইস্কুল এবং প্রাইমারি স্কুলগুলোতেও প্রোক্টরিয়াল বডি থাকা খুব দরকার। এই প্রোক্টরিয়াল বডির কার্যক্রম খুবই শক্ত হওয়া দরকার, যাতে কোনো ছাত্রছাত্রী বিপথগামী না হতে পারে। পারিবারিক বন্ধন অটুট থাকলে এ কাজ অনেকটা সহজ হয়। কিন্তু তার পরও এ দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম যাতে বেড়ে উঠতে পারে যথাযথভাবে সেজন্য উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা অভিভাবকরা এমন একটা ভাব ধরি যেন নিজেরা কখনোই কিশোর বয়সটা পার করে আসিনি। নিজের সিদ্ধান্ত জোর করে কিশোর সন্তানের উপর চাপিয়ে দিতে গিয়ে যে উপকারের বদলে সন্তানের উপর মানসিক টর্চারিং করছি তা ভেবেও দেখি না। যদি ছেলে-মেয়ে আমার যৌক্তিক কথা মেনে নিতে না চায় তবে তার পেছনের কারণটি খুঁজে বের করা উচিত। এমনও তো হতে পারে আমি যেটাকে যৌক্তিক মনে করছি সেটা আসলেই তার জন্য কল্যাণকর নয়। মানব জীবনের তিনটি ধাপের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে কিশোর বয়স। এই বয়ঃসন্ধিকালে একজন কিশোর-কিশোরীর শারীরিক-মানসিক-আচরণগত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। তার এই পরিবর্তনের কথা না পারে কাউকে বুঝাতে না পারে সইতে। এই বয়সটাতেই ব্যক্তিত্বের বিকাশ হতে শুরু করে। অল্প কুটু কথাতেই আকাশ সমান অপমান বোধ কাজ করে। বাবা-মা কিংবা বড় ভাই-বোনদের বন্ধু হিসেবে পেতে চায়, শাসক হিসেবে দেখতে অপছন্দ করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় অধিক শাসনের কারণে মনে অভিমানের ক্ষোভ দানা বাঁধে। ক্ষোভ কারও সাথে শেয়ার করতে না পেরে ভেতরে ভেতরে সহিংস হয়ে ওঠে। আদেশের অবাধ্যতা, বাসা থেকে পালানো, উগ্র ব্যবহার, মাদক গ্রহণ ইত্যাদি আচরণ পরিলক্ষিত হয়। কেউ কেউ নীরবে আত্মহননের পথও বেছে নেয়। এবার কয়েকটি সত্য ঘটনার মধ্য দিয়ে বুঝাতে চাই একজন সন্তানের সুষ্ঠু মানসিক বিকাশের জন্য পারিবারিক বন্ধন কতটা জরুরি। এক. নোয়াখালীর পূর্ব চরবাটা স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্রী সিনথিয়া। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে প্রায়ই তাকে বিরক্ত করে এলাকার বখাটেরা। কী করবে সে? বুঝতে পারে না। মাকে বলতে ভয় হয়। মা শুনলে নিশ্চই রাগ করবে, বাবাকেও বলতে পারে না ভয়ে। বাবা শুনলে মেরেই ফেলবে। তাই, নিজের ভেতরই পুষে রাখে সমস্যাটি। একদিকে বাবা-মার বকুনির ভয় অন্যদিকে বকাটেদের হয়রানি ও অপমান সহ্য করতে না পেরে একদিন বিষপান করে আত্মহত্যা করে মেয়েটি। দুই. মৌমিতা বাবার সাথে অভিমান করে কথা বলে না। বাবাও মেয়ের সাথে অভিমান করে কথা বলে না। মৌমিতার অভিমান, বাবা আমাকে ডাকলেই তো জাপটে ধরে কান্নায় অভিমান ভাসিয়ে দিতে পারি। বাবা কেন আমাকে ডাকে না। কিশোরী মেয়ে বাবার সাথে এই অভিমান সহ্য করতে পারেনি। তাই তো ফাঁস নেওয়ার আগে ছোট্ট একটা চিরকুটে লিখে রেখে যায়, ‘বাবা আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি’। তিন. ডিবি’র পুলিশ ইন্সপেক্টর অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ‘ও’ লেভেলের ছাত্রী ইয়াবা গ্রহণকারী ঐশীর হাতে বাবা-মাকে হত্যার পরই ঘটনাটি সবার আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। ঘটনার প্রেক্ষাপট আতংকিত করে তুলেছে অভিভাবক মহলকে। সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট অপরাধ বিশেষজ্ঞ আনিসুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মরণনেশা ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক এখন ওপরতলা থেকে নিচতলা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া-সর্বত্রই ছড়িয়ে গেছে। এ কারণে নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে।’ সন্তানের কাছাকাছি আসার প্রধান উপায় হলো তাদের সময় দেওয়া। কারণ একটি সন্তানের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তার পিতা-মাতাকে। এই মৌলিক প্রয়োজন বিত্ত বা পণ্যে মেটার নয়, বরং চাই ভালোবাসা, ভরসা, সঙ্গ ও সুশিক্ষা। মা-বাবার কাছ থেকে মানসিক চাহিদাটুকু পূরণ না হলে সন্তান হতাশ হয়ে পড়তে পারে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে, আশ্রয় খুঁজে নিতে পারে নেশায়। তাই বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের মানসিক সংযোগ স্থাপন খুব জরুরি। নিত্যদিনের ব্যস্ততায় প্রতিদিন বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানদের দেখাই ক’বার হয়, তা হাতে গুনে বলে দেওয়া যায়। আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে, তা হলো প্রথম যখন বুঝতে পারবেন যে সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে, নিজের আবেগকে সংবরণ করে তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। মনে রাখবেন, ওই মুহূর্তে আপনার চেয়ে আপনার সন্তান বেশি কষ্টে আছে। সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর মাদকের জগতে আর ফিরবে না, সবার কাছে এ বিশ্বাসটুকু অর্জন করতে অনেক সময় একজন মাদকাসক্তকে ভীষণ বেগ পেতে হয় পারিবারিক অসহযোগিতার কারণে। সেই সময়টায় হতাশ হয়ে সে আবার নেশার কবলে পড়ে যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেন, ‘পরিবারকেই বেশি দরকার সেই মুহূর্তে। আমি একা নই—এ বিশ্বাস তাকে শক্তি জোগাবে। এ সময় পরিবারের উচিত তাকে বিশেষজ্ঞের সাহায্য দেওয়া ও গ্রুপ থেরাপি করানো, যেখান থেকে অন্য মাদকাসক্তি-ফেরত মানুষের ভোগান্তি ও উত্তরণের কথা শুনে সে নতুন করে বাঁচতে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠবে।’ মনে রাখুন বাবা-মা ও অভিভাবকদের জন্য  আপনার সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই এমন আদর্শে গড়ে তুলুন যাতে কিশোর বয়সে কোনো ব্যাপারে জোর করতে না হয়।  প্রতিদিন সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিন। তার বন্ধুদের সাথেও সখ্যতা গড়ে তুলুন। মাঝে-মধ্যে তার বন্ধুদের দাওয়াত করে খাওয়ান। এতে আপনার সন্তানের বন্ধু কেমন তাও যেমন জানতে পারলেন আবার সন্তানের মনটাও আকাশের মতো বড় হবে তার বন্ধুদের আপ্যায়নে।  নিজেই প্রতিদিন সন্তানের পড়া তৈরিতে সহায়তা করুন। প্রাইভেট টিউটর দিলেও প্রতিদিনই তার পড়াশোনার খোঁজ নিন এবং পড়াতে উত্সাহ দিন।  সন্তানের সাথে শাসক-প্রজা ভূমিকা নয়, ভালোবাসার বন্ধন গড়ে তুলুন। মনে রাখবেন আপনাকে বন্ধু হিসেবে পেলে আপনিই হবেন তার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বন্ধু।  আপনার সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে না দিয়ে তার মতামত নিন। সেইসাথে মনোযোগ দিয়ে তার মতামত শুনুন। যদি তার মত যৌক্তিক হলে তা মেনে নিন। আর যৌক্তিক না হলে কিংবা আপনার মতটি তার মতের চাইতে ভালো হলে তার সাথে বন্ধুসুলভ কাউন্সিলিং করুন। সঠিকটি বুঝাতে চেষ্টা করুন।  সন্তানের ছোট-বড় সফলতায় তাকে উত্সাহ-উপহার দিন। ভুল-ত্রুটিগুলো এমনভাবে ধরিয়ে দিন যাতে অপমান বোধ না করে বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সেই ভুল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে।