মাঠে বাংলা টিমের সুইসাইড স্কোয়াড

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০১
আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ‘সুইসাইড স্কোয়াড’ নামেও একটি শাখা রয়েছে। মূলত এই শাখাটি অপারেশনাল শাখার অধীনে। এর পাশাপাশি গোয়েন্দা ও প্রশিক্ষণ শাখাও রয়েছে। গোয়েন্দা শাখার কাজ কাউকে ‘কোতল (হত্যা)’ করার সিদ্ধান্ত হলে তার ব্যাপারে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা। শুধু সাধারণ কিছু তথ্য নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঘুম থেকে উঠার পর রাতে ঘুমানো পর্যন্ত সারাদিন কোথায় থাকেন, কী করেন, কাদের সঙ্গে মিশেন, কখন কোথায় থাকেন তার আদ্যোপান্ত সংগ্রহ করা। গোয়েন্দা শাখার কাজ শেষ হওয়ার পর দায়িত্ব পড়ে অপারেশনাল শাখার উপর। তখন কাজে লাগানো হয় সুইসাইড স্কোয়াড। কারণ কাউকে খুন করতে গেলে গণপিটুনি বা অন্য কারণে তাদেরও কেউ নিহত হতে পারেন। তাই তাদের সেভাবেই প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা হয়। তারা বিশ্বাস করে কাউকে কোতল করতে গিয়ে কোনো সদস্যের মৃত্যু হলে তিনি হবেন ‘শহীদ’। আনসারুল্লাহ’র সর্বশেষ গ্রেফতার হওয়া ৯ জন সদস্য বর্তমানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রিমান্ডে রয়েছে। গত রবিবার তাদের সবাইকে ৫ দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে। রিমান্ডের প্রথম দিন তাদের কাছ থেকে এই ধরনের তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, আনসারুল্লা’র সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে যে তথ্য পেয়েছেন তা বিশ্লেষণ করলে সুইসাইড স্কোয়াডই বলা যায়। কারণ যারা অপারেশনে যায় তাদের যে কোন সময় মৃত্যু হতে পারে—এমন প্রস্তুতি নিয়েই যায়। এই ধরনের কিছু সদস্যের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে অভিযানে নেমেছে পুলিশ। এই জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদকারী গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে আরব বসন্ত আনতে চেয়েছিল এই আনসারুল্লাহ’র সদস্যরা। অস্থিতিশীল ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল তারা। অস্ত্র মজুদ ও থানা লুটের পরিকল্পনাও ছিল তাদের। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদার সঙ্গে তাদের সরাসরি কোন সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও আল কায়েদা ও তালেবানদের মতাদর্শে বিশ্বাসী এই সংগঠনের সদস্যরা। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না থাকলেও তারা দেশের অভ্যন্তরে নানা কৌশলে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। মুফতি জসিমুদ্দিন রাহমানীর কাছ থেকে এ ধরনের কিছু তথ্য, কর্মপরিকল্পনা ও নির্দেশনামূলক গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষীদের কিভাবে খতম করতে হবে, কিভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে হবে, কোন ধরনের রাজনৈতিক দল তাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠার সহায়ক শক্তি—ওই নথিতে তার বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন জসিমুদ্দিন রাহমানী। সেক্ষেত্রে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও আরব বসন্তের পরিবেশ তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা উল্লেখ রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদকারী গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, তাদের আদর্শ ছড়িয়ে দিতে দেশের সকল আলেম ও ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান পদ্ধতিতে আলোচনার তাগিদ দেয়া আছে। ইতিমধ্যে এই জঙ্গি সদস্যরা রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আল্লাহ ও নবীজীর বিরুদ্ধে কটূক্তিকারীদের তালিকা করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে গোয়েন্দা শাখাকে। এই তালিকায় যাদের নাম থাকবে তাদের ‘কোতল’ করা হবে। এই ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় ও ছবি দিয়ে অনলাইন ডাটাবেইজ সংরক্ষণের নির্দেশও দিয়েছেন কথিত ধর্মগুরু এই রাহমানী। পর্যায়ক্রমে ইসলাম বিদ্বেষীদের ‘কোতল’ করতে ঈমানের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ফতোয়াও উঠে এসেছে তার নির্দেশনামূলক নথিতে। গোয়েন্দারা জানান, ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় সুইসাইড স্কোয়াড। এই জঙ্গি সদস্যদের আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে জসিমুদ্দিন রাহমানী ছাড়াও আরও ৪-৫ জনের তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এদের ২-১ জন বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসিমুদ্দিন হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। গত মে মাসে মতিঝিলে হেফাজতের মহাসমাবেশের আগে লালবাগের একটি মাদ্রাসায় একটি বৈঠক হয়। জানা গেছে, ওই বৈঠকে রাহমানী হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের বলেন, ১৩ দফা বাদ দিয়ে এক দফার জন্য জিহাদ করতে হবে। তিনি ওই সময় মতিঝিলে কয়েক হাজার লোক জমায়েত করে উগ্রপন্থায় সেই দিনই থানা আক্রমণ করে সরকারের পতন ঘটনোর পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তবে হেফাজতের শীর্ষ কয়েক নেতা তখনই উগ্র জিহাদের বিপক্ষে মত দেন।